রাজা নবকৃষ্ণ দেবের নির্দেশেই ১৭৫৭-য় শুরু হয়েছিল কলকাতার সব চেয়ে জাঁকজমকের পুজো

0
শোভাবাজার রাজবাড়ি।
শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপূজা।

শৈবাল বিশ্বাস

সেটা ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ। পলাশির আমবাগানে মোহনলালের কামানের গর্জন আর নেই। মীরজাফরের পুত্র মিরন ছুটেছেন নবাবকে খুঁজে বের করতে। আমজনতার সামনেই তাঁকে কোতল করা হবে। এ দিকে যুদ্ধ-শিবিরের অদূরে ক্লাইভের খাস তাঁবুর ঠিক বাইরে বসে নিবিষ্ট মনে চিঠি লিখছেন এক টিকিধারী পরম বৈষ্ণব। তিনি টিকিধারী বৈষ্ণব বটে, কিন্তু সাহেবদের তল্পিবাহক, খোদ ক্লাইভ সাহেবের মুনশি। নাম নবকৃষ্ণ দেব বাহাদুর। আর ক’ দিন বাদেই তিনি অবশ্য‌ রাজা উপাধি পাবেন। পাবেন কলকাতার বেশ কিছুটা জমিদারি স্বত্ব।

সে দিন সেই আমবাগান থেকে ক্লাইভের মুনশি নবকৃষ্ণ কলকাতায় তাঁর দাদাকে চিঠি লিখলেন – আয়োজন করো, পলাশিতে আমাদের বড় জিত হয়েছে। রোজগারও মন্দ হয়নি। ক্লাইভ সাহেব খুশ। আমাদের ভাগ্য‌ একেবারে তুঙ্গে, কলকাতায় খুব বড়ো করে দুর্গোৎসব করতে হবে। ক্লাইভ সাহেব কথা দিয়েছেন, তিনিও আসবেন সেই উৎসবে।

১৭৫৭-র সেই দিনটিতেই পত্তন হল কলকাতার সব চেয়ে জাঁকজমকের পুজোর। শোভাবাজারে রাজা নবকৃষ্ণের বাড়ির সেই দুর্গাপুজো এ বার পা দিল ২৬৫ বছরে। সেই থেকে লাগাতার চলে আসছে পুজো।

Shyamsundar
রাজা নবকৃষ্ণ দেব – প্রাচীন অঙ্কন।

রাজা নবকৃষ্ণের দীর্ঘদিন কোনো সন্তান হয়নি, তাই দত্তক নিয়েছিলেন বড়ো দাদা রামসুন্দরের পুত্র গোপীমোহনকে। পরে অবশ্য‌ তাঁর নিজের একটি সন্তান হয়। বড়ো ছেলে পেলেন আদি দুর্গোৎসবের ভার আর অধিকাংশ জমিজায়গা আর ছোটো ছেলে রাজকৃষ্ণ পেলেন কলকাতার জমিদারি, কুলদেবতা গোপীনাথ জিউ-এর সেবার ভার আর রাজা নবকৃষ্ণের বাস্তুভিটে। এই বাড়িতে নতুন করে দুর্গাদালান বানিয়ে পুজো শুরু হল ১৭৯০ সালে। অর্থাৎ রাজা রাজকৃষ্ণের পুজোর মেয়াদও ২৩১ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। গোটা উনিশ শতকে পাল্লা দিয়ে দু’ বাড়িতে মোচ্ছব হয়েছে। এক সময় সাহেবসুবোদের ওপর কোম্পানির নির্দেশ এল, তোমরা নেটিভদের সঙ্গে বড্ড বেশি মেলামেশা করছ। নেটিভদের পুজোয় তোমাদের যাওয়া চলবে না। অতএব দুর্গোৎসবে বাই নাচানো আর মদের ফোয়ারার ওপর কিছুটা লাগাম পড়ল। তবে পুজোর জাঁকজমকের কোনো খামতি হল না।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে সেই জাঁকজমকের একটা ইতিহাস পাই পক্ষীর দলের সূত্রে। বাগবাজারের বিখ্য‌াত পক্ষীর দলকে শোভাবাজার রাজবাড়ির দু’ তরফই নিমন্ত্রণ করে নিয়ে যেতেন। কিন্তু এক বার টাকাপয়সা, খাবারদাবার নিয়ে কিছু গণ্ডগোল হওয়ায় পক্ষীরা আর তাঁদের খাঁচা তথা পালকি থেকে বের হলেন না।

বিংশ শতাব্দীতে আর গোপাল উড়ের পালা, কবির গান, পক্ষীর দলের কীর্তিনিশান থাকল না, তার জায়গা নিল যাত্রা, থিয়েটার। রাজা-রাজড়ারা পাবলিক স্টেজে গিয়ে থিয়েটার দেখা হোক বা নাই হোক, পুজোর ক’ দিন নিজেদের বাড়ির পালায় রাজা-রাজড়াদের থাকা চাই-ই চাই।

কী হত তখন

রাজা রাজকৃষ্ণের বংশধর অলককৃষ্ণ দেব শোনালেন সেই মজার গল্প।

রাজারা বসে আছেন। থিয়েটার শুরু হল। একটা-দু’টো সিন যেতে না যেতেই শুরু হল নায়িকার নাচ। সেই নাচ দেখে রাজারা তো মহা খুশি। বললেন, ‘এনকোর এনকোর’। তখন ‘এনকোর’ মানে হল, এত ভালো হয়েছে যে আবার সেটা করে দেখাতে হবে। তাই সই। আবার শুরু হল সেই নাচ। যত বার নাচ শেষ হয় তত বারই রাজাবাবুরা বলে ওঠেন, ‘এনকোর’, ‘এনকোর’। ব্য‌াস, নায়িকা বাধ্য‌ হন আবার নাচতে, হাজার হোক রাজা-মহারাজা বলে কথা। এই করতে করতে যখন রাতভোর হয়ে এল, তখন অধিকারীমশাই স্টেজে উঠে বললেন, “রাজাবাবুরা কিছু মনে করবেন না, আজ আর পালা দেখানো সম্ভব হচ্ছে না। আজ এই নাচ অবধি থাক। বাকি পালা কাল হবে এখন।”

সপ্তমীতে গঙ্গার ঘাটে কলাবউ স্নান।

পুজোর বিশেষত্ব

দুর্গাকে বাড়ির মেয়ে হিসেবে পুজো করা হয় শোভাবাজারের দেবেদের দুই বাড়িতে। এক চালচিত্রের প্রতিমা। দুর্গা এখনও থাকেন চিকের আড়ালে, রাজবাড়ির মেয়েরা যেরকম থাকতেন। একে বলে জগজগা।

মাতৃপ্রতিমার কাঠামোপুজোর সূত্রপাত হয় উলটোরথের দিন। সে দিন থেকেই কার্যত উৎসব শুরু। মাঝে আছে মহালয়ার দিন পণ্ডিত-বিদায়। দেশদেশান্তর থেকে পণ্ডিতরা আসতেন মোহর এবং উপহার নিতে। এখন আর মোহর পান না, সামান্য‌ কিছু টাকা পান। কিন্তু রীতি তো আর বিসর্জন দেওয়া যায় না, তাই বংশপরম্পরায় দূরদূরান্ত থেকে তাঁরা আসেন রাজপরিবারের আনুকূল্য‌ গ্রহণ করতে।

এপার বাংলার যে কোনো বাড়ির মতোই মেয়ে ফিরে যাওয়ার সময় দশমীর দিন চালু আছে কনকাঞ্জলি প্রথা। মেয়েকে রওনা করিয়ে নীলকন্ঠ পাখি উড়িয়ে কৈলাশে শিবকে বার্তা পাঠিয়ে সমাপ্তি হত। কিন্তু এখন আর নীলকন্ঠ পাখি ওড়ে না। তবে মাটির নীলকন্ঠ এখন ভরসা। দু’টো নৌকার মধ্য‌ে মাকে বসিয়ে মাঝ-গঙ্গায় নিয়ে গিয়ে বিসর্জন দেওয়ার প্রথা এখনও বজায় আছে। যেমন বজায় আছে রাজা রাজকৃষ্ণের বাড়ি বলিদানের প্রথা, সন্ধিপুজোর সময় ব্ল্য‌াঙ্ক ফায়ার করা ইত্য‌াদি।

অন্ন ভোগের রেওয়াজ নেই, তার বদলে আছে রাজবাড়ির ভিয়েনে তৈরি মিঠাই। আগে তৈরি হত প্রায় ৫০-৬০ রকমের মিঠাই, এখন কারিগর কম, তা-ও নেই নেই করে ২০ থেকে ৩০ রকমের মিঠাই তৈরি হয়।

রাজবাড়ির পুজোই শুধু নয়, পুজো সম্পর্কিত সমস্ত আনুষঙ্গিক কাজ চলে আসছে বংশ পরম্পরায়। প্রতিমাশিল্পী, পুরোহিত তো বটেই, এমনকি যাঁরা পুজোর ভোগ রাঁধেন, যাঁরা দশকর্মা-সামগ্রী সরবরাহ করেন, যাঁরা জল সরবরাহ করেন, যাঁরা সানাই-ব্যান্ড বাজান, তাঁরাও ছ’-সাত পুরুষ ধরে এই কাজ করে আসছেন। শুনলে আশ্চর্য হতে হয়, যাঁদের নৌকোয় প্রতিমা বিসর্জন হয়, তাঁরাও সেই নবকৃষ্ণ দেবের আমল থেকে এই কাজ করে আসছেন।

বাইরের কোনো দর্শনার্থী ছিল না গত বারের পুজোয়।

চোখ রাখুন ফেসবুক পেজে

করোনায় আক্রান্ত গোটা বিশ্ব। গত বছর থেকেই তার প্রভাব পড়ছে বাঙালির দুর্গোৎসবের ওপরেও। গত বছর শোভাবাজার রাজবাড়িতে সাধারণ দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারেননি। রাজবাড়ির ফেসবুক পেজের মাধ্যমে তাঁরা পুজো দেখেছেন।  যে ভাবে দর্শনার্থীদের ঢল নামে, গত বছর সেই চেনা ছবি ছিল না শোভাবাজার রাজবাড়ির ঠাকুরদালানে।

এ বারেও একই ব্যবস্থা করছে শোভাবাজার রাজবাড়ি কর্তৃপক্ষ। এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জানানো হয়েছে, করোনা মহামারির আবহে এ বছরেও রাজবাড়িতে প্রবেশ পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বারেও জনসাধারণের প্রবেশ সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ করার জন্য আন্তরিক ভাবে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। শোভাবাজার রাজবাড়ির ফেসবুক পেজে দুর্গাপূজার বিশেষ মুহূর্তগুলি দেখা যাবে বলে জানানো হয়েছে।

আরও পড়তে পারেন

পাণ্ডবেশ্বরের নবগ্রামে তিন শরিকের পুজোয় মা দুর্গা আসেন ব্যাঘ্রবাহিনী রূপে

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন