কলকাতা: জানবাজারে রানি রাসমণির বাড়ির পুজোকে অনেকেই রানির পুজো হিসাবে অভিহিত করেন। কিন্তু আদতে এই পূজা শুরু করেছিলেন তাঁর শ্বশুরমশাই জমিদার ও ব্যবসায়ী প্রীতিরাম মাড়। পরে রানির আমলে পূজার জাঁক অনেক বাড়ে, বাড়ে চাকচিক্য।

প্রীতিরামের আদি নিবাস ছিল আমতার ঘোষালপুর গ্রামে। শৈশবেই বাপ-মা হারা হয়ে ছোটো দুই ভাইকে নিয়ে চলে আসেন জানবাজারে এক জমিদার আত্মীয়ের বাড়িতে। ডানকিন নামে এক সাহেবের নুনের কারবারে কাজ জুটিয়ে নেন প্রীতিরাম। ডানকিন সাহেব মারা গেলে প্রীতিরাম রোজগারের নানা পথ ধরেন। প্রথমে বাঁশের ব্যবসা, তার পর জেলাশাসকের সেরেস্তায় চাকরি, এর পর নাটোরের স্টেটে দেওয়ানের কাজ। পাশাপাশি আরও কিছু কাজ। ইংরেজি ভাষাটাও কিছুটা আয়ত্ত করে নেন। কলকাতাতেও শুরু করেন ব্যবসা। এ ভাবেই ধীরে ধীরে গুছিয়ে নিলেন প্রীতিরাম। জানবাজারে বানালেন প্রাসাদোপম বাড়ি।

জানবাজারের এই বাড়িতেই ১৭৯৪ সালে দুর্গাপূজার সূচনা করেন প্রীতিরাম। তাঁর মৃত্যুর পর রানি রাসমণির স্বামী রাজচন্দ্র দাস সেই পুজো চালিয়ে যান। রাজচন্দ্র দাসের মৃত্যুর পরে রানি নিজেই এই পুজোর দায়িত্ব কাঁধে নেন। পুজোর শ্রী আরও বাড়ল।

তার পর কেটে গিয়েছে বহু বছর। রানির বংশধরেরা ভাগ হয়ে গিয়েছেন বেশ কয়েকটি ভাগে। অধুনা মির্জা গালিব স্ট্রিট তথা পূর্বতন ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের বাড়িতেই শুরু হয়েছিল পূজা। বর্তমানে এটির তত্ত্বাবধানে রয়েছে হাজরা পরিবার। 

রানি রাসমণির ছিল চার কন্যাসন্তান – পদ্মমণি, কুমারী, করুণাময়ী এবং জগদম্বা। জগদম্বার পৌত্র ব্রজগোপালের মেয়ে লবঙ্গলতার বিয়ে হয় বিজয়কৃষ্ণ হাজরার সঙ্গে। সেই হাজরা পরিবার থাকেন কাছারিবাড়িতে। রানি রাসমণি যে মণ্ডপটিতে পুজো করতেন, সেটি রয়েছে এই পরিবারেরই অংশে।

রানির আমলে পুজোর দিনগুলোতে সারা রাত ধরে যাত্রা, কবিগানের আসর বসত। পুজোর আসরে প্রখ্যাত কবিয়াল ভোলা ময়রা ও অ্যান্টনি ফিরিঙ্গিও এসেছেন। এ ছাড়াও প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামীজি, নেতাজি, বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়ের মতো আরও অনেক বরেণ্য ব্যক্তিত্বই এখানে নিয়মিত পুজোয় আসতেন।

এখানে দেবী দুর্গার সঙ্গে পঞ্চ মহাদেব, রঘুবীর, রামকৃষ্ণ এবং সারদামার পুজো করা হয়। রামকৃষ্ণ এবং সারদামার পুজো অবশ্য রানির পরবর্তী আমলে শুরু হয়েছে।

১৮৬৪ সালে রামকৃষ্ণদেব এই বাড়ির পুজোতে এসেছিলেন। তিনি ‘সখীবেশ’ ধরে পুজোও করেছিলেন। সন্ধ্যারতির সময়ে দুর্গাকে চামর দুলিয়ে বাতাস করেছিলেন। কিন্তু মথুরামোহন তাঁকে চিনতে পারেননি। ভেবেছিলেন নিমন্ত্রিত কোনো মহিলাই চামর দোলাচ্ছেন। পরে তিনি জগদম্বা দেবীর কাছ থেকে জানতে পারেন তিনি স্বয়ং রামকৃষ্ণদেব। সেই থেকেই আজও এই পুজোয় ঠাকুরদালানে বাড়ির মহিলারা প্রতিমার বাম দিকে এবং পুরুষেরা ডান দিকে দাঁড়ান।

জানবাজার বাড়ির দেবীর গায়ের রং শিউলি ফুলের বোঁটার মতো। সুসজ্জিতা দেবী আনা হয় বীরভূম থেকে। সেই সময় থেকেই দেবী তৈরির দায়িত্ব একটি পরিবারই পালন করে আসছে। এখানে ঠাকুর একচালা।

দেবীর বোধন হয় মহালয়ায়। রানি রাসমণির বাড়িতে দুর্গার সঙ্গে পুজো করা হয় মহাদেবেরও। দশমীতে দেবীর সঙ্গে মহাদেবেরও বিসর্জন হয়। এই পুজোতে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, তিন দিনই কুমারীপুজো চলে।

আজও রানির চালু করা রীতি ও বিশেষত্ব মেনেই পুজো হয়ে আসছে জানবাজারের বাড়িতে। তখনকার জৌলুস হয়তো আর নেই, কিন্তু নিষ্ঠার কোনো অভাব নেই রানি রাসমণি বাড়ির দুর্গাপুজোয়।

গত বছর এই বাড়িতে দুর্গাপুজোয় সাধারণের প্রবেশে কোনো বাধা ছিল না। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দর্শনার্থীদের মাস্ক পরে আসতে বলা হয়েছিল। এ বারেও এই নিয়ম অনুসরণ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সকলের আশা।

আরও পড়তে পারেন

চুঁচুড়ার মণ্ডল পরিবারে আরাধনা হয় শিবদুর্গার

রাজা কংসনারায়ণের উত্তরপুরুষরা পরিবারের প্রাচীন অষ্টধাতু-দুর্গার পুজো করছেন জলপাইগুড়ির পাণ্ডাপাড়ায়

কামারপুকুরের লাহাবাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন শ্রীরামকৃষ্ণ

সিঙ্গি গ্রামের ভট্টাচার্য বংশের ৩৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো ‘মঠের বাড়ির দুর্গোৎসব’

হুগলির জোলকুলের ভট্টাচার্য পরিবারের দুর্গাপুজোর এ বার ২১৭ বছর

দু’ দিন পরেই বোধন, সাবর্ণদের আটচালাবাড়িতে শুরু হয়ে যাবে ৪১২তম বছরের দুর্গাপুজো

রাজা নবকৃষ্ণ দেবের নির্দেশেই ১৭৫৭-য় শুরু হয়েছিল কলকাতার সব চেয়ে জাঁকজমকের পুজো

    

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন