কানহাইয়া এখন আরও তুখোড়, আরও চাঁচাছোলা

0

খবর অনলাইন ডেস্ক: সৌজন্যে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। এক সাধারণ ছাত্রনেতাকে নিয়ে এল সংবাদের শিরোনামে, নিয়ে এল পাদপ্রদীপের আলোয়। আর সেই ছাত্রনেতা ফিরেই বুঝিয়ে দিলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতেও তিনি পিছপা হবেন না।
বেগুসরাইয়ের কানহাইয়া কুমারকে ক’জন চিনত ? ভারতের রাজনীতিতে প্রায় গুরুত্বহীন দল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) ছাত্র সংগঠন এআইএসএফ-এর নেতা কানহাইয়া। হ্যাঁ, সুবক্তা তিনি। হিন্দি আর ইংরিজিতে সমান ভালো বলতে পারেন। আর মাঝে মাঝে বক্তৃতায় মিশিয়ে দেন হিন্দি দেহাতি বুলি। এ ভাবেই আপন করে নেন শ্রোতাদের। এই বক্তৃতাতেই সহপাঠীদের মন জয় করে তিনি জেএনইউ ছাত্র সংসদের সভাপতি হন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তো তাঁর পরিচিতি সীমাবদ্ধ ছিল জেএনইউ-এর চার দেওয়ালের মধ্যেই।
ফিরে এলেন সেই কানহাইয়া কুমার। তিন সপ্তাহে চিত্রপট পুরোপুরি বদল। দেশদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে তিন সপ্তাহ কাটালেন তিহাড় জেলে। দিল্লি হাইকোর্টের আদেশে অন্তর্বর্তী জামিন পেয়ে মুক্ত তিনি। কানহাইয়া এখন এক পোড়খাওয়া রাজনীতিক। চোখেমুখে আত্মপ্রত্যয়ের ছাপ। বক্তৃতায় আরও তুখোড়, আরও চাঁচাছোলা। বক্তৃতায় অনেক বেশি ঝাঁঝ, অনেক বেশি শ্লেষ, অনেক বেশি হাস্যরস। যেন আরও অনেক বেশি মাটির কাছাকাছি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও সরাসরি বিদ্ধ করতে এতটুকু ভয় পান না। তার প্রমাণ রাখলেন জেএনইউ-তে ফিরেই। বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এক ছাত্র সমাবেশে বক্তৃতা দিয়ে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন তিনি কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর মাথাব্যথার কারণ হতে পারেন। কানহাইয়া বললেন, “প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার অনেক বিষয়ে মতবিরোধ আছে। কিন্তু একটা ব্যাপারে আমি ওঁর সঙ্গে একমত। উনি সত্যমেব জয়তে বলেন। আমিও তো একই কথা বলি। সত্যের জয় হবে। কিন্তু উনি যখন স্তালিনের কথা বলেন, সেটা শুনে মনে হয় স্ক্রিন ভেঙে টিভিতে ঢুকে ওঁর সুট ধরে বলি, কই, হিটলারের কথা তো বললেন না।”
আজাদির কথা ফের বললেন কানহাইয়া। এ বার যেন আরও স্পষ্ট করে। বললেন, “দেশ থেকে আজাদি নয়, দেশের ভেতরেই আমরা আজাদি চাই। সংসদ, সংবিধান আর বিচারবিভাগের মাধ্যমেই আজাদি চাই। আজাদি চাই দুর্নীতি থেকে, আজাদি চাই বৈষম্য থেকে, আজাদি চাই পুঁজিবাদ, জাতিবাদ, ব্রাহ্মণ্যবাদ থেকে। আমরা এ ধরনেরই আজাদি চাই।”
বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের যে জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে কানহাইয়া গ্রেফতার হয়েছিলেন ২০ দিন আগে, ফিরে এসে সেই জায়গায় দাঁড়িয়েই বক্তৃতা দিলেন কানহাইয়া। তবে তফাত অনেক। কানহাইয়া এখন অনেক বেশি পরিণত। আর সমাবেশটিও আগের চেয়ে আড়ে-বহরে অনেক বড়।
সকলকে ধন্যবাদ দিয়ে কানহাইয়া শুরু করেন প্রায় এক ঘণ্টার বক্তৃতা। দেশবাসী, বিশ্ববাসী, যাঁরা জেএনইউ-এর পাশে দাঁড়িয়েছে তাদের সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে কানহাইয়া বললেন, “আমি সেই সব মহান ব্যক্তিদেরও ধন্যবাদ জানাতে চাই যাঁরা পার্লামেন্টে বসে সিদ্ধান্ত নেন, কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল। এবং আমি তাঁদের পুলিশকেও ধন্যবাদ দিতে চাই।”
তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা দেশদ্রোহিতার অভিযোগ যে মিথ্যা সেটা প্রমাণ করার জন্যই কানহাইয়া বলেন, “আমি আমাদের শহিদ জওয়ানদের স্যালুট জানাই”। এর পরই সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “কিন্তু সীমান্ত রক্ষা করতে গিয়ে যে সব জওয়ান প্রাণ হারাচ্ছেন তাঁরা আমাদের সেই সব কৃষকদেরই সন্তান, ভাই যাঁরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আত্মহত্যা করছেন। এঁদের মধ্যে মিথ্যে বিভাজন সৃষ্টি করবেন না।”
হাজার তিনেক ছাত্র-জনতার উল্লাসধ্বনির মধ্যে কানহাইয়া বিজেপি সরকারকে এক হাত নিয়ে বলেন, “আমরা, ভারতীয়রা খুব সহজেই ভুলে যাই। কিন্তু এ বার যে নাটক হল তাতে নির্বাচনের সময়কার সব ‘জুমলা’ (প্রতিশ্রুতি) আমাদের মনে পড়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এই জনবিরোধী শাসনের বিরুদ্ধে কোনও কথা বলেন, তা হলে ওদের সাইবার সেল কী করবে ? আপনার জাল ভিডিও পাঠিয়ে দেবে আর আপনার ময়লা ফেলার জায়গায় কন্ডোম গুনতে বসবে (বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অনৈতিক কাজকর্ম চলে বলে এক বিজেপি এমএলএ যে চিৎকার জুড়েছিলেন তাকে খোঁটা)। ভারতের ৬৯ শতাংশ জনগণই তো ওদের আদর্শের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। মাত্র ৩১ শতাংশ মানুষ ওদের ‘জুমলেবাজি’-তে বোকা বনেছিল।” কানহাইয়া বলেন, “আমি গ্রাম থেকে এসেছি। সেখানে ম্যাজিক শো দেখানো হয়। জনতা ম্যাজিক দেখে আর আংটি বিক্রি করে, যে আংটি আপনার সব ইচ্ছা পূরণ করে দেয়।… আমাদের দেশে এ রকম কিছু লোক আছে, যারা বলে কালো টাকা ফিরে আসবে, সব কা সাথ, সব কা বিকাশ।” তবে পাকা রাজনীতিকের মতো কানহাইয়া তাঁর সতীর্থদের স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেননি যে “এবিভিপি আমাদের শত্রু নয়, আমাদের বিরোধী।”
কানহাইয়ার মতে, “শুধুমাত্র কয়েকজন ছাত্রকে শায়েস্তা করার জন্য দেশদ্রোহিতার ইস্যুকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। জনগণকে দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি থেকে নজর হঠানোর জন্যই এটা সরকারের চাল। এ ছাড়া এই ঘটনা জেএনইউ-এর বিরুদ্ধে একটা চক্রান্তও। কারণ হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ স্কলার রোহিত ভেমুলার মৃত্যু নিয়ে সরব হয়েছিল জেএনইউ।”
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কানহাইয়া তিহাড় থেকে ছাড়া পাবেন এই খবর জেনে, তিহাড়ের প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হয়েছিলেন ছাত্রছাত্রী, সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা এবং সাধারণ মানুষজন। তিন সপ্তাহে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠা কানহাইয়াকে এক ঝলক দেখতে গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষা করেছেন দিল্লিবাসীরাও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমকে এড়াতে জেলকর্মীদের ব্যবহার করা গেটটি দিয়ে কানহাইয়াকে বার করে তিনটি গাড়ির এসকর্ট করে তাঁকে পৌঁছে দিয়ে আসা হয় জেএনইউ-তে। সেখানে ফিরে সতীর্থদের উল্লাসের মধ্যে কানহাইয়া স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “রোহিত ভেমুলা এবং আপনারা যে লড়াই শুরু করেছেন তা চলবে এবং আমরা এর শেষ দেখে ছাড়ব।”

------------------------------------------------
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.