নিজস্ব প্রতিনিধি: বাঙালির ভ্রমণের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে একটি শব্দগুচ্ছ, ‘বড়ো ঘড়ি।’ এই মোবাইলের যুগেও বড়ো ঘড়ির গুরুত্ব অপরিসীম। হাওড়া স্টেশনের পুরোনো কমপ্লেক্সের এই ঘড়ির তলায় দাঁড়ানো মানেই ভ্রমণের শুরু।

বালিগঞ্জের একুশ পল্লীর পুজোমণ্ডপের ভেতরে প্রবেশ করে একটু ডান দিকে ওপরে তাকালেই সেই বড়ো ঘড়িটা। মনে হবে যেন হুবহু হাওড়া স্টেশন থেকে খুলে এখানে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে শুধুমাত্র এই বড়ো ঘড়িই নয়, পুজোমণ্ডপটি এমন ভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে, যাতে সকল ভ্রমণপ্রিয় মানুষ আবেগে ভাসবেনই।

গত দু’ বছরের দুঃসহ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে মানুষ এ বার মুক্ত। করোনা নামক সেই অসুর এখন গুরুত্বহীন। এই সুযোগে তাঁরা আবার ভ্রমণমুখী হয়ে উঠেছেন। আমাদের শরীরকে ভালো রাখার অন্যতম উপকরণই হল ভ্রমণ। তাই সে যতই বিভিন্ন ভাবে ভ্রমণের বিরুদ্ধে ভয় দেখানো হোক না কেন, মানুষ বেরিয়ে পড়েছেন ঠিকই। কিন্তু কোথাও যেন সেই স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপারটা ছিল না। ভ্রমণে বেরোলেও একটা ভয় সব সময় কাজ করত। এই বুঝি অসুস্থ হয়ে ফিরতে হয়। কিন্তু এ বার সেই সবের আর বালাই নেই। মানুষ এ বার মুক্ত।

‘মুক্ত’- মণ্ডপের দেওয়ালে এই শব্দটা জ্বলজ্বল করছে, আরও তিনটে শব্দের সঙ্গে, ‘ভ্রমণ’, ‘গন্তব্য’, ‘ছুটি।’ আসলে ভ্রমণ মানেই তো মুক্তি, ভ্রমণ মানেই তো ছুটি, তাই না? একুশ পল্লীর এই মণ্ডপ সজ্জার সব পরিকল্পনা করেছেন শিল্পী দম্পতি সুমি এবং শুভদীপ মজুমদার।

গোটা থিমটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সুমি বলেন, “পুজো মানেই ছুটি আর ছুটি মানেই ভ্রমণে বেরিয়ে পড়া। গত দু’ বছর করোনার জাঁতাকলে পড়ে ভ্রমণ অনেকটাই স্তব্ধ ছিল। এ বার পরিস্থিতি একেবারেই অন্য রকম। আমরা সবাই বেরিয়ে পড়ছি আবার। এই গোটা ব্যাপারটাই আমরা মণ্ডপে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি।”

সেই কারণেই একুশ পল্লীর থিমের নাম দেওয়া হয়েছে ‘শুভ যাত্রা।’ মণ্ডপসজ্জায় একটা ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। ভ্রমণে বেরোনোর আগে প্রথমে আমরা তথ্য সংগ্রহ করি। তার পর ভ্রমণের আগের দিন ব্যাগ গুছিয়ে নিই। ভ্রমণের দিক বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমরা ট্যাক্সি ধরি স্টেশন বা বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য।

মণ্ডপের বাইরের সজ্জায় সব থেকে যেটা নজর কাড়বে, তা হল একটি ক্যামেরা। এটি কিন্তু ভ্রমণের অন্যতম উপকরণ। ক্যামেরা ছাড়া ভ্রমণ ভাবাই যায় না। দু’-তিন দশক আগে যখন ডিজিটাল ক্যামেরার যুগ শুরু হয়নি, তখন ভ্রমণের অন্যতম উপাদান ছিল পেনট্যাক্সের ক্যামেরাগুলো।

সেই ক্যামেরাই তৈরি করা হয়েছে মণ্ডপের বাইরে। ক্যামেরার ঠিক নীচে দু’টো ট্যাক্সি আঁকা রয়েছে, তার তলায় বেশ কিছু ব্যাগ রাখা হয়েছে। বাইরের দেওয়ালে অন্য একটা দিকে অসংখ্য মাইলফলক আঁকা হয়েছে।

মানুষের ভ্রমণের ইচ্ছেটাকে চাগাড় দেওয়ার জন্য এই বাইরের সজ্জাই যথেষ্ট। এর পর আপনি মণ্ডপের ভেতরে ঢুকলেন। প্রথমেই নজরে পড়বে বড়ো ঘড়িটা। অন্য একটা দিকে তাকালে আপনার মনে হবে আপনি বিমানবন্দরে। অর্থাৎ, হাওড়া বা দমদম বিমানবন্দরে আপনি চলে এসেছেন, যেখান থেকে ট্রেন বা উড়ানে উঠে এ বার আপনার ভ্রমণ শুরু।

গোটা মণ্ডপটা দেখতে দেখতে আপনি দুর্গা প্রতিমার দিকে এগিয়ে যাবেন। প্রথমেই বাঁ দিকে খেয়াল করুন — বাংলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের ব্যাপারে সুন্দর করে বেশ কিছু ছড়া লেখা রয়েছে। এর পর আপনার নজর পড়বে দেওয়ালের আরেকটা দিকে। সেখানে ট্রেন এবং বিমানের টিকিট রাখা আছে।

হাওড়া-শিয়ালদহ স্টেশন বা দমদম বিমানবন্দরে দাঁড়ালে সবার প্রথমে আমরা যা দেখি সেটা হল বিভিন্ন ট্রেন বা উড়ানের বিষয়ে তথ্য। মণ্ডপের অন্দরসজ্জায় শোভা পাচ্ছে তাও।

ট্রেন বা বিমানে উঠলে আমাদের সবার নজর থাকে জানলার ধারের আসনটির ওপরে। প্লেনের জানলার ধারে বা ট্রেনের জানলার ধারে বসলে যে দৃশ্য আমরা দেখি, সেটা এখানে ডিজিটাল ডিসপ্লের মাধ্যমে খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ওর পাশে আপনি দাঁড়ালে মনে হবে, আপনি সত্যিই ট্রেন বা উড়ানে উঠে পড়েছেন।

সেই যাত্রা শেষে আপনি এ বার পৌঁছে যাবেন আপনার গন্তব্যে। প্রতিমার ঠিক কাছেই দু’ দিকের দেওয়ালে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেই সব ছবি। নীচের দিকে রয়েছে স্লিপিং বুদ্ধ। দার্জিলিং বা কালিম্পং পাহাড়ের বিভিন্ন দিক থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার এক এক রকম চেহারা দেখা যায়। মণ্ডপের স্লিপিং বুদ্ধর ছবিটা অনবদ্য ভাবে রাখা হয়েছে। তার এক দিকে দাঁড়ালে মনে হবে যেন হাতের মুঠোয় সে। আবার অন্য দিকে দাঁড়ালে মনে হবে স্লিপিং বুদ্ধ কিছুটা দূরে যেন।

স্লিপিং বুদ্ধর ঠিক ওপরেই অনেকগুলো ড্রয়ার। কিছু ড্রয়ার খোলা, বেশ কিছু ড্রয়ার বন্ধ। খোলা ড্রয়ারগুলোতে বিভিন্ন গন্তব্যের ছবি চিত্রাঙ্কনে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পুরুলিয়ার মুরগুমা, অযোধ্যা পাহাড়, বাঁকুড়ার শিউলিবনা-সহ অনেক কিছু গন্তব্যের ছবি। আবার বন্ধ ড্রয়ারগুলোয় শহুরে জীবনযাপনের ছবি।

এই প্রসঙ্গে সুমি বলেন, “এর মাধ্যমে আমরা দু’টো জিনিস বোঝাতে চেয়েছি। বন্ধ ড্রয়ার মানে শহুরে ব্যস্ততার মধ্যে আটকে থাকা। খোলা ড্রয়ারের অর্থ হল সেই ব্যস্ততাকে দূরে সরিয়ে ভ্রামণিকদের বেরিয়ে পড়া, মুক্ত হওয়ার জন্য।”

প্রতিমার ঠিক সামনে রয়েছে বাংলার বিভিন্ন মন্দিরের ছবি। রয়েছে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের ছবিও। আসলে পুরী ওড়িশায় হলেও বাঙালির থেকে পুরীকে কোনো ভাবেই বিচ্ছিন্ন করা যায় না তো, তাই পুরীকেও রাখা হয়েছে গোটা থিমের মধ্যে।

বাংলার পর্যটনের দু’টি সব থেকে বড়ো হল দক্ষিণের সুন্দরবন এবং উত্তরের চা-বাগান। খুব সুন্দর ভাবে এই দু’টো আঙ্গিককেও তুলে ধরা হয়েছে মণ্ডপসজ্জায়। শোভা পাচ্ছে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের একটি ছবিও।

ঠিক নীচে জামাকাপড় ভর্তি তিনটে বড়ো ব্যাগ রয়েছে, জামাকাপড়ে ভরা। একটি ব্যাগে শীতের জায়গার জামাকাপড়, একটিতে সমুদ্রের জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার জামাকাপড় এবং একটিতে ট্রেকিং যাওয়ার জামাকাপড় রাখা। 

সুন্দর করে সাজিয়ে তোলা হয়েছে সিলিংটাও। আঁকার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে শরতের নীল আকাশ, মেঘের মধ্যে দিয়ে চাঁদের ভেসে যাওয়া ইত্যাদি।

যেখানে দেবী প্রতিমা রয়েছেন, সেই জায়গার সজ্জা ভালো করে দেখলে আপনার মনে হবে যে কৈলাশের দৈনন্দিন ব্যস্ততার জীবন থেকে বেরিয়ে উমা বাপের বাড়ি আসতে পেরে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। ঠিক আমরা যে ভাবে বাইরে বেরোলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। সব মিলিয়ে একুশ পল্লীর এই মণ্ডপসজ্জা প্রত্যেক ভ্রমণপ্রিয় মানুষকে কাছে টেনে নেবেই। পুজো মানেই তো থিমের লড়াই। এর মধ্যে এই মণ্ডপের থিম কিন্তু অত্যন্ত উদ্ভাবনী।

এই মণ্ডপকে সাজিয়ে তোলার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বীথি কর, অর্পণ ভট্টাচার্য, তারকনাথ মুখোপাধ্যায় এবং দেবার্পন দে। তাঁদের ক্যামেরায় তোলা বিভিন্ন ছবি আঁকার রূপে এই মণ্ডপে স্থান পেয়েছে।

সেই ছবিগুলিকে আঁকার রূপ দিয়েছেন অভিজিৎ দাস, প্রীতম দাস, সায়ন্তিনী মুখোপাধ্যায়, প্রীতিষা শীল, সুষম পাঠক, মিলন মণ্ডল, জয় মুখোপাধ্যায়, সমাপ্তি ধাড়া, শঙ্কর ঘোষ, সমীর দাস এবং নেহা রায়। মণ্ডপের ভেতরে ভ্রমণের ছড়াগুলি লিখেছেন পৌলমী বসু।

আজ পঞ্চমী। পুজো শুরু হয়ে গেল। একুশ পল্লীর মণ্ডপও সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এ বার এই পুজোর ৭৬তম বর্ষ। আগামী পাঁচ দিন বালিগঞ্জের বন্ডেল রোডে দর্শনার্থীরা ভিড় বাড়ুক, এখনও যারা ঘরের মধ্যে বন্দি রয়েছে রয়েছেন তাঁরাও ভ্রমণে বেরিয়ে পড়তে উৎসাহ পাক, সেটাই কাম্য।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন