নয়াদিল্লি: তিন বছরের শাসনে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এত বিপাকে বোধহয় কখনও পড়েনি। বিজেপিশাসিত রাজ্য সরকারগুলি কৃষকদের কৃষিঋণ মকুব-সহ নানা ব্যবস্থা গ্রহণের যতই আশ্বাস দিক না কেন, শুধু প্রতিশ্রুতিতে চিঁড়ে ভিজছে না। দেশের কৃষকসমাজ মোদী সরকারের কর্পোরেটপন্থী নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে।

শুক্রবার দিল্লিতে সমবেত হয়েছিলেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ১৩০টি কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তাঁরা এক অভূতপূর্ব ঐক্য দেখিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে হাতে হাত মিলিয়ে লড়াইয়ে নামার অঙ্গীকার করেছেন। সারা দিন ধরে আলোচনার পর কৃষক নেতারা এ ব্যাপারে সহমত হয়েছেন যে দেশের যা পরিস্থিতি তাতে কৃষকদের এখন ‘করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে’র মতো অবস্থা। ‘জয় জওয়ান, জয় কিসান’ স্লোগান তুলে কৃষক নেতারা ‘অল ইন্ডিয়া কিসান সংঘর্ষ সমিতি’র (এআইকেএসএস) ব্যানারে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে আন্দোলনে নামার শপথ নিয়েছেন।

“কাদের জন্য এই দেশ চলছে? কর্পোরেটদের জন্য নাকি লক্ষ লক্ষ কৃষক, শ্রমিক এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য? একটা গ্রাম থেকে কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয়েছে এবং সারা দেশে এখন তা ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা একে একটা যুক্তিসঙ্গত নিষ্পত্তিতে নিয়ে যাব” — দিল্লিতে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন স্বরাজ অভিযান প্রধান যোগেন্দ্র যাদব।

এই দিনটিকে দেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে ‘ঐতিহাসিক দিন’ আখ্যা দিয়ে যোগেন্দ্র ঘোষণা করেন, মধ্যপ্রদেশের যে জায়গায় ৬ জন কৃষক প্রাণ দিয়েছেন, সেই মন্দসৌর থেকে আগামী ৬ জুলাই কৃষকদের দেশব্যাপী পদযাত্রা শুরু হবে।

“মন্দসৌরে গুলিচালনার এক মাস পূর্ণ হওয়ার দিন আমরা দেশব্যাপী পদযাত্রা শুরু করব। আমরা দেশের প্রতিটি রাজ্যে যাবেন। কৃষকদের শিক্ষিত করব, ঐক্যবদ্ধ করব, সংগঠিত করব। গান্ধীজি যেখান থেকে সত্যাগ্রহ শুরু করেছিলেন, সেই বিহারের চম্পারনে তাঁর জন্মদিনের দিনই পদযাত্রা শেষ হবে” — জানান যোগেন্দ্র।

দিল্লিতে এ দিনের সভায় মধ্যপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, হরিয়ানা এবং পাঞ্জাব থেকে কৃষক নেতারা যোগ দেন। সেই সভাতেই কৃষক-পদযাত্রা উপলক্ষে সারা ভারত সমন্বয় কমিটি গড়ার কথা ঘোষণা করেন যোগেন্দ্র। কৃষিঋণ পুরোপুরি মকুব করা এবং সব ধরনের শস্যের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সহায়ক মূল্য দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আক্রমণ করে যোগেন্দ্র বলেন, “এই মুহূর্তে দেশের কৃষকরা নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন। কিন্তু আমরা এখন এই দু’টি বিষয়ের ওপরেই জোর দিতে চাই কারণ এই দু’টি বিষয়ই সব চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্বামীনাথন কমিটি রিপোর্টে যে সব সুপারিশ করা হয়েছে, সে সব সুপারিশ রূপায়ণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও মোদিজি এখন কৃষিঋণ মকুব আর সর্বোচ্চ সহায়ক মূল্যের ইস্যুতে পুরো উলটো পথে হাঁটছেন।”

মানেকা গান্ধীর আত্মীয় কৃষক নেতা ভি এম সিংকে সর্বসম্মত ভাবে ‘অল ইন্ডিয়া কিসান সংঘর্ষ সমিতি’র আহ্বায়ক করা হয়েছে। ওই সভায় ভি এম সিং বলেন, “মোদি সরকার এখন ‘আমাদের কৃষক’ আর ‘ওদের কৃষক’ বলে বিভেদ সৃষ্টি করছেন। গত তিন বছরে প্রকৃত পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। তামিলনাড়ু বা কর্নাটকের এক জন কৃষকের সঙ্গে উত্তর প্রদেশে বসবাসকারী কৃষকের দুর্দশার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তাঁদের দুর্দশা, তাঁদের ভোগান্তি, সব এক। তাঁদের প্রতি যে আচরণ করা হচ্ছে তা-ও এক।

তামিলনাড়ু কৃষক আন্দোলনের ‘মুখ’ আয়াক্কান্নু উপস্থিত ছিলেন এ দিনের সভায়। এআইকেএসএস-এর প্রতি তাঁর সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, “কৃষিঋণ মকুবের দাবি জানিয়ে যন্তরমন্তরে আমরা খুলি হাতে প্রতিবাদ জানিয়েছি। আমরা কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।” রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে কথা বলার জন্য মন্ত্রী মাত্র দু’ দিন সময় চেয়েছিলেন। কিন্তু তার পর থেকে তো প্রায় তিন মাস কেটে গেল, আক্ষেপ করেন আয়াক্কান্নু।

ছবি সৌজন্যে ন্যাশনাল হেরাল্ড

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন