দীধিতি ঘোষ

“আমরা দু’ জনেই হিন্দু। কিন্তু তোমরা হলে সত্যিকারের। কিন্তু আমরা তা নই”। লাতিন আমেরিকানদের অনেক সময় হিন্দু বলা হয়ে থাকে সেই ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সময় থেকে। কিন্তু লাউরা রেস্ত্রেপো কাসাবিয়ানকা এই কথা বলতে বেশ সম্মানিত বোধ করেন। রেস্ত্রেপো কোলোম্বিয়ান লেখক। এই প্রথম বার কলকাতায় এলেন। বইমেলায় এসেছেন ছোটোবেলার বান্ধবী এবং ভারতে কলোম্বিয়ার রাষ্ট্রদূত ক্লেমেনসিয়া ফোরেরো উক্রস-এর সঙ্গে। ১৯৫০ সালে তাঁর জন্ম। কোলোম্বিয়ার অন্ধকারময় বাস্তব দিকগুলো নিয়ে তিনি লেখালেখি করেন। তার মধ্যে রয়েছে, দারিদ্র, মাদকের নেশা, রাজনীতি থেকে অনেক কিছুই। লেখকের পাশাপাশি তিনি এক জন সাংবাদিকও। পড়াশোনায় পারদর্শিতা দেখিয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই ডিপ্লোমা লাভ করেন। এমন ঘটনা তাঁর পরিবারে প্রথম।

৪২তম কলকাতা বইমেলায় এমন এক জনকে সামনে পেয়ে কৌতুকভরে প্রশ্ন করলাম,

আপনি সত্যি এবং মিথ্যে এই দু’টিকে কেমন ভাবে ব্যখ্যা করেন আপনার লেখার মাধ্যমে?

বললেন, “লাতিন আমেরিকাতে ম্যাজিকাল রিয়ালিজম ব্যাপারটি আমার মনে হয় যেন এক সত্য-মিথ্যার বিন্যাস। এক অলৌকিকতা যা কখনওই সত্য হয় না। কিন্তু আবার পুরোপুরি মিথ্যাও হয় না। মানব-দক্ষতার এক মায়াজাল বুনন, যা হাজারও লোকে পড়ে এবং যা স্রোতের মতো এখনও শুকনো মাটির বুকে বয়ে যাওয়ার আশা রাখে।”

আপনি কি বলছেন যে ম্যাজিকাল রিয়ালিজম একটি অতিপ্রাকৃতিক বাস্তব সম্ভাবনা?

“বলতে পারো। আমি গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজকে শ্রদ্ধা করি। যখন ‘সেমানা’ পত্রিকায় লিখতাম বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্বন্ধে তখন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। এর পর পরই আমাকে খুনের হুমকি দেওয়া হয় বিশেষ কয়েকটা দল থেকে। যার জন্য বেশ কিছু বছর মেক্সিকোতে থেকে যেতে হয়। মনে হত নিজের জীবনটাই একটা প্রকট বাস্তব, যা অলৌকিক ভাবে চেয়ে আছে কোন সুদূরে, যা কবে আসবে কেউ জানে না।”

এখানে জানিয়ে রাখা ভালো গার্সিয়া নিজেই ম্যাজিকাল রিয়ালিজম রচনাশৈলীর একটি বড়ো অংশ জুড়ে রয়েছেন। তাঁর ‘সিয়েন আনিয়স দে সোলেদাদ’ উপন্যাসে যা গভীর ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। সলমান রুশদি বলেছেন, মার্কেজ-এর ম্যাজিকাল রিয়ালিজমের জন্ম এক অধিবাস্তববাদে, যা এক অকৃত্রিম তৃতীয় বিশ্বের আত্মসচেতনতা”।

আপনার কি মনে হয়, ম্যাজিকাল রিয়ালিজমই অসহায় অক্ষমদের আনন্দের ঠিকানা?

“হ্যাঁ। কোলোম্বিয়াতে সাধারণ লোকেরা খুব গরিব। সেখানে মাফিয়া-রাজারা তাদের দেবতা, যারা নেশার এক ঝলকে হয়ে যেতে পারে সর্বশক্তিমান এবং মোক্ষম। এরা সঙ্গে সঙ্গে রোজগার করে নিতে পারে প্রচুর টাকা। এটি যেন একটি ক্রমাগত ধারা। এক নিঃশ্বাসে জীবিত ও এক রুদ্ধশ্বাসে মৃত। ঠিক জাদুর খেলা।”

খানিক ভেবে আবার বললেন, “আমার মনে হয় জীবনটাই যেন একটা খেলা। যেখানে ভালো আর মন্দ দুই ঠিক করে পরবর্তী মুহূর্তের গুরুত্ব। যা এক নিমেষে হয়ে যেতে পারে এক ঐতিহাসিক পর্ব এবং একটি ছোট্টো ঐতিহাসিক মুহূর্ত কেড়ে নিতে পারে হাজারও জীবন”।

আপনার লেখা সম্পর্কে কিছু বলুন।

“আমি লেখা শুরু করি নয় বছর বয়সে। আমার প্রথম উপন্যাস ‘লা ইসলা দে লা পাসিয়ন’-এ আমি অনুসন্ধানী চিত্তে বিস্ময় প্রদান করেছি পাঠকদের জন্য।  সব ধরনের লেখা যে হেতু ‘ম্যাজিকাল’ হয় না, আমি বাস্তবকে অনুসন্ধান করেছি আমার প্রত্যেকটি লেখার মাধ্যমে। তাতে রয়েছে প্রহেলিকা, গুপ্ত রহস্য এবং গোপনতা, যা অল্প অল্প করে পড়তে গিয়ে আবির্ভূত হয়। দৈনিক জীবনের লড়াই এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বেরিয়ে আসা এক মূল চরিত্রের অংশ। যা নির্ভয়ে আমার লেখায় প্রকাশিত হয়।”

একটি ছোটো বাক্যে যদি বেঁচে থাকার অর্থ প্রকাশ করতে চান –

“বেঁচে থাকা একটি গল্পের মতো। যেখানে প্রত্যেকটি চরিত্র একটি অংশমাত্র। যার পুরোটা বোঝে কেবল দু’ জন – ঈশ্বর এবং সে নিজে। এক জন প্রথম থেকে আর এক জন শেষে গিয়ে।”

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন