smita das
স্মিতা দাস

রথের রশিতে টান আর দুর্গাপুজোর গান একই সঙ্গে শুরু হয়। এই বছরও সেই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। দিকে দিকে খুঁটিপুজোর মধ্যে দিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে দেবীবন্দনা শুরু হয়ে গিয়েছে। তার সঙ্গে শুরু হয়েছে কুমোরটুলি পাড়ায় প্রতিমা বায়নার পালাও। কিন্তু এই বারের ছন্দ বেশ ঢিমে। তাই নিয়ে শিল্পীদের মধ্যে চাপা দুশ্চিন্তা গুমরে উঠছে। কেমন কাটবে এই বছরের বাজার। সবই এখন চার আঙুলের ভরসা। তবে মানুষ তো আশায় বাঁচে। সেই আশা ছাড়েননি তাঁরাও। দেখা যাক।

গোটা কুমোরটুলি ঘুরে কিছুটা হাওয়া বোঝার চেষ্টা করা গেল। কোথাও মাটি ঠাসা হচ্ছে, কোথাও খড়বিচালি বাঁধা হচ্ছে। কোথাও বা মাটি লাগানো চলছে।  অলংকার বানাচ্ছেন যাঁরা, তাঁরাও টুকটুক করে ঘাড় গুঁজে কাজ করে চলেছেন।

খড়ের ওপর মাটির প্রলেপ দেওয়ার কাজ চলছে

কথা বলা হল বিভিন্ন শিল্পীর সঙ্গে। মহিলা শিল্পী জবা পাল বলেন, এখনও অবধি এ বারের বাজার বেশ খারাপ। অন্যান্য বছর এই সময়ের মধ্যে যে পরিমাণ কাজের বায়না আসে, যে তৎপরতা থাকে, সেই সব কিছুই এখনও শুরু হয়নি। কিছু বাইরের বায়না কাজ হচ্ছে। তবে তাঁর আশা, কিছু দিন পরে হলেও বায়না পাবেন। এর জন্য তিনি দায়ী করছেন রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক সমস্যাকেই।

প্রতিমার অলংকারশিল্পী ফণীভূষণ মালাকারেরও একই কথা – এখনও পর্যন্ত এ বছরের বাজার বেশ মন্দা। প্রতিমার বায়নার ওপর অলংকারের চাহিদা নির্ভর করে। কিন্তু সে দিক থেকে দেখলে অলংকারের অর্ডার নেই। প্রতি বারই নতুন কিছু নকশা, নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন তিনি। তেমনটি এ বারও ভেবে রেখেছেন। কিন্তু অর্ডার না পেলে সবই মাটি, মন্তব্য তাঁর। তবে বাজার শেষ অবধি কেমন যাবে এখনই তা বলা যাচ্ছে না বলেই মনে করছেন তিনি।  

তৈরি হচ্ছে গয়না

শিল্পী মালা পাল বললেন, তিনি ছোটো ঠাকুর বেশি করেন। সেইমতো কিছু বায়না এখনও অবধি এসেছে। তবে এ বারে তিনি তিনটি বড়ো পুজোর কাজ হাতে নিয়েছেন।

শিল্পী মোহনবাঁশী রুদ্র পাল বলেন, তিনি এখনও পর্যন্ত মোটামুটি ভালোই অর্ডার পেয়েছেন। তাঁকে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। তবে অনেক শিল্পীই সমস্যার কথা বলছেন।

চলছে ফাইবারের ঠাকুরে রং করার কাজ

কুমোরটুলির ঘরে ঘরে বায়নার খাতার চিত্রটা ঠিক কী? তা জানতে কথা বলা হল কুমোরটুলি মৃৎশিল্পী সংস্কৃতি সমিতির যুগ্ম সম্পাদক রঞ্জিত সরকারের সঙ্গে। তিনি বললেন, এই বারের হাওয়া বেশ হালকা। ২০১৮ সালের সঙ্গে তুলনা করলে এখনও পর্যন্ত এই বছরের বায়নার সংখ্যা অনেক কম। রথের দিন অন্যান্য বারে যে পরিমাণ অর্ডার পাওয়া যায় তার তিল মাত্রও এখনও হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

তার জন্য দায়ী কাকে করবেন? প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এই পরিস্থিতির জন্য অনেকটাই দায়ী রাজনৈতিক পরিস্থিতি। পাশাপাশি তার ফলে প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতেও। তা ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টি তো রয়েছেই। বলেন, এই সময়ে বিদেশে বা রাজ্যের বাইরেও অনেক ঠাকুর পাঠিয়ে দেওয়া হয়ে যায়। সেখানে এই বছর তেমন বায়নাই আসেনি। ফলে মৃৎশিল্পীরা যেমন হতাশ তেমনই হতাশ প্রতিমার অলংকারশিল্পীরাও। কারণ প্রতিমা হলে তবেই তো অলংকার লাগে। তবে রবিবারগুলি একটু করে আশার আলো জাগিয়ে তুলছে। ওই দিন কুমোরটুলি দেখলে মনে হচ্ছে পুজো এসেছে। কিন্তু অন্য বারের তুলনায় শতকরা হিসাবে এই বার অর্ধেকেরও অর্ধেক বায়না পাওয়া গিয়েছে। গত বছর ও তার আগের বছর জিএসটি নিয়ে কিছু সমস্যা ছিল ঠিকই কিন্তু তা-ও বাজার ভালোই ছিল।

গণেশ পুজোর প্রস্তুতি

রঞ্জিতবাবু বলেন, কাটমানি এই বারে পুজোর বাজারে একটি বিরাট প্রভাব ফেলেছে। রথের দিন খুঁটিপুজোতেই এই অর্থ কাজে লাগিয়ে বহু পুজো কমিটি অনেক উপহার দিয়ে থাকে। আর সেই সব উপহার কুমোরটুলি থেকেই তারা কিনে নিয়ে যায়। কিন্তু এই বারে সেই ধরনের কোনো ব্যবসাই হয়নি।

তিনি বলেন, বিদেশের বায়না পাওয়ার ক্ষেত্রে বলা যায় গোটা কুমোরটুলি থেকে প্রায় ৪০-৪২টি ঠাকুর বাইরে যায়। তাতে কিছু শোলার ঠাকুর থাকে, তবে বেশির ভাগটাই ফাইবারের। দেখা যাক এই বছর কী হয় শেষ পর্যন্ত।

এক চালচিত্রের ছোট্টো দুর্গা পাড়ি দেবে মার্কিন যুক্ত্রাষ্ট্রে

গোটা চত্ত্বর ঘুরে যা দেখা গেল বেশির ভাগ শিল্পীর কণ্ঠে হতাশা, কুমোরটুলি যেন থমকে আছে। ভগবানের আঁতুড়ঘরের শিল্পীদের সঙ্গে মন মিলিয়ে সবাই কামনা করছেন, প্রতিমার বাজার এ বার যেন ভালোই যায়। আসল ছবিটা বোঝা যাবে আর কিছু দিন পর।

আরও পড়ুন – রুপোলী পর্দা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে হিন্দুস্থান পার্কের খুঁটিপুজো

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here