ভাণ্ডারায় হিন্দুদের ভোগ পরিবেশন করলেন মুসলিমরা, সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ সেই পুরোনো দিল্লিতেই

0

দিল্লি: একটি মামুলি ঝামেলাকে কেন্দ্র করে গত সপ্তাহে হঠাৎ করে সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টি হয়েছিল পুরোনো দিল্লির একটা অঞ্চলে। সেই এলাকা এ বার দেখল সম্পূর্ণ অন্য একটা ছবি। অশান্তির আঁচ এখনও পুরোপুরি মিটে যায়নি, তাই অঞ্চলের মহিলা এবং শিশুরা এখনও বাড়ির বাইরে বেরোচ্ছেন না। কিন্তু পুরুষদের তো বাড়ির ভেতরে আটকে রাখা যায় না। হিন্দু এবং মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের পুরুষই বেরিয়ে এলেন নিজেদের বাড়ি থেকে। স্থানীয় একটি মন্দিরে দুর্গামূর্তির পুনঃপ্রতিষ্ঠার যাত্রায় শামিল হলেন হিন্দু পুরুষরা। আর সেই যাত্রায় ফুল ছড়িয়ে দিলেন মুসলিমরা।

উল্লেখ্য, গত সপ্তাহের সেই অশান্তির পরে দুই গোষ্ঠীর মানুষকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল একটি শান্তি কমিটি। মন্দির যাত্রার যাবতীয় আয়োজন এবং তার খরচা বহন করেছে ওই শান্তি কমিটিই।

এখানেই শেষ নয়। মন্দিরে একটি ভাণ্ডারার আয়োজন করা হয়েছিল। সেই ভাণ্ডারায় হিন্দু দর্শনার্থীদের জন্য খাবার পরিবেশন করলেন মুসলিমরা। মন্দিরে মূর্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চিন্তা ছিল। নতুন করে অশান্তি হোক, কেউ চাইছিলেন না। কিন্তু মঙ্গলবার যেটা ঘটল, সেটা দেখে সবাই এক দিকে যেমন অবাক, অন্য দিকে তেমনই খুব আনন্দিত। আর এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে দিল্লি পুলিশও। অশান্তি শুরু হওয়ার দিন থেকেই খুব দক্ষ হাতে সেটি সামলেছে পুলিশ। এ দিনও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো খামতি রাখেনি তারা।

কোনো রাজনৈতিক দলের কোনো নেতা এই অঞ্চলে গত কয়েক দিন আসেননি। সেটা শাপে বর হয়েছে বলেই মনে করেন এলাকার বাসিন্দারা। তাদের অনুপস্থিতিতে নিজেদের মধ্যে আস্থা বাড়ানোর কাজটা বাসিন্দারা নিজের হাতেই নিয়ে নিয়েছেন। অনেকের মতে, রাজনৈতিক নেতারা থাকলে পরিস্থিতি আরও বেশি জটিল হত, তাঁরা না থাকার ফলে পরিস্থিতি অনেক তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক করা গিয়েছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সপ্তাহ খানেক আগে হঠাৎ করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল পুরোনো দিল্লির একটা অঞ্চল। একটি গাড়ি পার্কিং নিয়ে সামান্য গণ্ডগোল। সেই অশান্তি ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে রূপ নিল গোষ্ঠীসংঘর্ষে। স্থানীয় একটি দুর্গামন্দিরে পাথর ছোড়া হল। ভাঙচুর করা হল মূর্তি। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার সব রকম উপাদান মজুত ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা রকম ছবি পোস্ট করে আতঙ্ক তৈরি করা হচ্ছিল। যাঁরা ওই এলাকায় কোনো দিন আসেননি, তাঁরাই মূলত এই ভাবে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে অশান্তিতে ইন্ধন জোগাতে চাইছিলেন। কিন্তু সেটা হয়নি, কারণ দ্রুত অঞ্চলের দুই গোষ্ঠীর মানুষজন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মাঠে নেমে পড়েন। তৈরি হয় শান্তি কমিটি।

আরও পড়ুন হালিশহরের ৮ কাউন্সিলার তৃণমূলে ফিরতেই দড়ি টানাটানি বিজেপিতে

পুলিশের ভূমিকাও ছিল যথেষ্ট প্রশংসনীয়। মূর্তি তছনছে জড়িত সবাইকে দ্রুত গ্রেফতার করা হয়। আর অন্য দিকে ভেঙে যাওয়া মন্দিরের মেরামতির জন্য যাবতীয় খরচা বহন করার জন্য এগিয়ে আসেন মুসলিমরা।

স্থানীয় বাসিন্দা তথা শান্তি কমিটির সদস্য আবু সুফিয়ান বলেন, “যখন অশান্তি শুরু হল, তখন মনে হচ্ছিল রাজনৈতিক নেতাদের আসা দরকার, কারণ আমরা কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না কী করব। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, তাঁরা না এসে ভালোই করেছেন। কারণ এখানে রাজনৈতিক নেতাদের আসা মানে জটিল পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তোলা। কারও কোনো সাহায্য ছাড়াই, শুধুমাত্র নিজেদের ইচ্ছেতেই কী ভাবে পরিস্থিতিকে শান্তি এবং দুই গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে আবার সম্প্রীতির বাতাবরণ তৈরি করা যায়, সেই পথই দেখালেন এই অঞ্চলের মানুষ।

এই প্রসঙ্গেই জোর গলায় সুফিয়ান বললেন, “আমরা করে দেখালাম, আমরা আজ গোটা ভারতকে পথ দেখালাম।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here