ওলা, সুইগি, উবেরের প্রথম মহিলা চালক রূপার দিদিগিরি

0
Rupa Chowdhury

অর্ণব দত্ত

পিচবোর্ডে ফুটো করে আলোর সরলরেখা বরাবর চলনের এক্সপেরিমেন্ট স্কুলে পড়ার সময় সকলকেই করতে হয়েছে।মানুষের জীবন আলোর বার্তাবহ। তাৎপর্যপূর্ণ এই কথাটাও সকলেই জানি। কিন্তু আলো কি সহজে আসে? নাকি পিচবোর্ডের সেই এক্সপেরিমেন্টের মতো পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে হয় জীবনে আলো প্রবেশ করাতে?

পরীক্ষানিরীক্ষা ছাড়া জীবনের কোনো মানেই হয় না। কিন্তু জীবনকে নিয়ে পরীক্ষা চালানোর সাহস ক’ জনের আছে? তা ছাড়া ব্যাপারটা শুধু সাহসের নয়, জীবনকে আলোকিত করা মুখের কথা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা গুণের সমাহার। যেমন, সহ্যশক্তি, সততার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মনোবলের মতো আনুষঙ্গিক বিষয়।

রূপা চৌধুরী (Rupa Chowdhury) সম্পর্কে বলতে গিয়ে এই কথাগুলি বলতেই হল। রূপা লড়াইয়ের প্রতীক বলা যায়। রূপার জীবনসংগ্রামের কাহিনি শুধুমাত্র মহিলাদেরই নয়, প্রেরণা দিতে পারে যে কোনো লড়াকু মানুষকে।

বয়স ত্রিশ পেরিয়েছে রূপার।আর জীবনসংগ্রাম চালাতে গিয়ে এই বয়সেই দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। সুইগি (Swiggy), ওলা (Ola), উবেরের (Uber) প্রথম মহিলা ড্রাইভার তিনি। ২০১৮ সাল থেকে এ কাজ করছেন। বর্তমানে ওলা, উবেরের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহণের কাজও করেন। সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত নানান সামগ্রী সরবরাহের কাজের পর যাত্রী পরিবহণের কাজ করেন। বলা বাহুল্য, এ জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয় প্রতি দিন।

রূপার জীবনটা রুক্ষ হয়ে যায় বিয়ের পরপরই। রূপা জানালেন, ২০০৮ সালে অবস্থাপন্ন পাত্র খুঁজে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন বাবা। কিন্তু বিয়ের কিছু দিন পর থেকে বারাসতে শ্বশুরবাড়িতে লাগাতার অত্যাচারের শিকার হন। তত দিনে রূপা এক পুত্রসন্তানের মা বনে গিয়েছেন। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছিল। রূপা বললেন, “শেষে ছেলেকে কেড়ে নিয়ে ওরা আমায় তাড়িয়ে দিল।”

এ দিকে ২০০৬ সালে রূপার বিয়ের দু’ বছর আগে ওর মায়ের মৃত্যু হয়েছে। দুই দিদির মধ্যে একজন ২০১৮ সালে মারা গিয়েছেন। আর বাবার মৃত্যু হয়েছে ২০১৯ সালে।সাকুল্যে সাড়ে তিন বছর শ্বশুরবাড়িতে ছিলেন রূপা। এর পর টের পান, তাঁকে নিজের লড়াই নিজেকেই লড়তে হবে।

রূপা জানালেন, প্রথম দিকে টুকিটাকি কাজ করতেন। যেমন মশলা বিক্রি। কিন্তু তাতে আয় এত সামান্য যে একা মানুষেরই দিন চলত না। কিন্তু তখনও বাবা আর দিদি বেঁচে। তাই ভরসা একটা ছিল। বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী।

লড়াকু রূপা।

রূপা জানালেন, এর পর কাজের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরতে ঘুরতে ২০১৮ সালে তিনি ওলা, সুইগির সঙ্গে যুক্ত হন। রীতিমতো ইন্টারভিউ দিতে হয়েছিল। সম্বল বলতে ছিল মনের জোর আর একটি স্কুটি।

২০০৮ সালে বাবার দেখা পাত্রকে বিয়ের সময় কলেজে পড়ছিলেন রূপা। এর পরই জড়িয়ে পড়লেন নানা ঘাত-প্রতিঘাতের সঙ্গে। এক দিদি জীবিত। রূপা জানালেন, তিনি বোনের কোনো খবর রাখেন না।

বর্তমানে রূপা একটি বাড়িভাড়া নিয়ে বাঘাযতীন এলাকায় বসবাস করেন। একা থাকতে তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছে না? রূপার কথায়, পাড়ার লোকজন আমায় ভালোবাসেন, সম্মান করেন।

রূপা বললেন, “আমার দু’জন বন্ধুর কথা অবশ্যই লিখবেন।” অপর্ণা দাস আর শ্রেয়শ্রী ব্যানার্জি নামে দুই তরুণীর নাম জানালেন রূপা। এ-ও জানালেন, দু’ জনেই তাঁর বিপদের সাথী।

শিশুসন্তান সায়ন্তনের সঙ্গে মায়ের যোগাযোগ ঘটে মাঝেমাঝে। রূপা বললেন, সে কাজটা ফোনেই সারতে হয়। কারণ শ্বশুরবাড়িতে ঢোকার উপায় নেই। শ্বশুরবাড়িতে এত অত্যাচারিত হয়েও স্থানীয় পুলিশের অসহযোগিতায় তিনি ন্যায্য বিচার পাননি বলে অভিযোগ রূপার।

ইতিমধ্যেই রূপা পরিচিত মুখ। বিভিন্ন টিভিশোতে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছেন। আমন্ত্রিত হয়েছিলেন দিদি নম্বর ওয়ানেও। রূপার দিদিগিরি অনেক মানুষকে জীবনে চলার পথে অবশ্যই প্রেরণা দেবে।

রূপা ভালোবাসেন পাখি। রূপার বাড়িতে পা রাখলে অনেক পাখির গুঞ্জন শোনা যায়। ইচ্ছেডানায় ভর করে রূপাও তাঁর পোষ্যদের সঙ্গে পাড়ি দেন অনাগত ভবিষ্যতের দিকে।

খবরঅনলাইনে আরও পড়ুন

ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে এগিয়ে চলেছেন পার্ক সার্কাসের তিন মুসলিম তরুণী

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন