পটলডাঙার বসুমল্লিক বাড়ির পুজোর এ বার ১৯১ বছর

0
বসুমল্লিক বাড়ির পুজো।

পাপিয়া মিত্র

সাতসকালে উত্তর কলকাতার বসুমল্লিক বাড়ির দেবীচত্বরে জট বেঁধেছে ছেলেমেয়ের দল। কেউ নিজস্বী তুলতে ব‍্যস্ত, আবার কেউ কেউ আড্ডায় মশগুল। আকাশের খেয়ালখুশিতে কখনও মেঘ কখনও চাঁদিফাটা তাপ। চটপট কয়েকটি ছবি তুলতে তুলতে কথা শুরু হয়ে গেল ৩০তম প্রজন্ম গৌতম বসুমল্লিকের সঙ্গে।

বাড়ির পুজোগুলোয় দেবীপক্ষ পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আত্মীয়স্বজনের ভিড় বাড়তে থাকে। দিনবদলের সঙ্গে স্বজনদের আসাযাওয়া যতই কম হোক না কেন তবুও স্মৃতির কোলাহলের গন্ধটা অন্য রকম থেকেই যায়। নতুন জামাকাপড়ের সঙ্গে দেহগন্ধীর সুবাসে হাওয়া যায় বদলে। কর্পোরেট পোশাক ছেড়ে ধুতি বা আলিগড়ি পাজামা-পাঞ্জাবি আর শাড়িতে বেশ দেখতে লাগে চার ধার। এখানেই দেবীদুর্গার আকর্ষণী শক্তি।

বাড়ির পুজোর ঘনঘটা ছেড়ে এই বসুমল্লিক পরিবারের ইতিহাস আজ পুজোর আবহে জানতে ভালো লাগবে পাঠকদের। কিছুক্ষণের জন্য ফিরে দেখা। স্বদেশি যুগে কংগ্রেসের চরমপন্থী দলের অন্যতম নেতা রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিক এই পরিবারের সন্তান।

বসুমল্লিকদের ঠাকুরদালান।

২৭ অক্টোবর, ১৯০৫ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বাড়ির ঠাকুরদালানে ছাত্রসভায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এ ছাড়াও নানা সময়ে রাজনৈতিক সভাও হয়েছে এই দালানে। এই দালানকে এখন মাতৃবন্দনার জন্য সাজিয়ে তোলা হয়েছে। রঙের প্রলেপ পড়েছে পাঁচ খিলান যুক্ত দু’ দালান বিশিষ্ট ঠাকুরদালানের। দ্বার-দালানের বাইরে উপর দিকে আছে বিষ্ণুর দশ অবতারের ছোটো মূর্তি, সারিবদ্ধ ভাবে দেওয়ালে গাঁটগাথা।

মধ্য কলকাতার অন্যতম প্রাচীন এই পরিবার। কৌলিক পরিচয়ে দক্ষিণ রাঢীয় কায়স্থ সমাজের মাহিনগরের বসু তথা কাঁটাগড়ের বসুমল্লিক পরিবার। সমাজ সংস্কারক গোপীনাথ বসুর (পুরন্দর খাঁ) উত্তরপুরুষ। গোপীনাথ ছিলেন গৌড়ের হুসেন শাহের উজির। গোপীনাথ ও তাঁর ভাই বল্লভ পাঠান সুলতানি দরবার থেকে ‘মালিক’ উপাধি লাভ করেন। কালক্রমে তা মল্লিকে রূপান্তরিত হয়। পাঠান যুগের পরে বাংলায় মুঘল রাজত্ব শুরু হলে মাহিনগরের বসুমল্লিকদের অনেকে রাজনৈতিক কারণে বাংলার নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তারই একটি শাখা হুগলি-জেলার পান্ডুয়ার কাছাকাছি কাঁটাগড় গ্রামে বসতি শুরু করে।

কাঁটাগড় থেকে রামকুমার বসুমল্লিক ১৭৯৪-তে কলকাতায় চলে এলেন। পুরোনো কলকাতার পটলডাঙা বা এখনকার কলেজ স্কোয়ার অঞ্চলের বাসিন্দা জনৈক কৃষ্ণরাম আইচের কন্যা শঙ্করীকে বিয়ে করেন। তাঁদের সন্তান রাধানাথ (১৭৯৮-১৮৪২) পটলডাঙা পরিবারের প্রাণপুরুষ। ইনি ১৮৩১-এ পঞ্চাননতলা লেনে ঠাকুরদালান-সহ ভদ্রাসন নির্মাণ করে (বর্তমানে ১৮এ, রাধানাথ মল্লিক লেন) দুর্গাপুজো শুরু করেন। সেই হিসাবে বসুমল্লিক বাড়ির পুজো এ বার ১৯১ বছরে পড়ল।

বসুমল্লিক বাড়ির দুর্গাপ্রতিমা।

বসুমল্লিকবাড়ির পুজো শুরু হয় প্রতিপদাদি কল্পে। অর্থাৎ আশ্বিন মাসের মহালয়ার পরের দিন থেকে বেল-কাণ্ডকে দেবী রূপে কল্পনা করে বোধন হয়। মহাষষ্ঠীর বরণের পরে প্রতিমার পুজো শুরু হয়।

এখানকার প্রতিমা একচালা মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তি। ডাকের সাজের পাশাপাশি দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশকে যথাক্রমে বেনারসি ও সিল্কের ধুতি পরানো হয়। সিংহের মুখ ড্রাগন আকৃতির। কলাবউ স্নান করানো হয় দালানেই তীর্থবারি দিয়ে। অষ্টমীর দেবীবরণ, সন্ধিপুজোয় ও নবমীর চালকুমড়ো বলির সময়ে বন্দুক ফাটানো বসুমল্লিকবাড়ির রীতি। দশমীর সকালে ও বিকালে বরণ অনুষ্ঠানের পরে নিমতলা ঘাটে প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়।

এক সময়ে দুর্গাপুজো উপলক্ষে আঞ্চলিক ইতিহাস ও পারিবারিক নথিপত্রের প্রদর্শনী করা হত। প্রকাশিত হত ‘বসুমল্লিকবাড়ি সংবাদ’ পত্রিকাটি। আসর বসত ভক্তিগীতি সহ নানা নৃত্য-সঙ্গীতের। হবে নাই বা কেন? কত্থক বিশেষজ্ঞ নরেন্দ্রচন্দ্র বসুমল্লিক এই বাড়ির সন্তান। তিনি ছিলেন এলাহাবাদ সংগীত সম্মেলনের কত্থক নৃত্যের প্রথম বাঙালি বিচারক।

সেই ঠাকুরদালানের একাংশ।

এই ঠাকুরদালানে অনুষ্ঠিত হয়েছে তৎকালীন উচ্চাঙ্গ সংগীত-নৃত্যের অনুষ্ঠান ‘শংকর উৎসব’। কলকাতা পুরসভার ‘ঐতিহবাহী বাড়ির’ তালিকায় রয়েছে ভদ্রাসন-সহ এই ঠাকুরদালানটি।

এ ছাড়াও ২২ রাধানাথ মল্লিক লেন ও ৪৬ শ্রীগোপাল মল্লিক লেনের শরিকবাড়ি দু’টিতে এখনও দুর্গাপুজো হয়। দু’টি বাড়ির ঠাকুরদালান ঢালাই লোহার কারুকার্যে সজ্জিত। বাড়ি দু’টির পুজোর সূচনা করেন ক্ষেত্রচন্দ্র বসুমল্লিক (১৮৯১) ও শ্রীগোপাল মল্লিক (১৮৯৬)।

ছবি: লেখক

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন