human library

ওয়েবডেস্ক: এ গ্রন্থাগারে নিস্তব্ধতার কোনো স্থান নেই। বরং ছবিটা পুরোপুরি উল্টো। এই গ্রন্থাগার বড়ো বেশি বাঙময়।

হবে না-ই বা কেন! বই তো আর কথা বলতে পারে না। সেই জন্যই চুপটি করে, মুখ বুজে সময় দিতে হয় তাকে। কিন্তু এই গ্রন্থাগারে মানুষ-ই এক একটি বই! ফলে, সেই মানব বইয়ের পাঠোদ্ধারে কথোপকথনই একমাত্র উপায়।

মানুষ যখন বই:

মানুষকে বইয়ে পরিণত করে, তার সঙ্গে কথোপকথনের সুযোগ নিয়েই ভারতে এখন হিউম্যান লাইব্রেরির রমরমা। এ ব্যাপারে প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিল ইনদওর। সে ২০১৬ সালের ঘটনা। তার পর গঙ্গা দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। এবং তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একে একে হায়দরাবাদ, দিল্লি, গুরুগ্রামেও স্থান করে নিয়েছে মানব গ্রন্থাগার। বাড়ছে এহেন অভিনব গ্রন্থাগারের পাঠক সংখ্যাও।

শুরুর কথা:

যদিও এই উদ্যোগের পথিকৃৎ ভারত নয়। মানব গ্রন্থাগারের প্রথম পত্তন হয়েছিল ডেনমার্কে। ২০০৯ সালে ওই দেশের রনি অ্যাবারজেল তাঁর ভাই এবং সহকর্মীদের সঙ্গে শুরু করেন স্টপ দ্য ভায়োলেন্স নামে এক আন্দোলন। সেই আন্দোলনের কথা অন্যদের কাছে সরাসরি পৌঁছে দিতে নিজেদের বই হিসেবে পরিচিতি দিতে থাকেন তাঁরা। সুযোগ দেন নিখরচায় অন্যদের তাঁদের কথা শোনার। দেখতে দেখতে তা পৌঁছে যায় জনপ্রিয়তার শিখরে। যদিও রনির মানব গ্রন্থাগারের কোনো নির্দিষ্ট স্থান ছিল না। নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে, সভা করে কাজ করতেন তাঁরা। এর পর অস্ট্রেলিয়ায় খোলে মানব গ্রন্থাগার, যা পাকাপাকি ভাবে, নির্দিষ্ট জায়গায় এখনও অনলস পরিশ্রমে কাজ করে চলেছে।

human library

কী ভাবে কাজ করে মানব গ্রন্থাগার:

জানিয়ে রাখা ভাল, ভারতের মানব গ্রন্থাগারগুলোরও এখনও পর্যন্ত কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। রনি অ্যাবারজেলের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেই তারাও ভ্রাম্যমাণ। যখন যে জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছে এই গ্রন্থাগার, তখন সেখানে হাজির হয়ে ৩০ মিনিটের জন্য ধার করা যেতে পারে একজন মানুষকে, যাঁদের কথা বলার জন্য নিজস্ব বিষয় রয়েছে। সেই বিষয় নিয়ে এই আধ ঘণ্টায় তাঁদের কথা শোনা যাবে। জিজ্ঞাসা করা যাবে প্রশ্নও। ধরাবাঁধা এই আধ ঘণ্টায় যদি কথা শেষ না হয়, যদি আরও কিছু জানার থাকে, তবে পাওয়া যাবে বাড়তি ১০ মিনিটও। যদিও এখনই সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাসের মতো শাখাগুলি নিয়ে কথোপকথনের সুযোগ দিচ্ছে না ভারতের এই মানব গ্রন্থাগারগুলো। মূলত নানা সামাজিক বিষয়, যেমন যৌন পছন্দ, সাংসারিক অত্যাচার, লিঙ্গবিদ্বেষ, মনোরোগ সংক্রান্ত সমস্যা নিয়েই কাজ করছে তারা।

কারা নিচ্ছেন বইয়ের ভূমিকা:

মানব গ্রন্থাগারগুলোয় বইয়ের ভূমিকা নিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবীরাই! অর্থাৎ এখনও পর্যন্ত এই গ্রন্থাগারে বই হিসেবে কথা বললে কোনো পারিশ্রমিক মিলছে না। যদিও এই গ্রন্থাগারগুলোর রয়েছে নিজস্ব সদস্যসংখ্যা, কিন্তু চাইলে আপনিও কাজ করতে পারেন মানব বই হিসেবে। বলতে পারেন নিজের কথা। তার জন্য যোগাযোগ করতে হবে গ্রন্থাগারগুলোর ফেসবুক পেজ-এর মাধ্যমে।

human library

কারা রয়েছেন এগিয়ে:

ইনদওরে প্রথম শুরু হলেও আপাতত ভারতের মানব গ্রন্থাগার হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি হায়দরাবাদেরই। ওই শহরের অন্নপূর্ণা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হর্ষদ ফাদ যার প্রতিষ্ঠাতা। ভারতের নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে সভা করছেন তাঁরা। আপাতত এই উদ্যোগ হায়দরাবাদে সীমিত থাকলেও গুজরাত, দিল্লি, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, মুম্বই, কলকাতার মতো শহরেও মানব গ্রন্থাগার নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন হর্ষদ।

কেমন লাগে বই হিসেবে কথা বলতে:

কাজটা আদপেই সহজ নয়। মুখ্যত শ্রোতা-পাঠককে মানসিক সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেওয়া উদ্দেশ্য হলেও তার জন্য মানব বইকেও ঝেড়ে ফেলতে হয় সব দ্বিধা। “সমকামী হিসেবে নিজের জীবন নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে প্রথমে আমার একটু দ্বিধা ছিল। কিন্তু দেখলাম, যাঁরা আমায় ধার করছেন, বেশ সহজ ভাবেই গ্রহণ করতে পারছেন আমার বক্তব্য। অনেকে বার বার ঘুরেও আসছেন কথা শোনার জন্য”, জানিয়েছেন হায়দরাবাদের মানব গ্রন্থাগারের হয়ে অ্যান্ডি সিলভেইরা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here