জোড়াসাঁকোর নরসিংহ চন্দ্র দাঁ পরিবারের পুজোর এ বার ১৬৩ বছর

0

কলকাতা: শারদীয়া দুর্গাপূজার প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। আর দু’ দিন পরেই মহাষষ্ঠী। বাংলার ঘরে ঘরে আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয়ে যাবে দুর্গাপূজা। এ বছর করোনা পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে। তাই মানুষ ভয় কাটিয়ে পুজোর সবটুকু আনন্দ উপভোগ করতে তৈরি।

ও দিকে বনেদিবাড়ির দুর্গাপূজায় পরম্পরাগত রীতি পালন শুরু হয়ে গিয়েছে। এমনই এক পরিচিত বনেদিবাড়ি রয়েছে কলকাতায়, যেখানে লোকশ্রুতি বলে স্বয়ং উমা গহনা পরতে আসেন। জোড়াসাঁকোর দাঁ-বাড়ির ঐতিহ্য এবং বনেদিয়ানা আজও পুরো মাত্রায় পাওয়া যায় ঠাকুরদালানে দাঁড়ালে।

এই পরিবারের ব্যবসা ছিল বন্দুকের, তাই উত্তর কলকাতার এই ঐতিহ্যমণ্ডিত বনেদিবাড়িকে অনেকেই ‘বন্দুকওয়ালা বাড়ি’ বলেই চেনেন। গণেশ টকিজ মোড় থেকে কিছুটা দূরে গেলেই দেখা যাবে সেই ঐতিহ্যপূর্ণ বাড়িটি, যার স্থাপত্য সকলের নজর কাড়ে।

বন্দুকের ব্যাবসা শুরু করেছিলেন দাঁ পরিবারের সুসন্তান নরসিংহ চন্দ্র দাঁ। তিনি ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ ১২৬৬ বঙ্গাব্দে জোড়াসাঁকোয় তাঁর নিজের বাসভবনে (বর্তমান ঠিকানা ২২এ বিবেকানন্দ রোড) শুরু করেন দুর্গোৎসব। নরসিংহবাবুর কনিষ্ঠ পুত্র নন্দলাল দাঁ তাঁর সমস্ত সম্পত্তি দেবত্র সম্পত্তি হিসাবে ব্যবস্থা করে দেন। সেই সম্পত্তির আয় থেকে পুজোর খরচার একটা বড়ো অংশ নির্বাহ হয়। নরসিংহবাবুর মধ্যম পুত্র আশুতোষ দাঁ-র বংশধরেরা এই পুজোর দায়িত্বে আছেন। পুজোর বাকি খরচ তাঁরাই বহন করেন।  

দাঁ-বাড়িতে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয় রথযাত্রার দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে। ওই দিন একটি গরানকাঠ ঠাকুরদালানে পুজো করা হয়। তার পরই বাঁশ, বেত, খড়, মাটির মাধ্যমে প্রতিমা মৃন্ময়ী রূপ পায়।

বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরাণে উক্ত পূজাপদ্ধতি অনুসারে দাঁ-বাড়ির পুজো সম্পন্ন হয়। দেবীপক্ষের প্রতিপদে দাঁ-বাড়ির পুজোর সূচনা হয়। ওই দিন ওই পরিবারের কোনো বধূ পুজোর জন্য সংকল্প গ্রহণ করেন। সাধারণত চার বছরের জন্য ওই সংকল্প গ্রহণ করতে হয়। তিনি প্রতিপদ থেকে মহানবমী পর্যন্ত প্রতি দিন সকালে পুজো শেষ করে স্বহস্তে রান্না করে হবিষ্যান্ন গ্রহণ করেন এবং দিনের শেষে ফলমূল ও দুগ্ধজাত দ্রব্য আহার করেন। দাঁ পরিবারের সব সদস্য প্রতিপদ থেকে মহাষ্টমী পর্যন্ত নিরামিষ ভোজন করেন। মহানবমীর দিন সকালের পুজো, হোম, দক্ষিণান্ত ও শান্তিজল পর্ব শেষ হলে মধ্যাহ্নভোজনের সময় সকলে মৎস্যমুখ করেন।        

প্রতিপদ থেকে ষষ্ঠী পর্যন্ত ঠাকুরদালানের পাশে ঠাকুরঘরে ঘটে পুজো হয়। এই বাড়ির প্রতিমা একচালার। ষষ্ঠীর দিন প্রতিমাকে ডাকের সাজে সাজানো হয়। এবং সোনার গয়না দিয়ে মায়ের নানা অঙ্গ সজ্জিত করা হয়। লক্ষ্মী-সরস্বতী-গণেশ-কার্তিককেও গয়না পরানো হয়। এমনকি সিংহের গলায় থাকে রুপোর মালা।

দাঁ-বাড়ির বধূরাও পুজোর ক’দিন সোনার গয়না পরেন। আর সন্ধিপুজোর সময় তাঁদের গয়নার সাজ আরও বাড়ে। যেমন, গলায় সীতাহার এবং অন্যান্য হার, হাতে চুড়ি, চুড়, বালা, নাকে নাকছাবি বা নথ, মাথায় সোনার ফুল ইত্যাদি। দশমীর দিন দেবীবরণ পর্যন্ত তাঁরা গয়না পরে থাকেন।

ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় আমন্ত্রণ, অধিবাস ও বিল্ববৃক্ষে বোধনের মাধ্যমে মহাপূজার সূচনা হয়। মহাসপ্তমীর ভোরে গঙ্গায় নবপত্রিকা স্নানের জন্য সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রওনা হন পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। এই স্নানযাত্রায় পুরোহিত ছাড়াও থাকেন আরও একজন ব্রাহ্মণ, যিনি নবপত্রিকা ধরে থাকেন। ঘট থাকে পরিবারের কোনো সদস্যের হাতে। নবপত্রিকার মাথার উপর ধরা হয় রুপোর দণ্ডের উপর নির্মিত ভেলভেটের ছাতা। এই যাত্রায় সঙ্গী হন এই পরিবারের বন্দুক প্রতিষ্ঠানের উন্মুক্ত তরবারিধারী চার প্রহরী – এটি এই বাড়ির অন্যতম ঐতিহ্যময় প্রথা। উল্লেখ্য, বিসর্জনযাত্রায়ও এই তরবারিধারীরা থাকেন। এর জন্য কলকাতা পুলিশের বিশেষ অনুমতি নিতে হয়।

দাঁ-বাড়ির মহিলা সদস্যরা।

নবপত্রিকা ফিরে এলে বিভিন্ন আচার পালন করে তাঁকে ঠাকুরদালানে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর পর ঠাকুরদালানে গৃহলক্ষ্মী ও নারায়ণশিলা প্রতিষ্ঠা, ঘট প্রতিষ্ঠা, প্রতিমার প্রাণপ্রতিষ্ঠা, চক্ষুদান এবং তাঁর আরতির মাধ্যমে সপ্তমীপূজা শুরু হয়। এই সময় দু’টি জাগ্‌প্রদীপ (একটি ঘিয়ের এবং অন্যটি তেলের) জ্বালানো হয় এবং দশমীর দিন প্রতিমা নির্গমন হওয়া পর্যন্ত এই প্রদীপ দু’টি জ্বলতে থাকে।

মহাষ্টমীর দিন সকালে নবঘট তথা ন’টি মাটির ঘট স্থাপন করা হয়। সকালের পূজা সমাপন করার পর হয় ধুনো পোড়ানো অনুষ্ঠান। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ বধূরা নতুন কাপড় পরে প্রতিমার সামনে বসে দুই হাতের তালুতে ও মাথায় মাটির সরা স্থাপন করে ধুনো পোড়ান। অনুষ্ঠান শেষ হলে কনিষ্ঠরা তাঁদের কোলে বসে পদধূলি নিয়ে তাঁদের আশীর্বাদ গ্রহণ করেন।

সন্ধিপুজোয় দেবীকে নিবেদন করা হয় এক মণ চালের নৈবেদ্য, যা বাড়ির পুরুষ সদস্যরা সাজান। সন্ধিপুজোর নৈবেদ্যে থাকে বিবিধ ফল, ভোজ্য, সবজি ও মিষ্টান্ন। আর নিবেদিত হয় ১০৮ জবার মালা, ১০৮ অপরাজিতার মালা, ১০৮ বেলপাতার মালা, ১০৮ সদ্য প্রস্ফুটিত পদ্ম এবং ১০৮ প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ। দাঁ পরিবারের পুজোর আরও একটি  বৈশিষ্ট্য হল, সন্ধিপুজোর শুরুতে এবং সন্ধিপুজোর শেষে আরতি শুরুর সময় গর্জে ওঠে কামান ও বন্দুক।

মহানবমীর দিন সকালে হয় কুমারীপুজো। একজন ব্রাহ্মণ কুমারীকে (সাধারণত অনধিক ১০ বছর বয়স) নতুন বস্ত্র, ফুল ও অলংকারে সাজিয়ে নৈবেদ্য নিবেদন করে পুজো করা হয়। এর পর হোম, দক্ষিণান্ত ও শান্তিজল প্রদানের পর মহানবমী পূজা শেষ হয়। সেই সঙ্গে সমাপ্তি হয় দুর্গাপূজার।  

