জোর বৃষ্টি। চিৎপুর রোডে তোলা শ্রয়ণ সেনের ছবি।

কলকাতা: শনিবার মহাষষ্ঠীর দিনে কলকাতা শহর ছিল জমজমাট। সন্ধের পর বৃষ্টি হলেও মানুষের উৎসাহে ভাটা পড়েনি। মণ্ডপে মণ্ডপে যথারীতি ছিল ঠাকুর দেখার ভিড়।

পুজোয় বৃষ্টি ভালো না রোদ, এই নিয়ে বিতর্ক ছিল তুঙ্গে। চূড়ান্ত অস্বস্তিকর পরিবেশে ঠাকুর দেখতে হচ্ছিল দর্শনার্থীদের। ঘর্মাক্ত পরিবেশ, পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল পারদ। এই পরিস্থিতিতে অনেকেই চাইছিলেন একটু বৃষ্টি হোক।

শেষ পর্যন্ত ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বৃষ্টি নামল। উত্তরপূর্ব বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণাবর্তের জন্য ষষ্ঠীর সন্ধ্যা থেকে গোটা দক্ষিণবঙ্গ জুড়েই বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে আবহাওয়া দফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। সেই পূর্বাভাস সত্যি প্রমাণ করে ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় মহানগরীতে বৃষ্টি নামে।

তবে গোটা শহর জুড়ে সমান ধারায় বৃষ্টি হয়নি। উত্তর কলকাতায় বৃষ্টির পরিমাণ বেশ বেশি ছিল। দক্ষিণ কলকাতার আলিপুরেও ১ ঘণ্টায় প্রায় ৪০ মিমি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আবার দক্ষিণ কলকাতার ইএম বাইপাস বরাবর অঞ্চলের বৃষ্টির পরিমাণ খুব বেশি ছিল না।

বৃষ্টি নামার ঠিক আগে। ছবি: শ্রয়ণ সেন।

পরিমাণ যা-ই হোক, বৃষ্টি পুজোর আনন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। কোথাও কোথাও কোনো কোনো এলাকা কিছুক্ষণের জন্য জলমগ্ন হলেও ঠাকুর-দর্শনার্থী মণ্ডপে ভিড় জমাতে দ্বিধা বোধ করেননি। আর বৃষ্টির পরিমাণ কোথাও কোথাও খুব বেশি হলেও স্থায়িত্ব বেশিক্ষণ ছিল না। মানুষ বৃষ্টির সময়টুকু কোথাও আশ্রয় নিয়ে পরক্ষণেই রাস্তায় নেমে পড়েছে।

তবে সন্ধ্যায় বৃষ্টি নামার আগে গরম বেশ ভালোই ছিল। বেশ গরমে বেশ অস্বস্তির মধ্যেই ছিল শহরবাসী। কিন্তু তাতে ঠাকুর দেখার উৎসাহে কোনো ভাটা পড়েনি। সকাল থেকেই যানজট সৃষ্টি হয়েছে শহরের সেই সব জায়গায় যেখানে জনপ্রিয় দুর্গোৎসব সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে বেশি। উত্তর কলকাতায় অনেক বেশি যানজট হয়েছে।

ভিড় সামলাতে পথে পুলিশ। একডালিয়া এভারগ্রিনের পুজোর সামনে। ছবি: রাজীব বসু

এ দিন সকাল থেকেই মানুষ মণ্ডপে ভিড় জমিয়েছেন। এ দিন ছিল শনিবার। অফিসকাছারির ছুটি শুরু হয়ে গিয়েছে। স্কুল-কলেজেও পুজোর ছুটি পড়ে গিয়েছে। তাই পঞ্চমীর তুলনায় স্বাভাবিক ভাবেই ষষ্ঠীর দিনে রাস্তাঘাটে মানুষ ও গাড়ির ভিড় ছিল অনেক বেশি। বেশ কিছু জায়গায় দিনের বেলাতেই পুলিশকে পথে নামতে হয়েছে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করার জন্য।

মহানগরের অন্যতম প্রাচীন সর্বজনীন বাগবাজারের পুজো নিয়ে এ বার কিছু সংশয় ছিল। পূজা-প্রস্তুতি দেরিতে শুরু হওয়ায় অনেকেরই মনে প্রশ্ন জেগেছিল, তা হলে বাগবাজার কি এ বার তাদের ঐতিহ্যগত ধারা থেকে সরে আসবে? না, বাগবাজার রয়েছে বাগবাজারেই। সেই চিরাচরিত ডাকের সাজের একচালা প্রতিমা দর্শন করে দর্শনার্থীরা তৃপ্ত হয়েছেন।

বাগবাজারের পুজো। ছবি: রাজীব বসু।

বাগবাজারের মতো ঐতিহ্যগত পুজো যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে থিমের পুজো। শহরে অসংখ্য থিমের পুজোর মাঝে দু’-একটি থিম বেশ অভিনব লাগছে। তেমনই একটি থিমে এ বার পুজো করছে বালিগঞ্জের বন্ডেল রোডে ২১ পল্লী। সেই থিম হল ভ্রমণ।     

বাঙালির ভ্রমণের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে একটি শব্দগুচ্ছ, ‘বড়ো ঘড়ি।’ এই মোবাইলের যুগেও বড়ো ঘড়ির গুরুত্ব অপরিসীম। হাওড়া স্টেশনের পুরোনো কমপ্লেক্সের এই ঘড়ির তলায় দাঁড়ানো মানেই ভ্রমণের শুরু।

বালিগঞ্জের একুশ পল্লীর পুজোমণ্ডপের ভেতরে প্রবেশ করে একটু ডান দিকে ওপরে তাকালেই সেই বড়ো ঘড়িটা। মনে হবে যেন হুবহু হাওড়া স্টেশন থেকে খুলে এখানে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে শুধুমাত্র এই বড়ো ঘড়িই নয়, পুজোমণ্ডপটি এমন ভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে, যাতে সকল ভ্রমণপ্রিয় মানুষ আবেগে ভাসবেনই।

২১ পল্লীর মণ্ডপে হাওড়া স্টেশনের বড়ো ঘড়ি। ছবি: শ্রয়ণ সেন।

গত দু’ বছরের দুঃসহ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে মানুষ এ বার মুক্ত। করোনা নামক সেই অসুর এখন গুরুত্বহীন। এই সুযোগে তাঁরা আবার ভ্রমণমুখী হয়ে উঠেছেন। আমাদের মন-শরীর ভালো রাখার অন্যতম উপকরণ হল ভ্রমণ। করোনার সময়ে মানুষকে ভ্রমণ নিয়ে যতই ভয় দেখানো হোক না কেন, তারা বেরিয়ে পড়েছে। কিন্তু তার মধ্যে যেন স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল না। ভ্রমণে বেরোলেও একটা ভয় সব সময় কাজ করত। এই বুঝি অসুস্থ হয়ে ফিরতে হয়। কিন্তু এ বার সেই সবের আর বালাই নেই। মানুষ এ বার মুক্ত। 

মুক্ত’- মণ্ডপের দেওয়ালে এই শব্দটা জ্বলজ্বল করছে, আরও তিনটে শব্দের সঙ্গে, ‘ভ্রমণ’, ‘গন্তব্য’, ‘ছুটি।’ আসলে ভ্রমণ মানেই তো মুক্তি, ভ্রমণ মানেই তো ছুটি, তাই না? একুশ পল্লীর এই মণ্ডপ সজ্জার সব পরিকল্পনা করেছেন শিল্পী দম্পতি সুমি এবং শুভদীপ মজুমদার।

সুখিয়া স্ট্রিটে শ্রীমানীবাড়ির মৃন্ময়ী মা। ছবি: রাজীব বসু।

কলকাতার সর্বজনীন পুজোগুলোর মতো বনেদিবাড়িগুলোর পুজো খুব বিখ্যাত। পুজোর ক’টা দিনে বনেদিবাড়ির ফটক সাধারণের জন্য খুলে যায়। দশমী পর্যন্ত সেখানে অবারিত দ্বার। সব বনেদিবাড়িতেই প্রতিমাসজ্জা সম্পূর্ণ। ষষ্ঠীর সন্ধায় মায়ের বোধনও হয়ে গিয়েছে। রাত পোহালেই সপ্তমী। ভোর থেকেই শুরু হয়ে যাবে কলাবৌ স্নানের তোড়জোড়।

আরও পড়তে পারেন

দেশে চালু হল ৫জি, প্রধানমন্ত্রী মোদীকে ডেমো দেখালেন মুকেশ-পুত্র আকাশ অম্বানি

ভ্রামণিকদের আকর্ষণ করছে একুশ পল্লীর উদ্ভাবনী থিম

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন