lalkrishna advani
লালকৃষ্ণ আডবাণী। ছবি সৌজন্যে দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস।
debarun roy
দেবারুণ রায়

আজ দীপাবলি। সারা দেশে তো বটেই, বিশেষ করে হিন্দি বলয়ে আলোর উৎসব। পূর্ব ভারতে, বিশেষ ভাবে বাংলায় যেমন জাতীয় উৎসব দুর্গাপুজো, তেমনি উত্তর ভারতে দিওয়ালিই জাতীয় উৎসবের মাত্রা পেয়েছে। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রত‍্যেকে এই দিওয়ালিতেই প্রতি বছর স্বজন-বন্ধু-প্রিয়জনকে সাধ‍্যমতো উপহার দিয়ে পারস্পরিক আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করেন। একে অপরকে অভিনন্দন জানান চিঠিতে, কার্ডে বা বার্তার মাধ্যমে। শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবাই সব অভাব, অভিযোগ, সংকীর্ণতা, শোক ও শত্রুতা ভুলে মেতে ওঠেন উৎসবে। কোনো জাতপাত ধর্মবর্ণ অন্তরায় হয় না এই উৎসবের দিনরাতে।

এমন দিনে কোনো রোশনি নেই নবতিপর বিজেপি সাংসদ ও দলের সব চেয়ে বরিষ্ঠ নেতা লালকৃষ্ণ আডবাণীর বাড়িতে। বিজেপির প্রতিষ্ঠাতা সদস‍্য, দলের সভাপতি হিসেবে তিনিই অযোধ্যার রামমন্দিরের আন্দোলনকে সর্ব ভারতীয় অ্যজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত করেন। এবং মাত্র দু’ জন সাংসদের বিজেপিকে কেন্দ্রে সরকার গড়ার যোগ্য করে তোলেন। পাশাপাশি সারা দেশে কংগ্রেসের বিকল্প দল হিসেবে বিজেপি আত্মপ্রকাশ করে আডবাণীরই মস্তিষ্কপ্রসূত লাইনে। দলের সর্বগ্রাহ‍্য মুখ ছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। কিন্তু দলের প্রতিটি স্লোগান থেকে সিদ্ধান্ত, সংগঠন বিস্তার থেকে জনপ্রিয়তা অর্জন, সব কিছুরই কৃতিত্ব লালকৃষ্ণ আডবাণীর। অটলবিহারীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এগিয়ে দিয়েছেন তিনিই, দলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে থাকা সত্ত্বেও। কারণ, আডবাণী চিরকালই বুঝতেন যে, দলের ভিতরে তিনি যতই পয়গম্বর হোন না কেন, দেশের পরিবর্তনপন্থী মানুষ বাজপেয়ীকেই প্রধানমন্ত্রী দেখতে চায়।

আরও পড়ুন এসে গেছে অচ্ছে দিন, আম আদমি বুঝে নিন

বাজপেয়ীর সঙ্গে আডবাণীর ৬৫ বছরের মিত্রতা। রাজনৈতিক লাইনে সারা জীবন দু’জনের মতপার্থক্য থাকলেও কখনও মনান্তর হয়নি বলে উভয়েই দাবি করতেন। ক’ মাস আগে প্রয়াত হয়েছেন আডবাণীর চেয়ে বয়সে বছর তিনেকের বড়ো বাজপেয়ী। শেষ জীবনে তাঁদের মতভেদ ছিল না বললেই চলে। তা ছাড়া সাড়ে ছ’ দশকের সম্পর্কের অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলোকেই মনে রেখেছিলেন দু’ জনে। বাজপেয়ী শেষ পর্বে শয‍্যাগত হয়ে পড়ার পর দলের সহকর্মীদের মধ্যে শুধু আডবাণীকেই চিনতে পারতেন। কথা বন্ধ হয়ে গেলেও নীরব বিনিময় হত ভাবের।

আরও কিছু কাল আগে প্রয়াত হয়েছেন আডবাণীর স্ত্রী কমলা। দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গিনীকে হারানোর বেদনা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায় বাজপেয়ীর প্রয়াণে। অতি সম্প্রতি আরেক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়াকেও হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে ভারাক্রান্ত মন আরও ভারী হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় বাজপেয়ীজির জন্য শোক জানাতেই তিনি দিওয়ালি বর্জনের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। এতে দল ও সরকারকে যে-বার্তা দেওয়া দরকার আডবাণীজি তা দিয়েছেন, এমন দাবি না করা হলেও তা বুঝে নিতে অসুবিধে নেই। কারণ আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ আডবাণীজি জীবনে কখনও এক মুহূর্তের জন্যও বেহিসেবি কোনো কাজ করেননি বা বেফাঁস কিছু বলেননি। যা করেছেন, যা বলেছেন, সবটাই নিখুঁত ভাবে বিবেচনা করে ও তার পরিণাম বা অগ্রপশ্চাৎ ভেবে। সুতরাং মোদীর মত ও পথের সঙ্গে আডবাণী মোটেই একমত নন, চলতি পরিস্থিতিতে উৎসব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে সেই গভীর বার্তাই যে তিনি দিতে চেয়েছেন তা বলাই বাহুল্য। উল্লেখ্য, বাজপেয়ীজির মতো নেতার মৃত্যুর বছরে আনন্দ-উৎসব থেকে দলেরই সরে থাকার কথা। বিশেষত যে দল হিন্দু সংস্কৃতির কথা বলে। বিশেষ করে দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে এমনই একটি সিদ্ধান্ত আশা করেছিলেন দলের কর্মীসাধারণ। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহ বারবারই তাঁদের কাজের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, প্রবীণতমরা দলের সাজসজ্জা ছাড়া আর কিছুই নন। যে বাজপেয়ী, আডবাণী, জোশিকে নিয়ে মার্গদর্শক মণ্ডল গড়া হল তা যে নিছকই বৃদ্ধাশ্রম তা সদস‍্যদের বুঝিয়ে দিতেই এমন হেনস্থা। একটা বৈঠকও ডাকা হল না। আলংকারিক সদস‍্য ছিলেন অটল। কিন্তু এই সাড়ে চার বছরে একটা মিটিংও হয়নি। হলে অটলবিহারী বাজপেয়ী হয়তো অন্তত শুনে যেতে পারতেন।

আরও পড়ুন যোগীর একদফা কর্মসূচি, ফৈজাবাদ হবে শ্রী অযোধ্যা

এ ছাড়া, দল বা সরকারের নানা কাজও মেনে নিতে পারছেন না আডবাণী। কিন্তু প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে বা ক্ষোভ উগরে দিয়ে নিজের হাতে তৈরি পার্টির ক্ষতি করতে চান না। যদিও অযোধ্যা আন্দোলনের রূপকার ও রামরথের সওয়ারি হয়েও আডবাণী আদালতের রায়ের আগে এ নিয়ে টানাহেঁচড়া চাননি। অথচ, বিরোধী নেতা হিসেবে তিনিই প্রথম আইন করে মন্দির নির্মাণের কথা বলেছিলেন। কিন্তু ছ’ বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চালিয়ে ও বেশ কয়েক বছর উপপ্রধানমন্ত্রী থেকে তাঁর দৃষ্টি দলীয় রাজনৈতিক চশমার সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে উঠেছে। ফলে, সরকার ও সংগঠনের ত্রুটি স্বভাবতই নজরে আসছে। মুখে কিছু না বললেও নীরব সিদ্ধান্ত সব কিছুতেই প্রশ্নচিহ্ন জুড়ে দিয়েছে। দলীয় মহলের মতে, অসমের সাম্প্রতিক নৃশংসতা এবং বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ‍্যের গো-তাণ্ডবে যথেষ্টই ক্ষুব্ধ ও আহত আডবাণী।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here