মুখে বলছেন গোমাংস নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু গবাদি পশু সংক্রান্ত নীতিতে ফাঁপরে উত্তরপূর্বের বিজেপি নেতৃত্ব

0
270

ওয়েব ডেস্ক: নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর জন্য উত্তরপূর্ব ভারতকে পাখির চোখ করেছে বিজেপি। সাফল্যও আসছে কিছু কিছু। কিন্তু এখানে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে গবাদি পশু সংক্রান্ত কেন্দ্রের নতুন নীতি।

এমনিতে উত্তরপূর্বের মানুষের কাছে অন্যতম প্রধান খাদ্য গোমাংস। তাই বিহার বা উত্তরপ্রদেশের বেলায় গোমাংস নিয়ে বিজেপির যে অবস্থান, উত্তরপূর্বের ক্ষেত্রে অবশ্য তা নয়। এখানকার বিভিন্ন রাজ্যে প্রচারের সময়ে গোমাংস প্রসঙ্গ এড়িয়েই যায় শাসক দল। মূলত উন্নয়নের কথাতেই জোর দেওয়া হয় এখানে।

কিন্তু গবাদি পশু কেনাবেচা বন্ধ করার ব্যাপারে কেন্দ্রের নতুন নির্দেশিকায় বিজেপির উত্তরপূর্বের নেতৃত্ব বেশ চাপে। এই চাপের মধ্যে ভাঙন ধরেছে মেঘালয়ের বিজেপিতে। বৃহস্পতিবার বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করেন মেঘালয়ের বার্নার্ড মারাক। মারাক ছিলেন বিজেপির পশ্চিম গারো পাহাড় জেলা সভাপতি। দল ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময়ে তিনি বলেন, “বিজেপি নিজেদের চিন্তাধারা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে।” যদিও বিজেপি নেতৃত্ব থেকে জানানো হয়েছে, গবাদি পশু কেনাবেচা সংক্রান্ত নতুন নির্দেশিকা উত্তরপূর্ব ভারতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

মেঘালয়ে ২০১৮-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় এলে গোমাংসের দাম কমানো হবে, এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মারাক। এর পাশাপাশি তিনি বলেছিলেন, মোদী সরকারের তিন বছর পূর্তি ‘বিচি-বিফ পার্টি’-এর মাধ্যমে করবেন তিনি। ‘বিচি’ হচ্ছে স্থানীয় রাইস বিয়ার। রাজ্যের ঐতিহ্য মেনেই এই অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ছিল মারাকের। কিন্তু এর কিছু পরেই বাধ সাধেন বিজেপি নেতা নলীন কোহলি। তিনি জানিয়ে দেন, “নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে নরেন্দ্র মোদীর উন্নয়নের ভাবমূর্তিকে কেউ কালিমালিপ্ত করুক, এটা আমি চাই না।” এর পরেই দলত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন মারাক।

গবাদি পশু নিয়ে এই নির্দেশিকার ফলে মেঘালয়ের পথেই কি যাবে উত্তরপূর্বের বাকি রাজ্যগুলি?

মেঘালয় ছাড়াও নাগাল্যান্ড এবং মিজোরামে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী। অরুণাচলেও অন্যতম প্রধান ধর্ম খ্রিস্টান। প্রত্যেকটি রাজ্যই আদিবাসী অধ্যুষিত। গরু এবং ষাঁড়ের মাংস এখানকার অন্যতম প্রধান খাদ্য। একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ২০০৯-তে মেঘালয়ে একজন ব্যক্তি মাস প্রতি প্রায় তিনশো গ্রাম গোমাংস খেয়েছেন, অন্য দিকে নাগাল্যান্ডে সেই পরিমাণটা ছিল মানুষ প্রতি পাঁচশো গ্রাম। শুয়োরের মাংসের পরে প্রধান খাদ্য গোমাংস।

কেন্দ্রের গোমাংস নীতি মানে না মিজোরাম বিজেপি। মিজোরামের বিজেপি রাজ্য সভাপতি জেভি হুনার মতে, “মিজোরামের মধ্যে ঢুকে গেলে গোমাংস নিয়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকে না। এখানে গোমাংস বন্ধ করা সম্ভব নয়। আদিবাসী এবং খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী মানুষদের প্রধান খাদ্য গোমাংস।” হুনা বলেন, ২০১৪-তে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহই নাকি এখানকার মানুষদের গোমাংস খেতে বলেছিলেন।

“কেন্দ্রের নতুন নির্দেশিকা আমাদের খাদ্যাভাস-বিরুদ্ধ। এটা এখানকার মানুষদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। এর ফলে আমাদের দলের বিপদ আরও বাড়তে পারে। কেন্দ্র নিজেদের সিদ্ধান্ত না পালটালে আমাদের ভুগতে হবে” — 

নাগাল্যান্ড বিজেপি সম্পাদক কে থং

একই মত অরুণাচলের বিজেপিরও। রাজ্য সভাপতি তাপির গাওয়ের মতে, “এখানে মানুষের মাংস ছাড়া সব কিছুরই মাংস খাওয়া যায়। এখানকার ব্যক্তিগত খাদ্য স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে না বিজেপি।”  তিনি বলেন, পশুদের ওপর অত্যাচার বন্ধের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ রাজ্যের ইস্যু, কেন্দ্র এখানে হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

সামনের বছরই নির্বাচন নাগাল্যান্ডে। গবাদি পশু সংক্রান্ত নতুন নির্দেশিকায় রাজ্য বিজেপি যে কিছুটা চাপে সেটা কোনো রাখঢাক না রেখেই বলে দিয়েছেন বিজেপি রাজ্য সম্পাদক কে থং। তিনি বলেন, “কেন্দ্রের নতুন নির্দেশিকা আমাদের খাদ্যাভাস-বিরুদ্ধ। এটা এখানকার মানুষদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। এর ফলে আমাদের দলের বিপদ আরও বাড়তে পারে। কেন্দ্র নিজেদের সিদ্ধান্ত না পালটালে আমাদের ভুগতে হবে।”

নাগা পিপলস ফ্রন্টের সমর্থনে মণিপুরে সরকার গড়েছে বিজেপি। মূলত আদিবাসী নাগা এবং কুকি জনজাতি অধ্যুষিত এলাকা থেকেই চারটে আসন পেয়েছে নাগা পিপলস ফ্রন্ট। নাগা এবং কুকিদের প্রধান খাদ্য গোমাংস।

রাজ্যের পাহাড়ি আদিবাসীদের সঙ্গে ইম্ফল উপত্যকার বিরোধ অনেক দিনের। সেই বিরোধ মেটানোর জন্য নেমেছে বিজেপি। উন্নয়নই যে প্রধান হাতিয়ার তা মনে করিয়ে দেন রাজ্যের মন্ত্রী এবং কেন্দ্রের নীতির সমর্থক থোঙ্গাম বিশ্বজিৎ সিংহ। মন্ত্রীর কথায়, “সবাই উন্নয়ন চায়। পাহাড়ের মানুষও এখন বুঝে গিয়েছে পৃথিবী কোন দিকে এগোচ্ছে।” তাঁর মতে, কেন্দ্রের এই নীতি নিয়ে রাজ্য বিজেপির কিছু নেতা বিরোধিতা করেছিল, কিন্তু তাদের নাকি এখন বোঝানো গিয়েছে।

তবে কেন্দ্রের নতুন নির্দেশিকা শুধুমাত্র গোহত্যা বন্ধের জন্যই করা হয়েছে, গোমাংস খাওয়া বন্ধ করার জন্য নয়, সে ব্যাপারে মনে করিয়ে দিয়েছেন অসম এবং ত্রিপুরার বিজেপি নেতৃত্ব। গত বছর বোড়ো পিপলস ফ্রন্ট এবং অসম গণ পরিষদের হাত ধরে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। যদিও রাজ্যের আমিষাশী মানুষের অধিকাংশের প্রধান খাদ্য মাছ, কিন্তু গোমাংস প্রধান খাদ্য, এমন জনজাতিও রাজ্যে রয়েছে। অসম বিজেপির সাধারণ সম্পাদক বিজয় গুপ্ত বলেন, “এই নির্দেশিকা শুধু মাত্র পশুহত্যা বন্ধ করার জন্য। গোমাংস খাওয়া এখানে নিষিদ্ধ নয়।” একই মত ত্রিপুরার বিজেপির নেতা জিষ্ণু দেববর্মারও। ত্রিপুরায় গোমাংস খাওয়ার ঐতিহ্য নেই বলেও তিনি জানান, “সিপিএম বা কংগ্রেস, যা বলছে সেটা ভুল। গোমাংসের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। শুধুমাত্র খোলা বাজারে গবাদি পশু কেনাবেচার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।”

এখন প্রশ্ন হল, গোহত্যা নিষিদ্ধ হলে, খোলা বাজারে গবাদি পশু কেনাবেচা নিষিদ্ধ হলে, বাজারে গোমাংস মিলবে তো? মুখে যা-ই বলুন, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন বিজেপি নেতারা।

একটা ব্যাপারে এখানে প্রমাণিত। গবাদি পশু নিয়ে কেন্দ্রের নতুন নির্দেশিকায় যে উত্তরপূর্বের বিজেপি নেতারা ফাঁপরে পড়েছেন, তা বলাই বাহুল্য।

সৌজন্যে scroll.in

 

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here