দু’ দিন পরেই বোধন, সাবর্ণদের আটচালাবাড়িতে শুরু হয়ে যাবে ৪১২তম বছরের দুর্গাপুজো

0
আটচালা বাড়ির দুর্গাপূজা।
আটচালা বাড়ির দুর্গাপূজা।

পাপিয়া মিত্র

দু’ দিন পরেই ১৩ আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, বৃহস্পতিবার, কৃষ্ণানবমী তিথি। সকালেই বোধন হয়ে যাবে মা দুর্গার। মা চলে আসবেন আটচালা বাড়িতে। কার্যত শুরু হয়ে যাবে ৪১২তম বছরের পুজো।

মনে হয় এই তো সে দিনের কথা। দশটি থামের মাথায় কড়িবরগার ছাদ আর তার নীচে বসে আটচালা বাড়ির কর্তাব্যক্তিরা। দরকারি কথাবার্তার জন্য সামনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকজন। দুর্গাদালানে ওঠার নিয়ম না থাকলেও চাঁদনির নীচে বসা যেতেই পারে। বাড়ির ভিতরে ইংরেজদের ঢোকার অনুমতি নেই। তাই সব কথা এখানে বসেই।

একটু একটু করে চলে গেছে ৪১১টা বছর। থামের গা ঘেঁষেই ছিল গোলপাতার ছাউনি দেওয়া দুর্গামণ্ডপ। সে সব আজ আর নেই, ক্রমে টালির চাল হয়ে এখন কংক্রিটের ছাদ। তারই নীচে বড়িশা সাজের আটচালার দুর্গাপুজো।

Shyamsundar

সাজের আটচালার রাধাকৃষ্ণের মন্দিরের ভিতরে দেবী দুর্গার বোধনঘর। কাঠামোর গড়ন একই চলে আসছে। জন্মাষ্টমীর দিন কাঠামো পুজো হয়। কাঠামোর মূল বাঁশখণ্ডটির দৈর্ঘ্য ৬ ফুট। ৩১ বছর ধরে ঠাকুর গড়ে চলেছেন শ্যামল পাল। তাঁর ব্যস্ততা তুঙ্গে। প্রতিমার গায়ের রঙ শিউলি ফুলের বৃন্তের রঙের মতো। সাজসজ্জার ঘরানা চিরাচরিত।

পুজোর নানা কথা বললেন সাবর্ণবাড়ির দুই বউমা মালবিকা রায়চৌধুরী ও সাগরিকা রায়চৌধুরী। জানালেন, পুজোর চার দিনে প্রতিমাকে ভোগ নিবেদনের কথা। কথায় কথায় আটচালায় তখন অন্ধকার নেমে আসছে। চোখে ভেসে উঠল সপ্তমীর সকালে ভোগ নিবেদন করা হচ্ছে। ঢাক-কাঁসরের বাজনায় মায়ের মুখ উজ্জ্বল। ভোগ দেওয়া হয়েছে খিচুড়ি, পাঁচ রকম ভাজা, ডালনা, মাছের মধ্যে কাতলা, রুই, ভেটকি, ইলিশের পদ, চাটনি, পায়েস। সন্ধিপুজোর সময়ে দেবীদালানে আরও একটি ভোগ দেওয়ার কথা জানালেন তাঁরা। অসুরকে দেওয়া সেই ভোগ প্রতিমার সামনে রান্না করা হয়। তিনি পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠাদের কাছে শুনেছিলেন, “যখন দুর্গা অসুরকে বধ করেন তখন অসুর মাকে বলেন মর্ত্যে কেউ তাকে পুজো করবে না। যখন তোমাকে ভোগ দেবে, তখন আমার জন্য ভোগ চেয়ে নিও।”

সেই আটচালা, কত ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী।

সন্ধিপুজোর সেই সময়টুকুর মধ্যে পাটকাঠি আর নারকেলপাতার জ্বালে মাটির হাঁড়িতে গঙ্গাজল, গাওয়া ঘি সহযোগে চালডাল রান্না করে একটি ল্যাটামাছ পোড়া দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। বলির জন্য সাদাভোগ দেওয়া হয়। নবীন প্রজন্মের অনিচ্ছায় পশুবলি বন্ধ হয়েছে।

দশমীতে পান্তা ভাত, কচুশাক, ল্যাটামাছ, পাঁচ রকম ভাজা, চালতার টক খাইয়ে মাকে বাপের বাড়ি পাঠানো হয়। এক সময় প্রতিমা নিরঞ্জন হত মানুষের কাঁধে চেপে আদিগঙ্গায়। এখন গাড়িতে আউট্রাম ঘাটে। ৩৫তম প্রজন্মের তথাগত রায়চৌধুরী জানালেন, পারিবারিক এই পুজোয় সকলের উপস্থিতি খুবই আনন্দ দেয়। অষ্টমী আর দশমীতে বাড়িতেই থাকেন। কারণ বিজয়ার প্রণাম করতে সকলকে যেতে হয় পরিবারে যিনি প্রবীণ, তাঁর কাছে।

এই সাজের আটচালা পুজোটি বাংলার প্রাচীন পারিবারিক পুজো। নবীন প্রজন্মের কাছে এর ইতিহাস খোলা থাকুক। বাংলায় শাসনকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন আদিশূর। কনৌজ থেকে তিনি পাঁচ জন ব্রাহ্মণকে বাংলায় নিয়ে এলেন। তাঁদের মধ্যে সৌভবী একজন ও তাঁর পুত্র বেদগর্ভ হলেন সাবর্ণ রায়চৌধুরী বংশের প্রথম পুরুষ। পরবর্তী দুশো বছরের সময়টা হল বল্লাল সেনের রাজত্বকাল। এই সময় বেদগর্ভ গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলে বসবাস করায় গঙ্গোপাধ্যায় উপাধিতে ভূষিত হন।

এখান থেকে শুরু, বহু কাল গত হয়েছে। ২১তম পুরুষ কামদেব ব্রহ্মচারীর (জিয়া) সময়ের কিছু কাল আগে সাবর্ণ বংশের পূর্বপুরুষরা স্থায়ী ভাবে হালিশহরে বাস করতেন। জিয়ার বিবাহ হয় পদ্মাবতীর সঙ্গে। ১৫৭০ সাল, জিয়া-পদ্মাবতীর সন্তান লক্ষ্মীকান্ত। সন্তানের জন্ম দিয়ে পদ্মাবতী মারা যাওয়ায় আর সংসারে থাকতে চাননি জিয়া। সন্ন্যাস নিয়ে কাশীতে গিয়ে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ মোঘল সম্রাটের সেনাপতি মানসিংহ তাঁর কাছে দীক্ষা নেন। গুরুদক্ষিণা হিসেবে লক্ষ্মীকান্তকে দিলেন জমিদারি।

কলিকাতা, গোবিন্দপুর ও সুতানুটি নিয়ে সাবর্ণদের জমিদারির পত্তন। লক্ষ্মীকান্ত আটচালায় শুরু করলেন দুর্গাপুজো। সালটা ১৬১০ খ্রিস্টাব্দ। ইতিমধ্যে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে। অনেক ভাঙাগড়া উত্থানপতন দেখেছেন বড়িশার সাবর্ণরা। কিন্তু পুজোর প্রথা, রীতিনীতিতে আজও অমলিন আটচালাবাড়ির দুর্গাপুজো।

আরও পড়তে পারেন

রাজা নবকৃষ্ণ দেবের নির্দেশেই ১৭৫৭-য় শুরু হয়েছিল কলকাতার সব চেয়ে জাঁকজমকের পুজো

পাণ্ডবেশ্বরের নবগ্রামে তিন শরিকের পুজোয় মা দুর্গা আসেন ব্যাঘ্রবাহিনী রূপে

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন