colalage

শৌভিক পাল, কলকাতা: এক দশক পেরিয়ে গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত কলেজ স্ট্রিটের ‘বর্ণপরিচয়’ মার্কেটের বর্তমান-ভবিষ্যৎ রয়েছে অন্ধকারেই। ২০০৬ সালে কলকাতা পুরসভা বেঙ্গল শেল্টার সংস্থার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাদের ‘বর্ণপরিচয়’ মার্কেট নবনির্মাণের দায়িত্ব দেয়। বারো বছর পেরিয়ে গেলেও আজও পর্যন্ত মার্কেটের কাজ শেষ হয়নি, বরং অভিযোগের বোঝা ভারী হয়েছে।

বহু পুরোনো কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের ভগ্নপ্রায় অবস্থা ঘোচাতে বারো বছর আগে কলকাতা পুরসভা বাজারটির নবনির্মাণের দায়িত্ব দেয় বেঙ্গল শেল্টার সংস্থাকে। সেই সংস্থা পুরসভার অধীনস্থ জায়গায় নির্মাণকাজের জন্য ব্যবসায়ীদের অন্যত্র স্থানান্তরিত করে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তাঁদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল পুরোনো জায়গায় যিনি যে ভাবে ব্যবসা করেছেন এবং যতটা জায়গা নিয়ে করেছেন তার সমস্তটাই ফেরত পাবেন তাঁরা, কিন্তু আশ্বাসমতো কাজ হয়নি। বর্তমানে যে সব সমস্যা রয়েছে, কত দূর তার সমাধান হবে এখন তা নিয়েই চিন্তিত মার্কেটের বিশাল সংখ্যক ব্যবসায়ী।

বর্তমানে মার্কেটের নির্মাণকাজ কোন পরিস্থিতিতে রয়েছে? এক নজরে দেখে নিলে সবার কাছেই পরিষ্কার হয়ে যাবে মার্কেটের ছবি। কলকাতা পুরসভা বেঙ্গল শেল্টারের ওপর দায়িত্ব দিয়েছিল নীচটা ও প্রথম তল নির্মাণের। তার ওপর যে নির্মাণই হোক না কেন তা সম্পূর্ণ পিপিপি মডেলে হবে। কিন্তু নির্মাণসংস্থা প্রথম তল পর্যন্ত করেছে ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে যে সব ব্যবসায়ীর যতটা করে জায়গা ছিল তাঁরা তা ঠিকমতো ফেরত পাননি বলে অভিযোগ। কেউ কেউ পেলেও অনেকেই এখনও পর্যন্ত উদ্ভুত নানা অসুবিধার কারণে রয়ে গিয়েছেন অস্থায়ী জায়গাতেই। নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ না হওয়ায় বর্ষার জল পড়ে এমন অনেক জায়গাতেই ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারছেন না। আবার বহু ব্যবসায়ীকে সঠিক জায়গা না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

ব্যবসায়ীদের বেশ কিছু অভিযোগে অবশ্য পুরসভার আধিকারিকরা ‘এ কোনো সমস্যাই নয়’ উড়িয়ে দিচ্ছেন।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ কী কী?

পুরোনো বাজারের মাছ-বাজার ও লোহাপট্টির মাঝের রাস্তা দখল করেছে নির্মাণ সংস্থা, যা মানুষের কাছে খুবই বড়ো একটা সমস্যা।

পুরসভার অধীনে থাকা প্রথম তল পর্যন্ত যে নির্মাণ করা হয়েছে তা উচ্চতায় অনেকটাই খাটো।

শম্ভু চ্যাটার্জি স্ট্রিট ও মদনমোহন বর্মন স্ট্রিটের ওপর একটা বড়ো অংশ জুড়ে ঢালাই করে বিক্রি করার পরিকল্পনা করছে বেঙ্গল শেল্টার সংস্থা। এই কাজ আইনবিরুদ্ধ হলেও পুরসভা এতে গা করছে না।

ব্যবসায়ীদের আরও অভিযোগ, পুরো প্রজেক্টে ক্ষতিপূরণের কোনো স্তর নেই। এ ছাড়াও ১০০ টাকার নোটারি পেপারে রেজিস্ট্রি করে এত বড়ো কাজ করছে সংস্থা।

অস্থায়ী বাজারের বহু ব্যবসায়ী নবনির্মিত ‘বর্ণপরিচয়’-এ ব্যবসা শুরু করেছেন বটে, কিন্তু এখনও অনেকে পুরোনো জায়গাতেই আছেন। অস্থায়ী বাজারে গিয়ে দেখা গেল ১৮ জন ফুল ব্যবসায়ী আছেন সেখানে। তাঁরা কেন নতুন জায়গায় যাচ্ছেন না? তাঁদের অভিযোগ, নতুন জায়গায় তাঁদের জন্য যেটুকু বরাদ্দ করেছে পুরসভা, তা পুরোনো জায়গার থেকেও ছোটো। এ ছাড়াও বাজারের এমন জায়গা তাঁদের দেওয়া হয়েছে যেখানে ক্রেতা যাবেনই না, কারণ সে জায়গা বাজারের একেবারেই পেছনে। এ ছাড়াও অনুষ্ঠান উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা যে বিবাহের গাড়ি সাজানোর বরাত পান, সে সব বন্ধ হয়ে যাবে শুধুমাত্র জায়গার অভাবে, বলছেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ বহু। কিন্তু পুরসভা এর কী সমাধান করছে? এ প্রসঙ্গে ‘বাজার’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ আমিরুদ্দিন (ববি) সাহেব বলেন, “আমি আসার পর বাজারের বি ব্লক ও সি ব্লক চালু করে দিয়েছি। মদনমোহন বর্মন স্ট্রিটে পাঁচ বছর ধরে বন্ধ হয়ে থাকা অটোর রাস্তা চালু করা হয়েছে”। আর পুরোনো বাজারে যাঁরা এখনও রয়েছেন, তাঁদের কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন জায়গায় আনা হবে বলে জানাচ্ছেন ববি বাবু। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ প্রসঙ্গে অবশ্য তিনি বলেন, “মার্কেটে আর কারোর কোনো অভিযোগই নেই।”

এ ভাবেই চলছে ‘কাজ’

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ প্রসঙ্গে বেঙ্গল শেল্টার-এর আধিকারিক সমর নাগ অবশ্য কোনো কিছুই বলতে রাজি হননি। বাজার প্রসঙ্গে তিনি কিছু বলতে ইছুক নন বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।

ব্যবসায়ীদের বহু অভিযোগের পাশাপাশি অনেক নিয়মবিরুদ্ধ কাজও চলছে এখানে। নিষেধ থাকা সত্ত্বেও বস্ত্র বিপণি বাজারের মধ্যেই চলছে গ্যাস জ্বালিয়ে রান্নাবান্না। বহু ব্যবসায়ী যাঁদের দোকান বাজারের পেছনে, তাঁরা পুরসভার ঢিলেমির সুযোগ নিয়ে ব্যবসা করছেন সামনে এসে।

ভিতরে চলছে রান্নাবান্না

বাজার কমিটির সম্পাদক আশিস দাস বলেন, কলকাতা পুরসভা এই প্রকল্প গড়তে ব্যর্থ। এটা একটা আইনি পথে বেআইনি নির্মাণ। বহু বছর ধরে কাজ চলার জন্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়ার একটা প্রক্রিয়া করছে পুরসভা ও বেঙ্গল শেল্টার। খাতায়-কলমে কাজ চলছে এমনটা দেখানোর জন্য প্রতি দিনই কিছু নির্মাণ সামগ্রী আসছে, যেখানে ৫০০ লোক কাজ করা উচিত সেখানে রয়েছে মাত্র জনা চারেক লোক। ব্যবসায়ীরা যেটুকু জায়গা পাচ্ছেন পরিবারের কথা ভেবে তা-ই মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

জমি সরকারের, ব্যাঙ্কের টাকাও সরকারের, পুরসভার কাছে সব থাকা সত্ত্বেও পুরসভা নিজে কেন হাল ধরল না? প্রশ্ন থেকেই যাছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here