অষ্টম বর্ষপূর্তির হর্ষ অনুষ্ঠানে ‘স্পর্শ’-এর সার্থক পরশ

0
প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে 'স্পর্শ'-এর অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা। প্রজ্জ্বলনে সাহায্য করছেন 'স্পর্শ'-এর সভাপতি সুজিত চক্রবর্তী ও সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার দে।

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: সমাজসেবায় যাঁরা নিবেদিতপ্রাণ, যাঁরা নানা ভাবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান, যাঁরা সমাজ উন্নয়নের বিভিন্ন কাজে ব্রতী, প্রতি বছর তাঁদের সম্মানিত করে মধ্য কলকাতার ‘স্পর্শ’। পাশাপাশি ‘স্পর্শ’ নিজেও মানুষের সেবায় মগ্ন থাকে।

চারিদিকে খারাপ খবরের ভিড়ে হারিয়ে যায় ভালো খবরগুলো। তার ওপর ভালো খবর যাঁরা সৃষ্টি করেন, তাঁরা যদি প্রচারের আড়ালে থেকে কাজ করে যান তা হলে তো সেই খবর পাওয়া আরও দুষ্কর হয়ে ওঠে।

তবে রয়েছে ‘স্পর্শ’। যাঁরা ভালো খবর সৃষ্টির কারণ হয়েও পাদপ্রদীপের আলো থেকে দূরে থাকেন, বা দূরে থাকতে পছন্দ করেন, তাঁদের খুঁজে আনে ‘স্পর্শ’। আর শুধু খুঁজেই আনে না, সংগঠনের ‘হর্ষ অনুষ্ঠানে’ তাঁদের সম্মানিত করে ধন্য হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের সেক্রেটারি স্বামী সর্বলোকানন্দ মহারাজ।

করোনা অতিমারির জন্য গত বছর ‘হর্ষ অনুষ্ঠান’ পালন করতে পারেনি ‘স্পর্শ’। এ বার অষ্টম বর্ষের সেই অনুষ্ঠান হল সুবর্ণবণিক সমাজ হলে। ধারাবাহিক ভাবে সমাজ উন্নয়নমূলক কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সেই হর্ষ অনুষ্ঠানে বিশেষ ভাবে সম্মান জানানো হল বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনকে।

এ দিন যাঁরা সম্মানিত হলেন তাঁদের মধ্যে যেমন রয়েছেন বিপিন গনোত্রা, পার্থ কর চৌধুরী আর শ্যামল মাজির মতো মানুষ, তেমনই রয়েছে এমারজেন্সি ব্লাড সারভিস, মহাজীবন আর হৃদয়পুর নবসোপান-এর মতো সংগঠন।

বিপিন গনোত্রাকে সম্মাননা প্রদান।

সমাজকে আরও সুন্দর করার জন্য, সমাজকে আর একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কী ভাবে লড়াই চালাচ্ছেন এঁরা দেখে নেওয়া যাক।

‘ফায়ারম্যান’ বিপিন গনোত্রা। ১২ বছর বয়সে দাদা নরেন্দ্রকে দীপাবলির দিন আগুনে পুড়ে যেতে দেখেছিল। এক মাস ধরে যমে-মানুষে টানাটানির পর মৃত্যু। এই ঘটনা কিশোর বিপিনের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। সেই বয়সেই সে ঠিক করে, আর কাউকে আগুনে পুড়ে মরতে দেবেন না।

সেই কিশোর বিপিন আজ ৬২ বছরের প্রৌঢ়। থাকেন স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনের বিপরীতে ছোট্ট একটি ফ্ল্যাটে। পাঁচ দশক ধরে নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে লোকের প্রাণ বাঁচিয়ে চলেছেন বিপিন। ১৯৯৪ সালে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার তাঁকে স্বেচ্ছাসেবী দমকলকর্মী হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। ২০১৭-য় তিনি পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন। 

‘হসপিটাল ম্যান’ -কে সম্মাননা জানাচ্ছেন স্বামী সর্বলোকানন্দ।

কিংবা ধরা যাক ‘হসপিটাল ম্যান’-এর কথা। ছ’ বছর আগে সমাজসেবা শুরু করেন কালীঘাটের বাসিন্দা পার্থ কর চৌধুরী। শহরের তিনটি হাসপাতালে রোগীদের আত্মীয়পরিজনকে বিনামূল্যে রাতের খাবার সরবরাহ করা। করোনা অতিমারিতেও তাঁর সমাজসেবা চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধু খাবার বিলিই নয়, বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ, চিকিৎসকের পরামর্শের ব্যবস্থা, মুমূর্ষু রোগীর জন্য বিনামূল্যে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা – সব করছেন তিনি। আজ তিনি তাই ‘হসপিটাল ম্যান’ নামে সুপরিচিত।

দারিদ্র্য কী, নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছেন শ্যামল মাজি। সেই সূত্রেই সমাজসেবায় মগ্ন বোলপুরের এক কোচিং সেন্টারের মালিক। এমনিতেই গরিব ছাত্রছাত্রীদের নিখরচায় টিউশন দেন। ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা চালাতে না পারলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, বই কিনে দেন। গ্রামে গ্রামে দুঃস্থ মানুষের চিকিৎসার জন্য নিজের খরচে স্বাস্থ্য শিবির করেন।

শ্যামল মাজিকে সম্মাননা প্রদান করছেন ‘স্পর্শ’-এর সভাপতি সুজিত চক্রবর্তী।

এ বার কোভিড অতিমারিতে শ্যামলবাবু দাঁড়িয়ে পড়লেন আর্ত মানুষের পাশে।লকডাউনের সময় থেকে আজও তিনি রাতের অন্ধকারে কখনও গরিব মানুষের ঘরে, কখনও বা পরিযায়ী শ্রমিকদের দরজায় খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁর ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে। পরিবেশ নিয়েও ভাবনাচিন্তা করেন শ্যামলবাবু। ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে গ্রামে গ্রামে পুকুরপাড়ে গাছ লাগান। এখন চেষ্টা করছেন স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের উপযোগিতা নিয়ে গ্রামের পিছিয়ে পড়া মেয়েদের সচেতন করতে।

এ বার কিছু সংগঠনের কথা।

অসহায় মানুষদের জন্য নিখরচায় রক্তের ব্যবস্থা করে থাকে এমারজেন্সি ব্লাড সার্ভিস। ফোনে ডাকলেই দুয়ারে হাজির হয়ে যান এই সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকরা। রাজ্যের প্রায় প্রতিটি জেলায় এদের স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করে চলেছেন। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় প্রতি মাসে নিয়মিত রক্তদান শিবিরের আয়োজন করে এই সংগঠন। এ ছাড়াও দুস্থ অসহায় মানুষদের জন্য খাবার, মাসিক রেশন, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পেরও ব্যবস্থা করে এমারজেন্সি ব্লাড সার্ভিস। বর্তমানে সোশ্যাল সাইটে ১০ হাজার ৫০০ সক্রিয় সদস্য রয়েছে এই সংগঠনের। এলাকা অনুযায়ী রাজ্যের প্রায় প্রতিটি জায়গায় এক জন করে দায়িত্বে রয়েছেন।           

স্পর্শ’-এর পক্ষ থেকে ‘মহাজীবন’কে সম্মাননা প্রদান। সম্মাননা গ্রহণ করছেন সংগঠনের সভাপতি মৈত্রেয়ী ব্যানার্জি।

পথবাসী, দরিদ্র শিশুদের নেশার অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরাচ্ছে ‘মহাজীবন’, যার সভাপতি মৈত্রেয়ী ব্যানার্জি। বছর কয়েক আগে মৈত্রেয়ী দেখেছিলেন কী ভাবে দারিদ্র্যের চাপে পড়ে নেশায় ডুবে যাচ্ছে অসহায় শিশুগুলো। তারা নিজেরাই বলেছিল, ডেনড্রাইটের গন্ধ শুঁকলে ঘুম পায় আর ঘুম পেলে আর খিদে থাকে না। ভিক্ষে করে যা পাওয়া যায় তাতে তিন বেলা খাবারের খরচ জোটে না, তার চেয়ে ডেনড্রাইট অনেক সস্তা। শুধু তা-ই নয়, ৭ থেকে ১১ বছর বয়সি এই শিশুগুলো দারিদ্যের সঙ্গে যুজতে গিয়ে অন্ধকার জগতে গিয়ে পড়ে। এই অসহায় শিশুদের একটা সুস্থ জীবন দেওয়ার জন্য শহরের এনজিও ‘মহাজীবন’-এর মাধ্যমে সমাজসেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েন মৈত্রেয়ী দেবী।

হৃদয়পুর নবসোপান-কে সম্মাননা প্রদান।

নানা ধরনের ব্যাঙ্কের কথা শোনা যায়। কিন্তু ফুড ব্যাঙ্কের কথা কি শোনা যায়? উত্তর ২৪ পরগণার হৃদয়পুরের হৃদয়পুর নবসোপান সেই ব্যাঙ্কের ব্যবস্থা করেছে। প্রান্তিক শিশু-কিশোর, অসহায় বয়স্ক, মহিলা ও ভবঘুরেদের জন্য নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা করে এরা। এখন হৃদয়পুর স্টেশন ও স্টেশন সংলগ্ন এলাকার অবলা প্রাণীদের জন্যও এক বেলা অন্নের ব্যবস্থা করছে নবসোপান।                       

উন্মেষা ও পূর্ণাশার প্রয়াসে রামকৃষ্ণ অনাথ ভাণ্ডারের অনাথদের শীতবস্ত্র ও কম্বল বিতরণ।

‘স্পর্শ’ যে শুধু লড়াকু, ব্যতিক্রমী মানুষ আর সংগঠনকে সম্মানিত করে তা নয়, সে নিজেও বসে থাকে না। এই সংগঠনও নিয়ত সমাজসেবায় মেতে আছে। নানা ভাবে নিয়মিত সাহায্য করে যাচ্ছে রামকৃষ্ণ অনাথ ভাণ্ডারকে। এ বার তারা অনাথ ভাণ্ডার-এর অনাথদের হাতে শীতবস্ত্র ও কম্বল তুলে দিল। আর সেই কাজ করতে ‘স্পর্শ’কে সাহায্য করেছে দুই স্কুলপড়ুয়া বোন উন্মেষা চট্টোপাধ্যায় ও পূর্ণাশা চট্টোপাধ্যায়। সমাজের জন্য যে কিছু করা উচিত, সেই বোধ তাদের মধ্যে এখনই চারিত হয়ে গিয়েছে। তাই টিফিনের পয়সা জমিয়ে তারা সেই অর্থ ‘স্পর্শ’-এর হাতে তুলে দিয়ে সমাজসেবায় এগিয়ে এসেছে।    

এ দিন প্রধান অতিথি হিসাবে ‘স্পর্শ’-এর এই ক্রিয়াকর্মের সাক্ষী থাকলেন নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের সেক্রেটারি স্বামী সর্বলোকানন্দ মহারাজ। সমাজসেবার গুরুত্ব কোথায়, মহারাজজি তাঁর ভাষণে তা বুঝিয়ে দেন খেতড়ির মহারাজকে লেখা স্বামীজির এক চিঠির মাধ্যমে।

কম্বল বিতরণ করছেন ‘স্পর্শ’-এর মুখ্য উপদেষ্টা শান্তনু চট্টোপাধ্যায়।

বিশেষ অতিথি হিসাবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিখ্যাত ভ্রামণিক ও ভ্রমণ-লেখক রথীন চক্রবর্তী, বেঙ্গল অর্গান ডোনেশন সোসাইটির সহ-সভাপতি ডা. ইন্দ্রজিৎ তিওয়ারি, সাংবাদিক শম্ভু সেন প্রমুখ। এ ছাড়াও মঞ্চে ছিলেন ‘স্পর্শ’-এর সভাপতি সুজিত চক্রবর্তী, মুখ্য উপদেষ্টা কলকাতা পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার শান্তনু চট্টোপাধ্যায়, মুখ্য পৃষ্ঠপোষক ডা. শুভাশিস গুহ, চিফ মেন্টর রাজেশ চন্দ্র, সংস্থার তিন উপদেষ্টা রোহিত কুমার শুক্লা, রাজকুমার মোদী ও রবীন্দ্রনাথ মল্লিক এবং কার্যকরী সভাপতি রঞ্জন সিনহা।

দেবপ্রিয়া গুহের উদ্বোধনী সংগীত ও বিশিষ্ট অতিথিদের হাতে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। ‘স্পর্শ’-এর কাজকর্ম সম্পর্কে উপস্থিত জনমণ্ডলীকে অবহিত করেন সংগঠনের সভাপতি সুজিত চক্রবর্তী এবং মুখ্য উপদেষ্টা শান্তনু চট্টোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানের শেষে সকলকে ধন্যবাদ জানান ‘স্পর্শ’-এর সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার দে। সমগ্র অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন বিশ্বনাথ গোস্বামী।

স্বাগত ভাষণ দিচ্ছেন ‘স্পর্শ’-এর সভাপতি সুজিত চক্রবর্তী।

‘স্পর্শ’-এর এই প্রয়াসকে সাধুবাদ জানালেন প্রত্যেক অতিথিই। তাঁরা কামনা করলেন, এ ভাবেই আরও এগিয়ে যাক ‘স্পর্শ’। সমাজের আরও অন্দরে, আরও অন্তরে পৌঁছে যাক তারা।

আরও পড়তে পারেন

পুরভোটে কোভিড আক্রান্তদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিল রাজ্য নির্বাচন কমিশন

সংক্রমণ কমে পাঁচশোর দোরগোড়ায়, সংক্রমণের হারও সোমবারের তুলনায় অনেক কম

লক্ষ্য তৃণমূলকে জাতীয় রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক করে তোলা, কৌশল প্রশান্ত কিশোরের

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন