শৈবাল বিশ্বাস :

কলকাতা পুরসভায় ইউনিট এরিয়াভিত্তিক কর চালু নিয়ে ইতিমধ্য‌ে শহরের বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটিয়ারা প্রবল বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। সম্পত্তির মূল্য‌ায়নের জন্য‌ সদ্য‌ পাশ হওয়া সংশোধনী বিলটিতে কলকাতাকে সাত ভাগে ভাগ করার কথা বলা হয়েছে। নতুন বিলে বলা হয়েছ, ‘এ’ থেকে ‘জি’—এই সাতটি ব্লকে কলকাতা শহরকে ভাগ করা হবে। ‘এ’ ব্লকে যে সব জায়গা পড়বে তার কর হবে সর্বোচ্চ এবং ‘জি’ ব্লকে যে সব এলাকা পড়বে তার কর হবে সব চেয়ে কম। হিসেব করে দেখা যাচ্ছে ‘বি’,‘সি’ ব্লকের মতো মধ্য‌বিত্ত অধ্য‌ুষিত এলাকাতেও সম্পত্তির মূল্য‌ায়ন দশ-বারোগুণ বেড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ যাঁকে ত্রৈমাসিক ২০০ টাকা সম্পত্তিকর দিতে হত এ বার তাঁকে দিতে হবে ২০০০ টাকা। বলা বাহুল্য‌, এই বিপুল পরিমাণ করের বোঝা টানার মতো ক্ষমতা কলকাতার মধ্য‌বিত্ত-নিম্নমধ্য‌বিত্ত বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়ার নেই। বিশেষ করে বংশপরম্পরায় যাঁরা বিড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়া আছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে বোঝাটা বড্ড বেশি হয়ে যাচ্ছে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে কিছুটা করভার লাঘবের জন্য‌ পুরসভা ‘ক্য‌াপ’ প্রথা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ‘ক্য‌াপ’ প্রথা অর্থে কারও হয়তো ইউনিট এরিয়া করব্য‌বস্থায় কর হার ২০০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০০ টাকা হয়েছে। তার ক্ষেত্রে এতটা না বাড়িয়ে বৃদ্ধি করা হল ২০ শতাংশ। অর্থাৎ তাঁর বর্দ্ধিত কর হল ২৪০ টাকা। তবে এই করভার কিন্তু চিরস্থায়ী হল না। শেষ পর্যন্ত তাঁকে বর্ধিত করই দিতে হবে কিন্তু ধাপে ধাপে। প্রথম বছরে ২০ শতাংশ, তার পরের বছর তার ওপর ২০ শতাংশ — এ ভাবে বাড়তে বাড়তে পাঁচ বছর বাদে সেই দশগুণ বৃদ্ধিতে গিয়েই থিতু হবে।

বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটিয়া উভয়েই মনে করছে, ‘ক্য‌াপ’ প্রথা আসলে ধোঁকা দেওয়ার ব্য‌বস্থা। এতে করভার নিয়ন্ত্রণে রাখার কোনো ব্য‌বস্থা রাখা হয়নি। ক্য‌ালকাটা হাউসওনার্স অ্য‌াসোসিয়েশনের সম্পাদক সুকুমার রক্ষিত মনে করেন, যিনি এখন ২০০ টাকা কর দেন পাঁচ বছর বাদে তিনি ২০০০ টাকা দিতে সক্ষম হবেন, এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। ভাড়াটিয়া সংগঠন টেনান্ট ওয়েলফেয়ার অ্য‌াসোসিয়েশনের দেবজ্য‌োতি রায় বলেন, সম্পত্তিকরের ৫০ শতাংশ বহন করতে হয় ভাড়াটিয়াদের। ফলে যে সব ভাড়াটিয়া দীর্ঘদিন ধরে ছোটো দোকান চালাচ্ছেন বা ছোটো ব্য‌বসা করছেন তাঁদের পক্ষে বর্ধিত করভার বহন করা খুবই কঠিন। ‘ক্য‌াপ’ প্রথা হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে সেটা কোনো সমস্য‌ার সমাধান নয়।

মেয়র শোভন চট্টোপাধ্য‌ায় পুরসভায় জানিয়েছেন, ‘ক্য‌াপ’ প্রথায় কোনো এলাকায় কতটা স্বস্তি দেওয়া হবে সেটা স্থির করার জন্য‌ একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি জানুয়ারি মাসের মধ্য‌েই রিপোর্ট দেবে। শুধু তা-ই নয়, তিনি বলেন, এই এপ্রিল মাস থেকেই স্বমূল্য‌ায়ন বা সেল্ফ অ্য‌াসেসমেন্ট পদ্ধতিতে বাড়ির সম্পত্তিকর নির্ধারণের প্রক্রিয়া চালু হয়ে যাবে। তার ফলে ইন্সপেক্টর-রাজ আর থাকবে না। সুকুমারবাবুর মতে, সেল্ফ অ্য‌াসেসমেন্ট হলে ইন্সপেক্টর-রাজ কমে যাবে এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। স্বমূল্য‌ায়ন হয়ে যাওয়ার পরেও ইন্সপেক্টর পাঠিয়ে পুনর্মূল্য‌ায়ন করা হবে বলে তাঁর অনুমান। এতে বরং মূল্য‌ায়নপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে অনেক বেশি সময় লাগবে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here