দাঁ-বাড়িতে অন্নভোগের প্রচলন নেই। এখানে দেবীকে নানা রকমের মিষ্টান্ন (গজা, পানতুয়া, মিহিদানা ইত্যাদি) ও লুচিভোগ নিবেদন করা হয়। পুজোর আয়োজনের কাজ, পুষ্পাঞ্জলি প্রদান, সন্ধিপুজো, নবপত্রিকার স্নানযাত্রা ইত্যাদির সময়ে সকলের গারদ বা বেনারসি জোড় বা শাড়ি পরা বাধ্যতামূলক।

সন্ধিপূজার নৈবেদ্যের একাংশ।

বিজয়াদশমীর সকালে ‘ঘট বিসর্জন’ ও ‘দর্পণ বিসর্জন’-এর মাধ্যমে দেবীর বিসর্জন সূচিত হয়। এর পর বাড়ির সদস্যরা বেলপাতায় বা কলাপাতায় দুর্গানাম লিখে মায়ের চরণে নিবেদন করে তাঁর পদধূলি গ্রহণ করেন। দুপুরে প্রতিমা বরণের পর বধূরা মায়ের সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে মা-কে মিষ্টিমুখ করিয়ে মায়ের কাছে আকুল প্রার্থনা করেন – ‘আসছে বছর আবার এসো মা’। সবশেষে কনকাঞ্জলি প্রদানের পর বাড়ির বাইরে নিয়ে আসা হয় প্রতিমা। বাড়ির সামনে রাস্তায় প্রতিমাকে সাতপাক ঘোরানো হয়। ওই সময় বন্দুক দেগে মা-কে বিদায় সম্ভাষণ জানানো হয়।

আগে বিসর্জনে বেশ কিছু প্রথা ছিল। বিসর্জনযাত্রার শুরুতে নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো হত, সে যেন কৈলাশে গিয়ে মহাদেবকে মায়ের ফিরে যাওয়ার খবর দেয়। গঙ্গাবক্ষে দুই নৌকার মাঝে প্রতিমাকে বসিয়ে বিসর্জন দেওয়া হত। বিসর্জনের পর আবার একটি নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো হত, সে যেন বাপের বাড়িতে খবর দেয় মা কৈলাশে ফিরে গেছেন আর বলে গেছেন, আসছে বছর আবার আসবেন। নৌকা থেকে বিসর্জন ও নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর প্রথা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন গঙ্গার ঘাট থেকেই মায়ের বিসর্জন হয়। বিসর্জনের আগে প্রতিমার চালচিত্র থেকে একটি কলকা খুলে নেওয়া হয় এবং পরের বছরে প্রতিমার চালচিত্রে ওই কলকাটি লাগিয়ে দিয়ে পরম্পরা রক্ষা করা হয়।

পুজোর ক’দিন সন্ধ্যায় দাঁ-বাড়িতে বসে আগমনী গান, যাত্রাপালা, ভক্তিমূলক গান বা পাঠের আসর। এই পুজোয় শুধু দাঁ-বাড়ির সদস্যরাই নন, এ পরিবারের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশীরা যোগদান করে পুজোর আনন্দ উপভোগ করেন।

(ঋণ স্বীকার: অভ্রদীপ দাঁ, দাঁ-বাড়ির সদস্য, ছবি দাঁ-বাড়ির সৌজন্যে সংগৃহীত)

আরও পড়তে পারেন   

বলরাম দে স্ট্রিটের দত্তবাড়ির পুজোয় কুমারীপুজোর সঙ্গে হয় সধবাপুজোও

চুঁচুড়ার মণ্ডল পরিবারে আরাধনা হয় শিবদুর্গার

রাজা কংসনারায়ণের উত্তরপুরুষরা পরিবারের প্রাচীন অষ্টধাতু-দুর্গার পুজো করছেন জলপাইগুড়ির পাণ্ডাপাড়ায়

কামারপুকুরের লাহাবাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন শ্রীরামকৃষ্ণ

সিঙ্গি গ্রামের ভট্টাচার্য বংশের ৩৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো ‘মঠের বাড়ির দুর্গোৎসব’

হুগলির জোলকুলের ভট্টাচার্য পরিবারের দুর্গাপুজোর এ বার ২১৭ বছর

দু’ দিন পরেই বোধন, সাবর্ণদের আটচালাবাড়িতে শুরু হয়ে যাবে ৪১২তম বছরের দুর্গাপুজো

রাজা নবকৃষ্ণ দেবের নির্দেশেই ১৭৫৭-য় শুরু হয়েছিল কলকাতার সব চেয়ে জাঁকজমকের পুজো

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন