bisnoi woman

ওয়েবডেস্ক: এত দিন জানা ছিল বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। এ যে এই পৃথিবীর জীবজগতের চিরন্তন সত্য, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু নিয়ম থাকলে তার একটা ব্যতিক্রমও থাকে। সেই ব্যতিক্রমকে ফের লোকসমক্ষে তুলে আনলেন ভারতের ডাকসাইটে রাঁধুনি বিকাশ খান্না। সাম্প্রতিক রাজস্থান সফরের একটি ছবি নিজের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে পোস্ট করে সবাইকে মনে করিয়ে দিলেন রাজস্থানের বিশনোই উপজাতির কথা।

যেমনটা দেখছেন ছবিতে, এক বিশনোই রমণী পরম মমতায় স্তন্যপান করাচ্ছেন এক হরিণশাবককে। হরিণ শিশুটিও তাঁকে দেখে ভয়ে পালাচ্ছে না, রমণীটির হেলদোলের প্রশ্নই নেই। নিজের মুখেই তিনি জানিয়েছেন খান্নাকে – এই প্রথম নয়, এর আগেও বহুবার তিনি হরিণদের স্তন্যপান করিয়েছেন। “মানবতার প্রধান ধর্মই তো করুণা”, বলেছেন তিনি। এবং এ কোনো নতুন ঘটনাও নয়। শুধুই নিজের শিশু নয়, পশুজগতের শিশুদেরও স্তন্যপান করিয়ে থাকেন এই উপজাতির নারীরা। এ নিয়ম তাঁদের ধর্ম এবং জীবনযাত্রার সঙ্গেই অঙ্গীভূত।

স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠবে – প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এমন নিয়মে কেন অভ্যস্ত বিশনোই প্রজাতি? উত্তরে ফিরে যেতে হবে পঞ্চদশ শতকে। সেই সময়ে ভারতে আবির্ভাব ঘটে গুরু জম্ভেশ্বরের। বিষ্ণুভক্ত এই সাধকের উপদেশের উপরেই স্থাপিত হয়েছে বিশনোই উপজাতির জীবনচর্যার ভিত্তি। অনেকে বলেন, এই উপজাতি বিষ্ণুভক্ত বলেই তাদের নাম বিশনোই। এই মত সমর্থন করেন যাঁরা, তাঁরা বিষ্ণুর সঙ্গে সম্পর্কিত করে উপজাতির নামের বানান ‘বিষ্ণোই’ স্বীকার করে নেন।

কিন্তু এই যুক্তির বিপক্ষেই সাক্ষ্য দেয় বিশনোইদের জীবনযাপন। তাঁরা বলেন, বিশ অর্থাৎ ২০ এবং নোইয়ের মানে ৯। দুইয়ে মিলে দাঁড়ায় ২৯। বস্তুত গুরু জম্ভেশ্বরের ২৯টি উপদেশই ঘিরে রেখেছে তাদের দৈনন্দিন জীবনকে। সেই ২৯টি উপদেশের মধ্যে ১০টি পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত, ৭টি স্বাস্থ্য ও সামাজিক বিধি নিয়ে, ৪টি ঈশ্বর উপাসনার বিষয়ে। বাকি ৮টিতে কিন্তু গুরু জম্ভেশ্বর রক্ষা করতে বলেছেন বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য। সেই জন্যই উদ্ভিদদের যেমন রক্ষা করে বিশনোইরা, তেমনই তাদের নারীরা পশুশাবককে স্তন্যদানে অভ‌্যস্ত।

এই প্রসঙ্গে মনে পড়তে পারে ১৭৩০ সালের কথা। এই বিশনোই রমণীর হরিণশিশুকে স্তন্যদানের ঘটনা যেমন এখন আলোড়িত করেছে দেশকে, সেই সময়ে তেমনই ভারতকে কম্পিত করেছিল খেজরালির অমৃতা দেবীর আত্মত্যাগ। জোধপুরের মহারাজা অভয় সিংয়ের নতুন প্রাসাদের জন্য প্রয়োজন হয়েছিল প্রচুর কাঠ। কাঠুরেরা যখন বিশনোই গ্রামের কাছের জঙ্গলে কাঠ কাটতে আসে, তখন অমৃতা দেবী একটি গাছকে আলিঙ্গন করে দাঁড়িয়ে পড়েন তাদের সামনে। সাফ জানান, ধর্মরক্ষার জন্য তিনি বদ্ধপরিকর, অতএব গাছকে ত্যাগ করে যাবেন না। তাঁর দেখাদেখি উপজাতির অন্যরাও এক একটি গাছকে আলিঙ্গন করে দাঁড়ায়। বিনিময়ে প্রাপ্য হয় নির্মম মৃত্যু। একে একে ঘটনায় প্রাণ দিতে হয় ৩৬৩ জনকে, কিন্তু কেউই বাস্তুতন্ত্র রক্ষার ব্রত থেকে পিছপা হয়নি।

বিশনোই উপজাতির এই সব ঘটনা নতুন করে ফিরে এল বর্তমানে। সোশ্যাল মিডিয়ায় খান্নার একটি ছবির পোস্টের মধ্যে দিয়েই। সাধে কী আর ছবিটা পোস্ট করার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ১৩,০০০ লাইক পড়েছে!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here