খবর অনলাইন : দেশবাসীকে বুলেট ট্রেনে চড়ানোর স্বপ্ন বেচেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু সমীক্ষা করে দেখা গেছে, তাতে বিপুল খরচের ধাক্কা। তা ছাড়া ভারতে রেলপথের যে পরিকাঠামো তাতে বুলেট ট্রেন কবে চালানো যাবে তা সময়ই বলতে পারে। তাই দুধের বদলে ঘোল। বুলেটের বদলে সেমি-বুলেট। যাত্রা শুরু হল গতিমান এক্সপ্রেসের।

বেশ ধুমধামে শুরু হল গতিমানের যাত্রা। রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভু আবেগমথিত ভাষণ দিলেন। উৎসাহী মানুষজন ট্রেনের কামরার সামনে দাঁড়িয়ে ‘নিজস্বী’ তুললেন ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী থাকতে। রেলমন্ত্রী ফ্ল্যাগ নাড়লেন। ছাড়ল গতিমান।    গতিমানের এলএইচবি (লিঙ্কে হফমান বুশ) কোচগুলো বাইরে থেকে দেখতে অভিনব কিছু নয়। নীল-ধূসর রঙের মাঝে হলুদ রঙের সরু জমি। রঙের এই বাহার একটু ম্যাড়মেড়েই মনে হয়। তবে ভিতরে নানা সুব্যবস্থা। এলইডি রিডিং লাইট, আরামদায়ক গদিওয়ালা  পুশব্যাক সিট, বায়ো-টয়লেট, যাত্রীদের দেখভাল করার জন্য আছেন সেবক-সেবিকা। তাঁরা ট্রলি ঠেলে খাবার নিয়ে আসছেন – নিরামিষ বা আমিষ, উত্তর বা দক্ষিণ ভারতীয়, যে রকম খাবারটি চাইবেন তা-ই পাবেন। ক্যাটারিং-এর আদবকায়দা, শিষ্টাচার, সহবত হুবহু প্লেনের মতো।

এক বিখ্যাত দৈনিকের সাংবাদিক মঙ্গলবার গতিমান এক্সপ্রেসের উদ্বোধনী যাত্রায় সওয়ার হয়ে লিখেছেন — “যাত্রাপথেই হঠাৎ ঘোষণা ভেসে এল মাইকে –- বল্লভগড়-কোশীর মাঝে গতিমান এক্সপ্রেস ছুঁয়ে ফেলেছে ১৬০ কিলোমিটার গতি। মুহূর্তে হইচই করে উঠল গোটা কামরা”।

ভারতীয় রেলের দাবি, গতির প্রশ্নে নতুন মাইলফলক ছুঁল তারা। তারা ‘হাই স্পিড এজ’-এর দিকে অনেকটা এগিয়ে গেল। সত্যিই কি তাই ?

একটু তলিয়ে দেখা যাক। গতকাল সকাল ১০টায় যাত্রা শুরু করলেও এখন থেকে গতিমান সকাল ৮-১০ মিনিটে দিল্লির হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে যাত্রা করে ৯-৫০ মিনিটে আগরা ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছবে। হজরত নিজামুদ্দিন থেকে আগরা ক্যান্টনমেন্টের দূরত্ব ১৮৮ কিলোমিটার। অর্থাৎ ১৮৮ কিলোমিটার দূরত্ব সে অতিক্রম করবে ১০০ মিনিটে। যদিও সূচনার যাত্রাতেই ভারতীয় রেলের লেটের ট্র্যাডিশন বজায় রেখেছে গতিমান। গন্তব্যে পৌঁছেছে ৯ মিনিট লেটে। আর ফিরতি পথেও সে লেট করেছে ২ মিনিট। এই তথ্য মিলেছে ভারতীয় রেলের ন্যাশনাল ট্রেন এনকোয়ারি সিস্টেম থেকে। মনে রাখতে হবে গতিমানের দিল্লি-আগরা যাত্রা কিন্তু নন-স্টপ। কোথাও বিরতি নেই।

গতিমানের সূচনার আগে এই লাইনে সব চেয়ে দ্রুতগামী ট্রেন ছিল দিল্লি-ভূপাল শতাব্দী এক্সপ্রেস। শতাব্দীর যাত্রা শুরু ২৮ বছর আগে। সে সকাল ৬টায় ছেড়ে আগরা পৌঁছয় ৭-৫৭ মিনিটে। অর্থাৎ সময় নেয় ১১৭ মিনিট। অর্থাৎ সাদা চোখে গতিমানের চেয়ে ১৭ মিনিট বেশি। কিন্তু শতাব্দী ছাড়ে নিউ দিল্লি থেকে, আগরা ক্যান্টনমেন্ট থেকে যার দূরত্ব ১৯৫ কিলোমিটার। অর্থাৎ গতিমানের চেয়ে ৭ কিলোমিটার বেশি দৌড়য় শতাব্দী। এখানেই শেষ নয়। যাত্রাপথে মথুরায় ১ মিনিটের স্টপেজ আছে। এবং সবাই বোঝেন এই ১ মিনিট স্টপেজের জন্য গতি কমাতে ও বাড়াতে গিয়ে আরও কয়েক মিনিট সময় যায় শতাব্দীর। আরও আছে, শতাব্দী ছাড়ে হজরত নিজামুদ্দিনের তুলনায় অনেক ব্যস্ত স্টেশন নিউ দিল্লি থেকে, যেখানে ট্র্যাফিকের চাপ অনেক বেশি। তা হলে গতিমানের গতি নিয়ে যে ঢক্কানিনাদ চলছে তা কি আদৌ যুক্তিসঙ্গত ?

সামান্য পাঁচ-সাত মিনিট সময় বাঁচানোর জন্য গতিমানে শতাব্দীর চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ ভাড়া বেশি গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের। শতাব্দীতে এসি চেয়ারকারে ভাড়া ৫১৫ টাকা, গতিমানে ৭৫০ টাকা। আর একজিকিউটিভ ক্লাসে শতাব্দীর ভাড়া ১০১০ টাকা, গতিমানে ১৫০০ টাকা।

স্বাভাবিক ভাবেই গতিমানের উদ্বোধনী যাত্রায় ছিল ব্যাপক উন্মাদনা-উচ্ছ্বাস।  যাত্রীসাধারণও আবেগে ভেসেছেন। গতি, ভাড়া ইত্যাদি বিষয়গুলি তলিয়ে দেখেননি। দিন যত যাবে এই প্রশ্নগুলো উঠবে। শেষ পর্যন্ত গতিমান যাত্রীসাধারণের পৃষ্ঠপোষকতা পাবে তো ? সংশয় থেকে যায়।


মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here