agriculture
চাষাবাস। ছবি সৌজন্যে দ্য ওয়্যার.ইন।

ওয়েবডেস্ক: ২০১৬ সালে এক বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি থেকে কৃষিঋণ দেওয়া হয়েছে ৫৮,৫৬১ কোটি টাকা। এবং সেই টাকা গিয়েছে ৬১৫টি অ্যাকাউন্টে। অর্থাৎ এক একটি অ্যাকাউন্টে ৯৫ কোটি টাকা করে কৃষিঋণ জমা পড়েছে। ‘দ্য ওয়্যার’-এর তরফ থেকে তথ্য জানার অধিকার (আরটিআই) সংক্রান্ত একটি আবেদন পেশ করা হয়েছিল। তার জবাবে এই তথ্য জানিয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (আরবিআই)।

অন্য ঋণের তুলনায় কৃষিঋণে সুদের হার কম। এবং ঋণ পাওয়া তুলনামূলক ভাবে সহজ। অর্থাৎ অন্য ঋণের তুলনায় কৃষিঋণ সহজ শর্তে দেওয়া হয়। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিরা যাতে সহজে এই ঋণ পান তার জন্যই কৃষিঋণের শর্তাবলি সহজ করা হয়েছে। এই মুহূর্তে কৃষিঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার ৪%।

রায়তু স্বরাজ্য বেদিকা নামে এক কৃষক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা কিরণ কুমার বীসা বলেন, “কৃষি-ব্যবসায় জড়িত এমন বহু বড়ো কোম্পানি কৃষিঋণের শ্রেণিভুক্ত হয়ে ঋণ নিচ্ছে।”

দেশের অর্থনীতির কিছু কিছু ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দিতে এবং সেই সব ক্ষেত্রের উন্নয়ন সুনিশ্চিত করতে আরবিআই ব্যাঙ্কগুলির উদ্দেশে একটি নির্দেশ জারি করে বলেছে, তাদের মোট ঋণের একটা সুনির্দিষ্ট অংশ কৃষি, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, শিক্ষা, আবাসন, সামাজিক পরিকাঠামো, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে হবে। একে বলে প্রায়োরিটি সেক্টর লেন্ডিং (পিএসএল)।

আরও পড়ুন পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সোমবার ভারত বন্‌ধের ডাক কংগ্রেসের

এই পিএসএল নীতি অনুসারে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের কথা মাথায় রেখে ব্যাঙ্কগুলির তাদের মোট দেয় ঋণের ১৮ শতাংশ কৃষি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করার কথা। কিরণ কুমার বীস ‘দ্য ওয়্যার’-কে বলেন, “সমস্যা হল ব্যাঙ্কগুলি ওই ঋণের একটা বড়ো অংশ কর্পোরেট আর বড়ো কোম্পানিগুলিকে দিচ্ছে। মাঝখান থেকে চাষিরা আর ওই ঋণের সুযোগ পাচ্ছে না।”

কৃষি বিশেষজ্ঞ দেবেন্দ্র শর্মা বলেন, চাষিদের নামে ঋণ ঘোষণা করার পর বড়ো কর্পোরেশনগুলো সস্তায় ঋণ নিয়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, “চাষিদের সমস্যা সমাধানের নামে ভান করা হচ্ছে।” তাঁর প্রশ্ন, “ঋণের নামে যাঁদের ১০০ কোটি টাকা করে দেওয়া হচ্ছে তারা কী ধরনের চাষি? এ সব লোকদেখানো ব্যাপার। কৃষকদের নামে কেন শিল্পকে ঋণ দেওয়া হচ্ছে?”

দেবেন্দ্র শর্মা বলেন, এই গোটা প্রক্রিয়া থেকে ব্যাঙ্কেরও লাভ আছে। তাই কৃষিঋণের আওতায় এই বড়ো বড়ো ঋণ দেওয়া হচ্ছে। “একটা কোম্পানিকেই ১০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হচ্ছে। ওই একই পরিমাণ ঋণ যদি চাষিদের দিতে হত, তা হলে  অন্তত ২০০ চাষি খুঁজে বার করতে হত। ১৮%-এর লক্ষ্যমাত্রা যাতে তাড়াতাড়ি পূরণ করা যায়, তার জন্য ব্যাঙ্ক বড়ো বড়ো কোম্পানিকে ঋণ দিচ্ছে।”

এনডিএ সরকার ২০১৪-১৫ সালে ৮.৫ লক্ষ কোটি টাকা কৃষিঋণ দিয়েছে। ২০১৮-১৯ সালে সেই টাকা বৃদ্ধি হয়েছে ১১ লক্ষ কোটিতে। আরবিআই সূত্রে ‘দ্য ওয়্যার’ জানতে পেরেছে এই টাকার একটা বড়ো অংশই বিশাল পরিমাণ ঋণ হিসাবে দেওয়া হয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে সব কোম্পানি কৃষি-ব্যবসায় জড়িত এবং শিল্প ক্ষেত্রে রয়েছে তাদের কাছেই ওই ঋণ যাচ্ছে।

আরবিআই-এর তথ্যে প্রকাশ, শুধু ২০১৬ সালেই নয়, তার আগের বছরগুলিতেও একই কাণ্ড হয়েছে। ২০১৫ সালে ৫২,১৪৩ কোটি টাকা কৃষিঋণ ঢুকেছে ৬০৪টি অ্যাকাউন্টে অর্থাৎ প্রতি অ্যাকাউন্টে ৮৬.৩৩ কোটি টাকা করে। তার আগের বছরে প্রতি অ্যাকাউন্টে ৯১.২৮ কোটি টাকা করে ৬০,১৫৬ কোটি টাকার কৃষিঋণ দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন বিজেপির সঙ্গে জোট নয়, সাফ জানিয়ে দিলেন তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী

ইউপিএ সরকারের আমলেও একই ঘটনা ঘটেছে। ২০১৩ সালে ৬৬৫টি অ্যাকাউন্ট পেয়েছে ৫৬ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ গড়ে প্রতি অ্যাকাউন্টে ৮৪.৩০ কোটি টাকা করে। তার আগের বছর ২০১২ সালে ৫৫,৫০৪ কোটি টাকার কৃষিঋণ ঢুকেছে ৬৯৮টি অ্যাকাউন্টে অর্থাৎ গড়ে প্রতি অ্যাকাউন্টে ৭৯.৫১ কোটি টাকা।

মধ্যপ্রদেশের আম কিষান ইউনিয়নের সদস্য কেদার সিরোহি বলেন, সরকার কৃষকদের প্রথমে ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে ফেলেন। তার পর কৃষকরা যখন আর্থিক ভাবে আরও ভালো ফল করার জন্য ব্যাঙ্কের দ্বারস্থ হন, তখন তাঁদের নানা ভাবে হয়রান করা হয়। এক জন সাধারণ চাষি কল্পনাও করতে পারবেন না যে সরকার তাঁদের নামে প্রকল্প চালু করার পর শত শত কোটি টাকার ঋণ বড়ো বড়ো কর্পোরেট কোম্পানিকে দিচ্ছে।

দেবেন্দ্র শর্মা বলেন, কৃষকদের ঋণ দেওয়া এবং কৃষি-ব্যবসায় জড়িত কোম্পানিগুলে ঋণ দেওয়া, দু’টি ক্ষেত্র আলাদা করতে হবে। ‘কৃষি’র সংজ্ঞায় কোম্পানিগুলোকে ঋণ দিয়ে চাষিদের ঠকানো উচিত নয়। দেবেন্দ্রবাবু জানান, তিনি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর সামনে এই প্রস্তাব তুলেছিলেন। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সৌজন্যে: দ্য ওয়্যার

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন