চলছে আলোচনাসভা। নিজস্ব চিত্র।
শ্রয়ণ সেন

“আজ হঠাৎ করে যদি আমার বাড়ি বন্যার জলে ডুবে যায়, আর আমার নাগরিকত্বের যাবতীয় কাগজপত্র জলে নষ্ট হয়ে যায়, তা হলে আমি এই দেশের নাগরিক থাকব না?” দর্শকাসন থেকে প্যানেলের উদ্দেশে প্রশ্ন করলেন একজন।

সত্যিই তো, অসমের পরিস্থিতি দেখে এই প্রশ্নটা কিন্তু আমাদের সবাইকেই ভাবাচ্ছে। শুধুমাত্র কি কয়েকটা কাগজেই নাগরিকত্ব প্রমাণ হয়?

অসমের নাগরিকপঞ্জি এবং তার পরবর্তী প্রভাব নিয়ে জমে উঠল অক্সফোর্ড বুকস্টোরে আয়োজিত একটি আলোচনাসভা। আলোচনাসভাটির মূল বিষয় ছিল, “আমি কি নাগরিক?” আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন আদতে ফরাসি এবং ১৭ বছর ধরে ভারতে থাকা ক্রিস্টোফার প্লায়াস, এপিজে লিটেরারি ফেস্টিভালের ডিরেক্টর অঞ্জুম কাটিয়াল, গবেষণাবিদ দেবারতি চক্রবর্তী, আইনজীবী অতসী ঘোষ এবং প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী গার্গী ঘোষাল। নাগরিকত্ব, জাতীয়তাবাদ, ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য, অভিবাসী সমস্যা-সহ একাধিক ব্যাপার উঠে এল এই আলোচনা সভায়।

কাগজপত্রেই নাগরিকত্বের বৈধতা যাচাই হয় না

কয়েকটা কাগজপত্র ঠিকঠাক দেখাতে পারলেই একজন প্রকৃত ভারতের নাগরিক হয়ে গেলেন, এই ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল বলে একযোগে মত প্রকাশ করে প্যানেল। ভারতে খুব সহজেই কাগজপত্র তৈরি করে নেওয়া যায় বলে মত প্রকাশ করেন দেবারতি মুখোপাধ্যায়। তাঁর মতে, কাগজের ভিত্তিতে নয়, প্রকৃত নাগরিকের দু’টো মাপকাঠি হওয়া উচিত। তিনি বলেন, “আমার মতে, দু’টো মাপকাঠি হওয়া উচিত নাগরিকত্বের। এক নম্বর, আমি সৎ কারদাতা কি না, আর দু’নম্বর, আমি যেন কোনো অপরাধ না করি।” এ ছাড়া ধর্ম, জাত এবং জন্মসূত্রেও কখনও নাগরিকত্ব প্রমাণিত হয় না বলে জানান তিনি।

আরও পড়ুন নাগরিকপঞ্জিতে গলদ রয়েছে,নিজের মন্তব্যে কি এটাই স্বীকার করলেন অসমের মন্ত্রী

নাগরিকত্ব এবং জাতীয়তাবাদ

দেশের নাগরিক প্রমাণ করতে গেলে এখন প্রকাশ্যে নিজেকে জাতীয়তাবাদী দেখানো কার্যত জড়িয়ে গিয়েছে বলে মত উঠে আসে এই আলোচনাসভায়। তবে সেটা কখনোই কাম্য নয়। এই প্রসঙ্গে দেবারতিদেবী বলেন, “আমি কী রকম ভাবে আমার দেশকে ভালোবাসব সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমাকে কেউ শেখাতে আসবে না। যতক্ষণ না আমি আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের মতো কোনো কাজ করছি, তখন কারও অধিকার নেই আমার জাতীয়তাবাদবোধ বা নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার।”

সিনেমাহলে জাতীয় সংগীত বাজলেও তাতে উঠে দাঁড়িয়ে জাতীয়তাবাদের প্রমাণ দিতে হবে, এই ধারণাও এ বার পালটে ফেলার সময়ে এসেছে বলে জানান গার্গীদেবী।

ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য

চাকরি এবং বাড়ি পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের অনেক জায়গাতেই ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য কাজ করে বলে মনে করেন এই লিটেরারি মিটের ডিরেক্টর অঞ্জুম কাটিয়াল। তিনি বলেন, “ভারতের একটা বড়ো অংশে এই বৈষম্য রয়েছে। চাকরির ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে ইসলাম এবং খৃষ্টধর্মাবলম্বীদের প্রতি বৈষম্য করা হয়। শুধুমাত্র চাকরির ক্ষেত্রেই নয়, এই বৈষম্য রয়েছে বাড়ি পাওয়ার ক্ষেত্রেও।”

অভিবাসীদের জন্য গর্বিত

কথা প্রসঙ্গে উঠে আসে অভিবাসীদের বিষয়। অসমে যে চল্লিশ লক্ষ মানুষ এখন নাগরিকত্বহীন হয়ে রয়েছেন তাঁদের কী হবে? ভারতের কি অভিবাসী হয়ে থাকতে হবে তাঁদের? এক শ্রোতার প্রশ্নে অতসীদেবী বলেন, “ভারত তো এই মানুষগুলোকে পাকিস্তান বা বাংলাদেশে ছুড়ে ফেলতে পারে না। সেই দেশগুলো কেনই বা এত মানুষকে নেবে?” ভারত চাইলে এই মানুষগুলোকে অভিবাসীর তকমা দিতে পারে বলে জানান তিনি।

আরও পড়ুন নাগরিকপঞ্জির ত্রুটি নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ অসম রাজ্য বিজেপির!

বিশ্বকাপ ফুটবলের উদাহরণ দিয়ে ক্রিস্টোফার প্লায়াস বলেন, অভিবাসীদের জন্য তাঁরা গর্বিত। সম্প্রতি ফ্রান্সের যে দলটি বিশ্বকাপ জিতেছে, তার সংখ্যাগরিষ্ঠই অভিবাসী। এখন তাঁদের নিয়ে হৈহৈ হলেও, কখনও যদি তাঁরা ব্যর্থ হন, তাঁদের নিয়েই প্রশ্ন তুলবেন সে দেশের মানুষ। এই প্রসঙ্গে ক্রিস্টোফার বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা ভাবুন, সেই দেশের অর্থনীতিটাকে তো কার্যত দাঁড় করিয়ে রেখেছেন অভিবাসীরা।অভিবাসীরা কখনও সমস্যা হতে পারে না। অভিবাসী মানে একটা লড়াকু জাত, যারা শত কষ্ট করে, হেঁটে, সাঁতরে অন্য দেশে এসে পৌঁছেছেন।”

সব কিছুই ভোটের জন্য

অসমের নাগরিকপঞ্জি নিয়ে যা হচ্ছে এবং তার পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গে যা হচ্ছে তা সব কিছুই ভোটব্যাঙ্কের কথা মাথায় রেখে হচ্ছে, বলে মনে করেন গার্গী ঘোষাল। তাঁর কথায়, “দু’বছর আগে অসমের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, ‘ক্ষমতায় এলে আমরা সব বাংলাদেশীকে তাড়াব’ এটা যেমন ভোটের কথা মাথায় রেখে বলা হয়েছে, ঠিক তমনই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীও ভোটের কথা মাথায় রেখেই বলেছেন, ‘অসম থেকে বিতাড়িত মানুষকে আমরা নিয়ে নেব’।”

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন