আমেরিকার দাদাগিরির শিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র আদালতে নিয়ে গেল ভারতকে

0

খবর অনলাইন ডেস্ক : বড় বড় খবরের ভিড়ে অনেক সময়েই এমন কিছু খবর হারিয়ে যায়, যা হয়তো প্রভাবে ছোট খবরের তকমা পাবে, কিন্তু গুরুত্ব তার কিছু কম নয়। এমনই একটি খবরের সৃষ্টি করেছে প্রশান্ত মহাসাগরের একটি ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র।
পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের লড়াইয়ে তিন পরমাণু শক্তিধর দেশকে আদালতে নিয়ে গেল ছোট্ট দেশ মার্শাল আইল্যান্ডস। তারা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) মামলা করেছে ভারত, পাকিস্তান আর ব্রিটেনের বিরুদ্ধে। তাদের অভিযোগ, পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধে আলাপ-আলোচনার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে এই দেশগুলি তা আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করছে না। আইসিজে ওই তিন দেশের বিরুদ্ধেই মামলা গ্রহণ করেছে। সোমবার ভারতের বিরুদ্ধে শুনানি শুরু হয়েছে। বাকি দু’টি দেশের বিরুদ্ধে শুনানি এর পরেই হবে।
মার্শাল আইল্যান্ডস দেশটা কেমন ? কিছু প্রবালদ্বীপ ও আগ্নেয়গিরিসমন্বিত কিছু দ্বীপের দু’টি সমান্তরাল শৃঙ্খল নিয়ে গঠিত মার্শাল আইল্যান্ডস-এর অবস্থান মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে, হাওয়াই ও ফিলিপাইন্‌স-এর মাঝখানে। আয়তন মাত্র ১৮১ বর্গ কিলোমিটার, লোক

সংখ্যা ৭০ হাজারও নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শাসিত ‘ইউএন ট্রাস্ট টেরিটোরি অব দ্য প্যাসিফিক আইল্যান্ডস’-এর অংশ ছিল মার্শাল আইল্যান্ডস। ১৯৯১ সালে স্বাধীন হয়। দেশের অর্থনীতি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল। কারণ এই দ্বীপপুঞ্জে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাঘাঁটি রয়েছে। এখন অবশ্য নারকেল তেল, মাছ, প্রবাল, ঝিনুক, শঙ্খ ইত্যাদি পণ্যের ব্যবসা করে দেশের অর্থনীতি স্বনির্ভর করার চেষ্টা হচ্ছে।
আমেরিকার দাদাগিরির বড় প্রমাণ এই দ্বীপপুঞ্জ। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৮-এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বীপপুঞ্জে ৬৭টি পরমাণু পরীক্ষা চালায়। কিছু কিছু দ্বীপ একেবারে উবে যায়। আর কিছু দ্বীপ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ১৯৫৪ সালের ১ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখানে হাইড্রোজেন বোমা ফাটায়, যে বোমা ছিল হিরোশিমাতে ফেলা বোমার চেয়ে হাজার গুণ শক্তিশালী। এতে যে তেজস্ক্রিয় বিচ্ছুরণ হয়, তাতে মারা যান বহু মানুষ। ক্যান্সারে আক্রান্ত হন অসংখ্য অধিবাসী। আর পরবর্তী প্রজন্ম এমন সব শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মায় যা আগে কখনও দেখা যায়নি। আইসিজে-তে দেশের প্রতিনিধি টোনি ডেব্রুম সে দিনের ঘটনা স্মরণ করে বলেন, “তখন আমার ব

য়স ছিল ৯ বছর। ২০০ কিমি দূর থেকে সেই বিস্ফোরণ দেখেছিলাম। গোটা আকাশটা রক্ত-লাল রঙে রাঙা হয়ে গেছিল।”
এই মার্শাল দ্বীপপুঞ্জেরই একটি অতি বিখ্যাত প্রবালদ্বীপপুঞ্জ বিকিনি অ্যাটল। ১৯৪৬-এর জুলাইয়ে এই বিকিনি অ্যাটলে ২৩টা পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। প্রথম পরমাণু বিস্ফোরণের পাঁচ দিন পর লুই রেয়ার একটি সুইমস্যুটের নকশা করেন, যার নাম দেন বিকিনি। ফ্যাশন লেখিকা ডায়ানা ভ্রিল্যান্ড বলেন, “বিকিনি হল ফ্যাশন জগতে অ্যাটম বম্ব”।
কিন্তু যে দেশ বারবার তার দেশের মাটিতে পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে গেছে, সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মার্শাল আইল্যান্ডস মামলা করছে না কেন ?
২০১৪-তেই মার্শাল আইল্যান্ডস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ ন’টি পরমাণু শক্তিধর দেশের বিরুদ্ধে মামলা করার চেষ্টা করেছিল। বাকি আটটি দেশ হল চিন, ফ্রান্স, ইজরায়েল, উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও ব্রিটেন। এদের মধ্যে পাঁচটি দেশ চিন, ফ্রান্স, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন পরমাণুঅস্ত্র প্রসার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষরকারী দেশ। বাকি চারটি দেশ এনপিটি-তে সই করেনি। এদের মধ্যে আবার ইজরায়েল ও উত্তর কোরিয়া স্বীকারই করে না তাদের পরমাণু অস্ত্র আছে, অথচ প্রকাশ্যেই পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা চালায়। কিন্তু শুধুমাত্র ভারত, পাকিস্তান ও ব্রিটেনের বিরুদ্ধেই মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। কারণ আইসিজে-তে কোনও মামলা এলে তাতে সাড়া দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ এই তিনটি দেশ। বাকি ছ’টি দেশের ক্ষেত্রে আইসিজের কর্তৃত্ব স্বীকৃত নয়।

মার্শাল আইল্যান্ডস
মার্শাল আইল্যান্ডস

আইসিজে-তে মার্শাল আইল্যান্ডস-এর কৌঁসুলি ফন ভান দেন বিসেন বলেন, “এটা লজ্জার ব্যাপার যে ওই ছ’টি পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ সাড়া দেওয়ার কোনও প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করেনি। পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সীমা যখন অতিক্রান্ত হয়ে যাবে তখন আর পরমাণু অস্ত্র নিরোধ আইনটাই একটা উপহাসে পরিণত হবে এবং ন্যায়বিচার অতীতের একটা নামমাত্র স্মৃতিচিহ্ন হয়ে থাকবে।”
এর আগেও ১৯৯৬ সালে একটি মামলায় আইসিজে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পরমাণু অস্ত্রসম্ভার কমানোর জন্য পরমাণুশক্তিধর দেশগুলির কাছে আবেদন জানিয়েছিল। কিন্তু আইসিজে-র আবেদন শোনার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। দু’ দশক পেরিয়ে গেছে। পরমাণু অস্ত্রের আতঙ্ক হ্রাসের ক্ষেত্রে কোনও অগ্রগতিই হয়নি। এ বারেও মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের এই মামলা বৃথাই যাবে। কেউই আশা করে না, এই মামলার মাধ্যমে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ তিন পরমাণুশক্তিধর দেশকে পরমাণু অস্ত্র ত্যাগে বাধ্য করবে। কিন্তু পরমাণু অস্ত্রের বিরুদ্ধে এই দ্বীপপুঞ্জের নাছোড় অভিযান কূটনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বহীন দেশগুলিকে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে তাদের বক্তব্য জানানোর ব্যাপারে উৎসাহ জোগাবে।
এই ভাবেই হয়তো একটা দিন আসবে, যখন পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ করার সারবত্তা সবাই বুঝবেন। আপাতত সেই শুভ দিনের প্রতীক্ষা।

আদালতের নথী পড়তে ক্লিক করুন 

https://www.icj-cij.org/docket/files/95/7495.pdf

মার্শাল আইল্যান্ডসে পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা এবং তার প্রভাব নিয়ে তৈরি একটি তথ্যচিত্র দেখুন

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন