সুপূর্ণা চৌধুরীকে স্মরণ: মন্ত্রোচ্চারণ করছেন সুপ্রিয় ঠাকুর। সংগীত পরিবেশন করছেন শ্রীমন্তী মুখোপাধ্যায়, শ্রীনন্দা মল্লিক ও শ্রীনন্দা মুখোপাধ্যায়। শ্রীমন্তীর পাশে বসে উৎসা গুপ্ত।

পাপিয়া মিত্র

তিনি মা, তিনি নানাই, তিনি পিসিমা, জেঠিমা, মাসিমা, দিদিভাই। আবার বৌদিও। সর্বোপরি তিনি একজন সংগীতশিল্পী। অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর কাছে তিনি ‘গানের মিস’ বা সুপূর্ণাদি। এমন এক স্বজনঘেরা শিল্পীর স্মরণসভা যে এক আবেগঘন আবহ তৈরি করবে তা সহজেই অনুমেয়। সম্প্রতি কলকাতার ব্রাহ্মসমাজ হলে সময়ানুবর্তিতাকে আরও এক বার প্রমাণ করে ‘ইন্দিরা শিল্পীগোষ্ঠী’ সুপূর্ণা চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করল ‘কবে আমি বাহির হলেম’ গানটি দিয়ে।

সেই ব্যক্তিত্ব, সেই অমলিন মিষ্টি হাসিমাখা মুখের সংগীতশিল্পী ও পাঠভবন স্কুলের শিক্ষিকা সুপূর্ণা চৌধুরীর প্রথম স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছিল এক শ্রাবণঘন সন্ধ্যায়। টানা দু’ ঘণ্টার আয়োজনে কোনো অতিরিক্ত বাক্যব্যয় ছিল না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজো দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র সুবীরেন্দ্রনাথ ও পূর্ণিমা ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ সন্তান শিল্পী সুপূর্ণা চৌধুরী। খুব সম্ভবত জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির শেষ মানুষ, যাঁর জীবনের কিছুটা সময় কেটেছে ইন্দিরাদেবী চৌধুরানীর সান্নিধ্যে।

ভাই সুপ্রিয় ঠাকুরের মন্ত্রোচ্চারণের পর প্রয়াত শিল্পীর চতুর্থ প্রজন্ম উৎসা গুপ্ত প্রণাম জানায় ‘মধুর ধ্বনি বাজে’র মাধ্যমে। ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম’ ও ‘অনেক দিনের শূন্যতা মোর’ গেয়ে সোনায় মোড়া দিনের কথা মনে করিয়ে দিলেন কন্যা শ্রীনন্দা মুখোপাধ্যায় ও পৌত্রী শ্রীমন্তী মুখোপাধ্যায়। দীর্ঘ সময়ের ছাত্রী ও ‘ইন্দিরা’ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষিকা শ্রীনন্দা মল্লিক পরিবেশন করেন ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু’। এই গান শোকের নয়। গানের মধ্য দিয়েই আবার তাঁকে ফিরে পাওয়া। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর একটি জীবনে যত বার শোকের সম্মুখীন হয়েছেন তত বার বলেছেন ‘শোকের বহির্প্রকাশ ঘটিয়ে শোককে নত হতে না দিতে’। আর এখান থেকেই নবসূচনা। ছাত্রী মধুরা ভট্টাচার্য রজনীকান্ত সেনের ‘ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়’ পরিবেশন করেন। ছাত্র প্রবীর ঘোষ, স্নিগ্ধদেব সেনগুপ্ত শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন ‘আকাশ জুড়ে শুনিনু’ ও ‘আমি বাঁধিনু তোমার তীরে তরণী আমার’ দিয়ে। আবৃত্তির মধ্য দিয়ে সুপূর্ণাকে স্মরণ করেন প্রণতি ঠাকুর। তার আগে তিনি সুপূর্ণা চৌধুরীকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন।

এ দিনের অনুষ্ঠানে আর যাঁরা স্মৃতিচারণ করেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন সুদৃপ্ত ঠাকুর, সুরশ্রী দাশ, অভিষেক চৌধুরী, নন্দিনী চৌধুরী, সুনন্দা চৌধুরী, আর্যক গুপ্ত, শ‍্যামশ্রী দাশগুপ্ত, সুতনুকা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়, চান্দ্রেয়ী গুপ্ত, অরুণ দে ও দীপঙ্কর সরকার।

সমবেত সংগীত পরিবেশন।

সকলের প্রিয় সুপূর্ণাদিকে পাওয়া গেল আত্মজদের স্মৃতিচারণ থেকে। টুকরো টুকরো কথামালা থেকে যে ছবি উঠে এল তা এক সহজ সরল প্রাণখোলা সদা হাসিমুখ ব্যক্তিত্বের। সময় ১৯৫৯-৬০। পুরুলিয়ায় রবীন্দ্রশিক্ষক হয়ে গেলেন সুভাষ চৌধুরী (স্বামী) ও সুপূর্ণা চৌধুরী। যোগাযোগের মাধ্যম ছিলেন শৈলজারঞ্জন মজুমদার। সেখানে একটি হারমোনিয়ামই তখন যথেষ্ট ছিল। অনেক ছাত্রছাত্রী তাঁদের কাছে গান শিখতে এল। ক্রমে তৈরি হল রবীন্দ্রসংগীত পরিষদ। বিদ্যুৎ ছিল না। পেট্রোম্যাক্সের আলোয় নানা গানের অনুষ্ঠান হত। 

তার পাঁচ-ছ’ বছর পর। ২৮ জুন, ১৯৬৫। পাঠভবন স্কুল প্রতিষ্ঠা হল কলকাতায়। প্রথম দিনের প্রথম ক্লাস নিলেন সুপূর্ণাদি। শান্তিনিকেতনের আদর্শেই যে পাঠভবন স্থাপিত হয়েছিল তা জানা গেল স্মৃতিকথায়। শুধু পাঠ নয়, পড়ুয়ারা যেন ভাষার জ্ঞানকে জীবনে সঞ্চয় করে নিয়ে যেতে পারে, সে দিকে লক্ষ রাখা হত।

স্মৃতিচারণে গানের মহড়ার প্রসঙ্গও এল। কথায় কথায় জানা গেল সুপূর্ণাদি যখন গান শেখাতেন মনেই হত না যে কোনো যন্ত্রানুষঙ্গ নেই। এমনই সুরেলা সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর। শাসনবিরোধী এক আবহ তৈরি হয়ে উঠত সেই মুহূর্তগুলিতে। এক শব্দহীন পরিবেশ তৈরি হয়ে উঠত। যার সঙ্গে তুলনা করা যায় ফুল ফোটার মুহূর্তকে। এমনই শান্ত, ভালোবাসার মানুষটি ইন্দিরাদেবী চৌধুরানী, অমিয়া ঠাকুর, পূর্ণিমা ঠাকুর, শৈলজারঞ্জন মজুমদার, শান্তিদেব ঘোষ প্রমুখের কাছে সংগীতশিক্ষা করেছিলেন। সেই ঐতিহ্যের প্রবাহ তাঁর রক্তে আজীবন বহমান ছিল।

পৌত্রী শ্রীমন্তীর ‘নানাই’ ডাকটি বড়ো মিষ্টি। সেই ডাকের অধিকারী এক ছাত্রী উল্লেখ করলেন পায়েস খাওয়ার কথা, আচার বানানোর কথা। আরও এক ছাত্রী জানালেন, তাঁর নিজের মাতৃবিয়োগের পরে মানসিক শান্তির খোঁজে তিনি ছুটে গিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে, সুপূর্ণা মিসের কাছে। ‘মা’-এর ভূমিকা পালন করে গিয়েছেন শেষ দিন পর্যন্ত। মিস কিন্তু বকুনি দিতে জানতেন না। তবে সেই ‘বকুনি’ এসেছিল শেষের দিনগুলোয়। দেখা করতে যেতে বিলম্ব হলেই বকুনি খেতে হত। 

পুজোর সম্মিলন হত শান্তিনিকেতনে। সেখানে আত্মজদের কথায়-গানে-গল্পে মুখর হয়ে উঠত শান্তিনিকেতনের আকাশবাতাস। এস্রাজে বসতেন ভাইপো। গানের আবদার ফেলতে পারতেন না পিসিমা সুপূর্ণা। ‘বড়মা’ ডাকের অধিকারী যে ভাসুরপো, তিনি শিখেছিলেন জীবনবোধের রবীন্দ্রগান। ‘বড় বেদনার মতো বেজেছ’, ‘অশ্রু নদীর সুদূর পারে’, ‘খেলা ভাঙার খেলা’ আরও কত!

আবৃত্তি করছেন প্রণতি ঠাকুর।        

আরও এক মিষ্টি নাম ছিল সুপূর্ণার। দিদির বদলে ‘দুদা’। তুতো ভাইবোনদের একসঙ্গে হওয়া লাল বাংলায়। গানে গল্পে মেতে উঠত ঘরদালান। যে কোনো দায়িত্ব পেলে নিপুণ ভাবে তা সম্পন্ন করতেন ‘দুদা’। সে ‘কালমৃগয়া’, ‘তাসের দেশ’  পরিচালনা হোক বা বিয়েতে গানের তালিকা ঠিক করা। ‘ইন্দিরা’য় গানের শেষে শিঙাড়া-চায়ের কথাও তুলতে ভুল হল না। সেই ধারাবাহিকতা অবশ্য আজও অব্যাহত। 

দিদিভাই, বন্ধু, সর্বোপরি মা – এই ভূষণ দিয়েছেন চৌধুরী পরিবারের জা। দেখা হলে কত গল্প যে করতেন! গল্প মোড় নিত শিশুকালে, নবীন বয়সের পড়াশোনায়, গান শেখায়। পরবর্তীতে ‘দাদা’র (সুভাষ চৌধুরী) সঙ্গে আলাপ ও তাঁর সঙ্গেই ঘর বাঁধা। শান্তিনিকেতনে কেউ পৌঁছোলে দরজা খুলে যে হাসি হাসতেন, তাতে পথের সমস্ত কষ্ট মিলিয়ে যেত এক নিমিষে। বিদায়কালে তাঁর ‘আবার আসিস’ শুনলে বুকে মোচড় দিয়ে উঠত। সে সব যে ভোলার নয়। নম্র, সভ্য, ভদ্র, সুশীল বৌয়ের তকমা পেয়েছিলেন ‘দিদিভাই’।

ক্যামেরা, সাক্ষাৎকার – এ সব একেবারে এড়িয়ে চলতেন। জানালেন ভাইবৌ। তবে জীবনের শেষের দিকে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে সাক্ষাৎকারটা এড়াতে পারেননি। জীবনের মূল্যবান সময় যে ওখানেও কেটেছে। বাড়ির অলিন্দে, সিলিং-এর কড়িবরগায়, উঠোনে, দালানে, সিঁড়িতে অনেক স্মৃতি। তাই সে-ই সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। গেয়েছিলেন ‘মনে রবে কি না রবে আমারে’। বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন। লীলা মজুমদারের বই খুব পড়তেন। বহু দিনের বন্ধুর কাছে আবদার ছিল লীলা মজুমদারের ‘শ্রীমতি’ বইটির। সেটি আর দেওয়া হল না। তার আগেই…।

আপাতসরল বালিকাসুলভ মাতৃময়ী এক শিল্পীর স্মরণসভার আয়োজন শুধু একদিনের ব্যাপার নয়। ‘ইন্দিরা’ সংগীত প্রতিষ্ঠান যত দিন সচল থাকবে তত দিন সুপূর্ণা চৌধুরী থাকবেন সকল আত্মজের অন্তরে। আবার মন্ত্র উচ্চারণ, আবার ইন্দিরার নিবেদন ‘তুমি খুশি থাকো’।

ছবি: প্রতিবেদক

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন