পাপিয়া মিত্র

প্রচারের আলোয় না থেকেও যে কোনো সংস্থা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় তার প্রমাণ ‘বেহালা দৃষ্টিহীন শিল্পনিকেতন’। নয় নয় করে পঞ্চাশ বছরে পা দিল সংস্থাটি। বছর জুড়ে সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসব আয়োজন করার পরিকল্পনা করেছে ‘বেহালা দৃষ্টিহীন শিল্পনিকেতন’। সম্প্রতি ‘বিডিএস’ ভবনে অনুষ্ঠিত হল সাংবাদিক সম্মেলন। সেই সম্মেলনেই ঘোষিত হল এক বছরের কর্মসূচি।

আগামী ১ ডিসেম্বর ‘বিডিএস’ প্রাঙ্গণে রেভারেন্ড লালবিহারী শাহ-র আবক্ষ মূর্তির আবরণ উন্মোচন করবেন নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন ব্লাইন্ড বয়েজ অ্যাকাডেমির অধ্যক্ষ বিশ্বজিৎ ঘোষ। প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করবেন ভারত সেবাশ্রম সংঘের মাননীয় খোকন মহারাজ।

‘বেহালা দৃষ্টিহীন শিল্পনিকেতন’ কী কাজ করেছে ৫০ বছর ধরে, আর কে-ই বা রেভারেন্ড লালবিহারী শাহ, তা জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

সময়টা ১৯৭২। রাজ্য পুলিশের এক অফিসার বদলি হয়ে এলেন বেহালা থানায়। নতুন জায়গায় সকলের সঙ্গে পরিচয় করার জন্য একদিন ঢুকে পড়েন ক্যালকাটা ব্লাইন্ড স্কুল চত্বরে। কিছু অসহায় মুখ দেখে বিচলিত হয়ে পড়েন। নিজের কাঁধে দায়িত্ব তুলে নিলেন ওই অফিসার, বেহালা থানার নতুন ওসি অরবিন্দ চট্টোপাধ্যায়। ব্লাইন্ড স্কুলের বিশাল ক্যাম্পাসের দক্ষিণে একটা ঘর পাওয়া গেল। সেই ঘরেই শুরু হল দৃষ্টিহীনদের বৃত্তিমূলক শিক্ষা দেওয়ার প্রশিক্ষণকেন্দ্র। উদ্দেশ্য, তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। সে দিন শিক্ষার্থী ছিল মাত্র ৩ জন।

এই উদ্যোগে শামিল হলেন মিউনিসিপ্যালিটির তৎকালীন চেয়ারম্যান মানিকলাল চট্টোপাধ্যায়, বিধায়ক ইন্দ্রজিৎ মজুমদার, পৌরপিতা ভোলানাথ মুখোপাধ্যায় ও সুবোধ দাসের মতো ক্ষমতাবান মানুষেরা।

আর ছিলেন স্বপন চট্টোপাধ্যায়, যিনি সে দিন প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য হিসাবে সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। অরবিন্দবাবুর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছিলেন স্বপনবাবু। সাংবাদিক সম্মেলনে স্বপনবাবুর উপস্থিতি সমগ্র অনুষ্ঠানটিকে প্রাণবন্ত করেছিল।

রাজ্য সরকারের নিয়ম অনুযায়ী ওই বছরেরই ২২ সেপ্টেম্বর নিবন্ধনের আবেদন জমা পড়ল। গড়ে উঠল ‘বেহালা দৃষ্টিহীন শিল্পনিকেতন’।

রেভারেন্ড লালবিহারী শাহ।

এ বার লালবিহারী শাহের কথায় আসা যাক। মধ্য কলকাতার লোয়ার সার্কুলার রোড অধুনা আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডে থাকতেন রেভারেন্ড লালবিহারী শাহ। লালবিহারীর পূর্বপুরুষেরা থাকতেন নদিয়া জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে। ধর্মে মুসলমান। পরবর্তী কালে ব্যাপটিস্ট মিশনারিদের সান্নিধ্যে এসে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন। কালাচাঁদ ও তারামণির সন্তান লালবিহারী জন্মগ্রহণ করেন ১৮৫৩-এর ১ ডিসেম্বর। তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধার অধিকারী।

১৮৯৪-এর কোনো এক দিন লালবিহারী নিজের বাড়িতেই গড়ে তুললেন দৃষ্টিহীনদের জন্য একটি শিক্ষাকেন্দ্র, একটি মাত্র ছাত্র নিয়ে। প্লেগ মহামারির জন্য সেই উদ্যোগ বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু দমবার পাত্র ছিলেন না লালবিহারী। বছর তিনেকের মধ্যেই চালু করলেন দৃষ্টিহীনদের একমাত্র শিক্ষাকেন্দ্র, পূর্ব ভারতে প্রথম এবং সমগ্র ভারতে তৃতীয়। জন্ম নিল ‘ক্যালকাটা ব্লাইন্ড স্কুল’।   

তখন পৃথিবীর উন্নত দেশগুলিতে ব্রেইল পদ্ধতিতে দৃষ্টিহীনদের পড়ানো শুরু হয়েছে। মাত্র ছ’টি চিহ্ন স্পর্শ করে দৃষ্টিহীনরা শিক্ষা আয়ত্ত করতে পারবে। বাংলা ও বিহারের দৃষ্টিশক্তি হারানো ছেলেমেয়েদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে লালবিহারী সৃষ্টি করলেন এক পদ্ধতি যা ‘শা ব্রেইল’ নামে পরিচিত হল।

তখন বেহালা-বড়িশা জনপদে একে একে গড়ে উঠছে বসতি। দু’ পাশের জায়গা চিরে দক্ষিণে এগিয়ে গিয়েছে ডায়মন্ড হারবার রোড। লালবিহারীর স্বপ্ন-শিল্পকেন্দ্র ‘ক্যালকাটা ব্লাইন্ড স্কুল’ শেষ পর্যন্ত লোয়ার সার্কুলার রোড, ইলিয়ট রোড, ডিহি শ্রীরামপুর রোড হয়ে স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পেল সেই ডায়মন্ড হারবার রোডের পাশেই। তত দিনে লালবিহারীর বয়স ৭০ পার হয়ে গিয়েছে। তৎকালীন বাংলার গভর্নর লর্ড লিটন এলেন দৃষ্টিহীন শিক্ষালয়ের আবাসিক ভবনের দ্বারোদঘাটন করতে। আজ থেকে ৯৬ বছর আগের ঘটনা। দিনটা ছিল ৩১ মার্চ, ১৯২৫। বছর তিনেক পরে প্রয়াত হন রেভারেন্ড লালবিহারী শাহ। দিনটা ছিল ১ জুলাই ১৯২৮।

সে দিন সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ‘বেহালা দৃষ্টিহীন শিল্পনিকেতন’ কমিটির সভাপতি প্রশান্ত চট্টোপাধ্যায়, সহ-সভাপতি মনোতোষ মুখোপাধ্যায়, উৎসব কমিটির রাজা ফৈয়াজ আলম, প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য স্বপন চট্টোপাধ্যায়, দিগ্বিজয় চৌধুরী সহ আরও অনেকে।

রাজা ফৈয়াজ আলম, দিগ্বিজয় চৌধুরী এবং বাসুদেব হালদার।

এ বার তিন জন সম্পর্কে একটু পরিচয় দেওয়া যাক।

লালবিহারী শাহ ও তাঁর কাজ সম্পর্কে বঙ্গ সমাজ খুব একটা অবহিত নন। সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করেছেন রাজা ফৈয়াজ আলম। লালবিহারীকে নিয়ে লেখা তাঁর বই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত সকলকে দেওয়া হয়।

লালবিহারীর আবক্ষ মূর্তি নির্মাণে যাঁর অবদান কখনও ভোলা যাবে না, তিনি হলেন বাসুদেব হালদার। শিল্পনিকেতনে যে ২০ জন কর্মী আছেন তাঁদের ম্যানেজার বাসুদেববাবু। নিজে শিল্পীদের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে, কায়িক পরিশ্রম করে মূর্তি তৈরি করিয়েছেন। শুধু তা-ই নয় মূর্তি নির্মাণ-সহ আনুষঙ্গিক খরচ বহন করে এক অনন্য নজির গড়েছেন।

প্রচারের দায়িত্বে রয়েছেন দিগ্বিজয় চৌধুরী। তাঁর মতে, শিল্পনিকেতনের কর্মসূচি নিয়ে প্রচারের আসল উদ্দেশ্য সমাজের চক্ষুষ্মান মানুষদের এই উদ্যোগে শামিল করা যাতে দৃষ্টিহীন বন্ধুরা স্বনির্ভর হতে পারেন।

ছবি: লেখক    

আরও পড়তে পারেন

পশ্চিমবঙ্গে সংক্রমণ সামান্য বাড়লেও কলকাতায় নতুন আক্রান্ত দুশোর কম

ত্রিপুরা পুরভোটে গেরুয়া ঝড়, প্রধান বিরোধীর ভূমিকায় তৃণমূল

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন