আষাঢ়ের শেষলগ্নে কলকাতায় বৃষ্টির ঘাটতি ৬৬ শতাংশ, এই নজিরবিহীন পরিস্থিতি কেন?

0

নিজস্ব প্রতিনিধি: তিন বছর আগে এমন একটা বর্ষা দেখেছিল কলকাতা। তবে তখনও পরিস্থিতি এতটা খারাপ ছিল না, যতটা এ বছরে চলছে। জুলাইয়ের প্রায় দশ দিন পেরিয়ে গেল, আষাঢ়ের শেষলগ্নে পৌঁছে গেল, তবুও সে ভাবে বৃষ্টির দেখা নেই শহরে। এখন পর্যন্ত এমন একটা দিন গেল না, যে দিন কলকাতায় জল-জমা বৃষ্টি হয়েছে। কলকাতা জলমগ্ন হয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ তা বলাই বাহুল্য, কিন্তু তার পাশাপাশি শহরে প্রবল বৃষ্টির চিহ্নই ওই জল-জমা। এ বার সেটা না হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে কলকাতায় কী পরিমাণ বৃষ্টি কম হয়েছে।

স্বাভাবিকের থেকে ৬৬ শতাংশ কম বৃষ্টি

আলিপুর আবহাওয়া দফতরের তরফ থেকে পাওয়া কিছু তথ্যের বিশ্লেষণ করা যাক। ১ জুন থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত শহরে বৃষ্টি হয়েছে মোট ১৩০ মিমি। জুনে যেখানে ২৯৯ মিমি বৃষ্টি হওয়ার কথা, সেখানে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৯৪ মিমি। তার পর জুলাইয়ে প্রথম আট দিন শহরে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৩৬ মিমি। ফলে এই মুহূর্তে শহরে স্বাভাবিকের থেকে ২৩০ মিমি কম বৃষ্টি হয়েছে। শতাংশের বিচারে, স্বাভাবিকের থেকে ৬৬ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে।

জেলার অবস্থা ততটা খারাপ নয়

এ বার এখনও পর্যন্ত গোটা দক্ষিণবঙ্গেই চরম ঘাটতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে বর্ষা। তবুও শহরের আশেপাশের জেলাগুলির অবস্থা কলকাতার মতো খারাপ নয়। বেশির ভাগ জেলাতেই গড়ে বৃষ্টির ঘাটতির পরিমাণ ৪০ শতাংশ মতো। জুনের শেষে এই ঘাটতি আরও অনেক বেশি ছিল, ধীরে ধীরে জেলাগুলিতে সেই ঘাটতি কমেছে। কিন্তু কলকাতায় কমার কোনো লক্ষ্মণই নেই, উলটে তা আরও বেড়ে গিয়েছে।

শহরে বৃষ্টি কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে কতটা দায়ী পরিবেশ ধ্বংস?

কলকাতায় এ বার বর্ষার বৃষ্টির চরম ঘাটতির কারণ হিসেবে পরিবেশের ধ্বংসকে অনেকটাই দায়ী করেছে বেসরকারি আবহাওয়া সংস্থা ওয়েদার আল্টিমা। সংস্থার কর্ণধার রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা পুঙ্খনাপুঙ্খ বিশ্লেষণে এই কারণগুলি তুলে ধরেছেন –

১) ক্রমাগত গাছ কাটা, সবুজ কমে যাওয়া – এর ফলে শুকনো হাওয়া যাবতীয় জলীয় বাষ্পকে শেষ করে দিচ্ছে। গাছ থাকলে জলীয় বাষ্প বৃষ্টি হয়ে নেমে আসত।

২) দূষণের মাত্রা – শহরের ক্রমবর্ধমান দূষণ অনেকটাই দায়ী বৃষ্টি কমানোর জন্য। কারণ অনেক সময়েই দেখা গিয়েছে, দূষণের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে বজ্রগর্ভ মেঘ শহরে ঢুকতে পারছে না।

৩) শহরের পূর্বাংশে ভেড়িগুলো বুজিয়ে বাড়ি নির্মাণ হওয়া – এর ফলে জলীয় বাষ্পের জোগান কমে যাচ্ছে।

৪) ধীরে ধীরে জল কমছে হুগলি নদী এবং শহরের খালগুলিতে – একই ব্যাপার। কমছে জলীয় বাষ্পের জোগান।

৫) বাতানুকূল যন্ত্রের অত্যধিক ব্যবহার – শহরের দূষণের মাত্রাকে সরাসরি বাড়িয়ে দিচ্ছে বাতানুকূল যন্ত্রের ব্যবহার। ফলে বৃষ্টি কমে যাওয়ার পেছনে এটাও একটা কারণ।

আবহাওয়াগত কারণ

শুধু পরিবেশের দিক থেকেই নয়, এ বছর আবহাওয়াগতও কিছু কারণ রয়েছে, যার জন্য বর্ষায় এখনও সে ভাবে বৃষ্টি হয়নি শহরে। রবীন্দ্রবাবুর ব্যাখ্যা অনুযায়ী-

১) বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমবঙ্গ লাগোয়া অঞ্চলে ঘূর্ণাবর্ত বা নিম্নচাপের দেখা মিলছে না। ফলে পর্যাপ্ত বৃষ্টি কলকাতাকে এড়িয়ে যাচ্ছে।

২) আবার অন্য দিকে মধ্য ভারতের ওপরে ঘূর্ণাবর্ত থাকছে। যে ঘূর্ণাবর্ত আরব সাগর থেকে সমস্ত জলীয় বাষ্পকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে কলকাতা তথা দক্ষিণবঙ্গের দিকে কিছুই পাঠাচ্ছে না। ফলে এখানে এই বৃষ্টিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

এ রকমই চলবে, না কি পরিস্থিতির উন্নতি হবে?

আশার কথা শুনিয়েছে ওয়েদার আল্টিমা। আসলে এ বার দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টি কম হবে, সেটা আগেই জানানো হয়েছিল। বলা হয়েছিল ‘এল-নিনো’ পরিস্থিতির জন্য খরা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে রাজ্যে। অনেকটা সেই পরিস্থিতির দিকেই যাচ্ছে দক্ষিণবঙ্গ। তবে এ বার সেই ‘এল-নিনো’ ধীরে ধীরে দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতেই আশার আলো দেখছেন রবীন্দ্রবাবু।

তিনি বলেন, “এল-নিনো দুর্বল হচ্ছে এবং বঙ্গোপসাগরে একের পর এক নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে। ফলে আগামী ১০-১৫ দিনের মধ্যে বর্ষা পুরোদমে হাজির হতে পারে কলকাতায়।” কলকাতাবাসীর কাছে আপাতত রবীন্দ্রবাবুর এই আশার বাণীটাই ভরসা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here