জলপাইগুড়ি: অবশেষে জিতল মায়ের মমতা। আইনের বেড়াজাল পার করে মায়ের কোল ফিরে পেল একরত্তি দেবাদৃতা। প্রায় ১১ মাস পর নিজের শিশুকন্যাকে ফিরে পেলেন মুনমুন দেবী।

জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ি ব্লকের বাকালি এলাকার বাসিন্দা মুনমুন দাস। তাঁর স্বামী  মিঠুন দাস পেশায় মাছ ব্যবসায়ী। বাড়িতে রয়েছে দুই মেয়ে। গত বছরের ২ ফেব্রুয়ারি সদ্যোজাত তৃতীয় শিশুকন্যাকে নিয়ে ময়নাগুড়ি হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে উমা রায় নামে এক মহিলার সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁদের। সরকারি সুযোগসুবিধা পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে, এক সুযোগে নবজাতককে নিয়ে চম্পট দেয় ওই মহিলা।

৯ ফেব্রুয়ারি ময়নাগুড়ি থানার পুলিশ উমা রায়কে গ্রেফতার করে। উদ্ধার হয় শিশুকন্যা। কিন্তু উদ্ধার হওয়া ওই শিশুকে প্রথমে নিজের বলে চিনতে পারেননি মানসিক ভাবে ভেঙে পড়া মুনমুন দেবী। ফলে নিয়ম অনু্যায়ী শিশু সুরক্ষা সমিতির মাধ্যমে ওই শিশুটি হোমে চলে যায়। পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে মেয়েকে ফিরে পেতে সমিতির দ্বারস্থ হন মুনমুন দেবী।

এর পরেই শুরু হয় টানাপোড়েন। মা আর সন্তানের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায় আইন। যে হেতু এক বার প্রশাসনের মাধ্যমে শিশুটি হোমে চলে গিয়েছে, সে হেতু মায়ের দাবি প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত সন্তানকে ফিরে পাবেন না তিনি। তত দিনে হোমের সঞ্চালিকা চন্দনা চক্রবর্তী ‘মা থেকেও না-থাকা’ শিশুকন্যার নাম দিয়েছেন দেবাদৃতা।

অনেক অনুরোধ-উপরোধে ৯ মাস পর দেবাদৃতাকে দূর থেকে দেখার অনুমতি পান মা। শিশু সুরক্ষা সমিতির চেয়ারপার্সন বেবি উপাধ্যায় জানান, তাঁরা নিরুপায়। যতক্ষণ না আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হচ্ছে, ততক্ষণ তাঁরা মায়ের হাতে শিশুকে তুলে দিতে পারছেন না।

আইনের এত কচকচি বুঝতে না পারলেও প্রত্যন্ত গ্রামের সন্তানহারা মা এটুকু বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁকে আরও অনেকটা অপেক্ষা করতে হবে নিজের সন্তানকে কোলে তুলে নেওয়ার জন্য। আর সেই মায়ের চোখের জল মন ভিজিয়েছিল শিশু সুরক্ষা সমিতির সদস্যদেরও। তাঁরাও সচেষ্ট হয়েছিলেন যাতে মা তাঁর সন্তানকে তাড়াতাড়ি ফিরে পান। তাই যতটা সম্ভব পুলিশ প্রশাসন, লিগাল সেলের সঙ্গে কথা বলে অবশেষে ‘ছাড়পত্র’ জোগাড় করেন তাঁরা।

শনিবার সন্ধ্যায় মুনমুন দেবীর হাতে তুলে দেওয়া হয় তাঁর শিশুকন্যাকে। ফিরে পাওয়া একরত্তি মেয়েকে কোলে নিয়ে কেঁদেই ফেলেন মুনমুন দেবী। তবে চোখে জল থাকলেও ‘নাড়িছেঁড়া ধন’ পেয়ে খুশিও লুকোতে পারেননি তিনি। শিশু সুরক্ষা সমিতির চেয়ারপার্সন বেবি উপাধ্যায়কে নিচু হয়ে প্রণামই করে ফেললেন মা মুনমুন দেবী। মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পেরে হাসছিলেন শিশু সুরক্ষা সমিতির সদস্যরাও।

এ সবের মধ্যেই দেবাদৃতা কিন্তু নিশ্চিন্তেই ছিল মায়ের কোলে। জন্মের মাত্র দু’দিন পরই মায়ের কোল থেকে হারিয়ে গিয়েছিল সে। ১১ মাস কেটেছে হোমের দিদি-মাসিদের কাছে। কিন্তু মুনমুন দেবীর কোলে ফিরে যাওয়ার পর একরত্তি দেবাদৃতা যেন বুঝতে পেরেছিল সে এ বার ‘নিশ্চিত আশ্রয়’ ফিরে পেয়েছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here