papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

এখন শুধু শীতকালেই মেলাপার্বণ থেমে থাকে না। বিশেষ করে বইমেলা। বসন্ত সমাগমেও বইমেলার অস্তিত্ব টিকে থাকে। ফাগ-বসন্তের আবহে ব্লাইন্ড স্কুলের মাঠে চলল দশ দিনের বৃহত্তর বেহালা বইমেলা। সূচনা হয়েছিল ১৫ মার্চ। আয়োজক ছিল অথরস আর্টিস্টস পাবলিশার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। উদ্বোধন করেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার কর্নেল ভূপাল লাহিড়ী।

বইয়ের সম্ভারের পাশাপাশি এই বইমেলায় সাজানো হয়েছিল নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ডালিও। মাঝ-বসন্তে হঠাৎ হঠাৎ ঝড়জলের আবির্ভাবে বইমেলায় পাঠক-দর্শকের তেমন ভিড় না হলেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দর্শকের কমতি ছিল না। তার একটাই কারণ। বেহালায় সংস্কৃতি-চর্চা দিনে দিনে সমৃদ্ধ হচ্ছে। পূর্ব নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বইমেলায় সমবেত গান, শ্রুতিনাটক, নৃত্যানুষ্ঠান, বসে আঁকো প্রতিযোগিতা, বিশ্ব কবিতা দিবস, সংগীত প্রতিযোগিতা ইত্যাদি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

এই মেলার বয়স পাঁচ বছর। এ বার মেলায় ৪০টি স্টল ছিল। প্রকাশকরা ও বই-ব্যবসায়ীরা মূলত এসেছিলেন বেহালা ও সন্নিহিত অঞ্চল থেকে। বইমেলার পক্ষ থেকে যুগ্ম সম্পাদক ও মহিলা কমিটির সদস্য তুলিকা রায় জানালেন, দিল্লিতে আয়োজিত ‘হাজার কণ্ঠে’ গান করার পর থেকেই মাথায় কিছু পরিকল্পনা ছিল। তাই যখন জানা গেল এলাকারই কবি-গীতিকার মোহিনী চৌধুরীর এ বার শতবর্ষ, তখনই সিদ্ধান্ত হল তাঁর লেখা ও কৃষ্ণচন্দ্র দে-র সুরে গাওয়া গান শত কণ্ঠে পরিবেশন করার। ভাবনা পাকা হল। যোগাযোগ করা হল মোহিনী চৌধুরীর মধ্যম পুত্র দিগ্বিজয় চৌধুরীর সঙ্গে। এবং দিগ্বিজয়বাবু দু’টি গানের কথা জানালেন – ‘আজ কাশ্মীর হতে কন্যাকুমারী’ ও ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’।

behala boimela inauguration
দীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে বইমেলা উদ্বোধন। নিজস্ব চিত্র।

১৫ মার্চ বেহালা ব্লাইন্ড স্কুলের মাঠে ১২৬ জন কণ্ঠশিল্পীকে দিয়ে মোহিনী চৌধুরীর গান গাইয়ে শতবর্ষে এই কবি-গীতিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। সেই গান দিয়ে মেলার শুরু। এবং এই কণ্ঠগুলিকে এক সূত্রে বাঁধার দায়িত্বে ছিলেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী নমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

নমিতাদেবীর অভিজ্ঞতা কেমন হল?

“‘হাজার কণ্ঠে’ তিন বার টিমলিডার হওয়ায় কিছু অভিজ্ঞতা তো ছিলই। আর এ বার বেহালা বইমেলায় ১২টি দলের ১২৬ জন কণ্ঠশিল্পীকে নিয়ে একক ভাবে কাজ করতে গিয়ে অনেক সমৃদ্ধ হলাম” – বললেন নমিতাদেবী। তিনি বলেন, সংগীত পরিচালনায় সহকারী হিসাবে তিনি পাশে পেয়েছেন কাকলি মজুমদার ও দেবাংশু মুখোপাধ্যায়কে। পরিবেশিত গানে শিল্পীদের কণ্ঠে ছিল আনন্দের ছোঁয়া। বইমেলার পক্ষ থেকে তুলিকা রায়ের নানা সাহায্য তাঁকে অনেক সুবিধা দিয়েছে।

কিন্তু এই বিশাল আয়োজনে এতগুলি শিল্পীকে একত্রিত করার কাজটি করলেন কে? অবশ্যই নাম করতে হয় বইমেলার মহিলার কমিটির সদস্য কাকলি মজুমদারের। কাকলি বললেন, বইমেলার সূচনাকাল থেকেই তিনি মেলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেও সাংস্কৃতিক বিভাগে আছেন গত তিন বছর ধরে। বিচারক আনা, গান ঠিক করা – এ সব দায়িত্ব ছিল তাঁর উপরে। প্রথম মিটিং-এ যখন ঠিক হয়, শতকণ্ঠে সংগীত পরিবেশন করা হবে তখনই সিদ্ধান্ত হয় বেহালার সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীগুলিকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। ১২টি দলের মধ্যে ৮টি দলকে আনেন কাকলিদেবী। তিনি জানান, এ বারের বইমেলায় নানা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। সংগীত প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানাধিকারীকে মঞ্চ দেওয়া হয় সংগীত পরিবেশনের জন্য।

মাঝে মাঝে ভারী বর্ষণ ও পরীক্ষা দশ দিনের বইমেলায় অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে উপস্থিতির হার। হয়তো ক্ষতির পাল্লাটা নিচুই থাকছে বাণিজ্যিক দিকে দিয়ে দেখতে গেলে, এমনটিই জানালেন অথরস আর্টিস্টস পাবলিশার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক কল্যাণ ঘোষ। বইমেলার মঞ্চে কবি-গীতিকার মোহিনী চৌধুরীর শতবর্ষ উদযাপনের পাশাপাশি বক্তৃতা, কবিতাপাঠ ও আলোচনার মাধ্যমে স্মরণ করা হল শতবর্ষের কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে, ১২৫ বছরের বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে এবং ’৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে।

প্রতিদিন বিকেল ৪টে থেকে মেলা চলেছে রাত্রি সাড়ে ৮টা পর্যন্ত। লোকগানের মধ্য দিয়ে ২৪ মার্চ মেলার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

মেলার সভাপতি দুর্গাদাস মিদ্দ্যা জানালেন, প্রয়াসের খামতি ছিল না, কিন্তু আশানুরূপ ফল মেলেনি। প্রকাশকদের উপস্থিতি হতাশ করেছে। বেহালা অঞ্চলে পর পর তিনটি বইমেলা হওয়ায় প্রকাশকদের সঙ্গে ঠিকমতো যোগাযোগের একটা অভাব থেকে গিয়েছে। অবশ্য এটি যে তাঁর একান্তই ব্যক্তিগত মত তা জানাতে ভোলেননি দুর্গাদাসবাবু। তবে নিরপেক্ষ ভাবে দেখতে গেলে বলা যায় বেহালাবাসী মোহিনী চৌধুরীকে শ্রদ্ধা জানানো এবং তাঁকে জনসমক্ষে তুলে ধরার কাজে তাঁরা সফল হয়েছেন, এমনই বললেন দুর্গাদাসবাবু।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here