জলসংকটে চেন্নাই, কিন্তু চিন্তায় থাকবেন আপনিও

0

ওয়েবডেস্ক: টানা দুশো দিন কার্যত কোনো বৃষ্টি না হওয়ার পর অবশেষে গত শুক্রবার কয়েক পশলা বৃষ্টি পেয়েছে চেন্নাই। কিন্তু তীব্র জলসংকটে ভোগা এই শহরের জন্য এই বৃষ্টি আদৌ সন্তোষজনক নয়। তবুও বৃষ্টি তো এসেছে, তাই মানুষের মধ্যে কিছুটা হাসি ফুটেছে। গত ৩০ বছরে সব থেকে ভয়বাহ জলসংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে চেন্নাই। ‘জিরো সিটি’ হওয়ার পথে অনেকটাই এগোচ্ছে এই শহর।

জলের সমস্যা জেরবার চেন্নাইয়ে কী রকম ছবি ধরা পড়েছে? স্কুলে যাচ্ছে না পড়ুয়ারা। তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলি তাদের কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করতে বলছে। গৃহস্থবাড়িতে কম কম জল পাঠাচ্ছে পুরসভা। অনেক রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গিয়েছে জলের অভাবে।

পাইপের সাহায্যে পুরসভা যে পরিমাণ জল বাড়ি বাড়ি সরবরাহ করে, এখন তার দশ শতাংশেরও কম জল সরবরাহ করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শহরবাসীকে ভরসা করতে হচ্ছে জলের গাড়ির ওপরে। কিন্তু সেটা এলে তো! তিন সপ্তাহ বা শহরের কোথাও কোথাও চার সপ্তাহে একবার করে জলের গাড়ি আসছে। আর এলেই সাধারণ মানুষের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যাচ্ছে। ফলে কেউ কেউ জল পেলেও, অনেককেই ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। ভাগ্য ভালো যে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো দুর্ঘটনা কিছু ঘটেনি।

গরমকালে চেন্নাইয়ের জলের সমস্যা খুব অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু এ বার যা হচ্ছে, তা কার্যত আর কখনও হয়নি। কিন্তু কেন এ রকম অবস্থা হয়েছে চেন্নাইয়ের?

জল নেই জলাধারগুলিতে

চেন্নাই শহরে জল আসে, শহরের চার দিকে থাকা চারটে জলাধার থেকে। এই জলাধারগুলির ছবি জানলে আপনি চমকে যাবেন। জলাধারগুলির জলধারণের ক্ষমতা এক শতাংশেরও নীচে এসে ঠেকেছে। এই পরিস্থিতিতে চেন্নাইয়ের ভরসা এখন শুধুমাত্র সেই তিনটে ইউনিট, যেগুলো নোনা জলকে মিষ্টি জলে পরিণত করে। কিন্তু এই ইউনিটগুলোর মোট ক্ষমতা ১৮০ এমএলডি (মিলিয়ন পার ডে) লিটার। যে শহরে মোট জলের প্রয়োজন ১,৩০০ এমএলডি লিটার, সেখানে এই ১৮০ এমএলডি লিটার জলে কী ভাবে সব কিছু করা সম্ভব!

আগামী ২-৩ মাস চেন্নাইয়ে জোর বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ এই সময়ে এই শহরে জোর বৃষ্টি হয় না। ফলে জলসংকট এক-দু সপ্তাহের মধ্যে কেটে যাবে, ব্যাপারটা কিন্তু এতটা সহজ নয়। এই পরিস্থিতিতে চেন্নাইয়ের জলসংকট কমানোর জন্য তামিলনাড়ু সরকার কেরলের সাহায্য গ্রহণ করেছে। ট্রেনে করে সেই জল চেন্নাইয়ে এসে পৌঁছচ্ছে।

শুধুই কি বৃষ্টির অভাবে জলাধারগুলিতে জল কমে গিয়েছে?

না, অনাবৃষ্টি, খরা পরিস্থিতি চেন্নাইয়ে আগেও হয়েছে। কিন্তু এই রকম পরিস্থিতি হয়নি। এ বার হয়েছে কারণ জলাধার, হ্রদ, পুকুরের প্রতি চরম অবজ্ঞা করা হয়েছে। চেন্নাইয়ের দুই প্রতিবেশী জেলা কাঞ্চিপুরম এবং তিরুবল্লুরকে বলা হয় ‘লেক ডিসট্রিক্ট।’ কারণ এই দুই অঞ্চলে অবস্থিত হ্রদের সংখ্যা প্রায় ছ’হাজার। কিন্তু সে সব অতীত। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, এই ছ’ হাজারের মধ্যে এখন শুধু ৩,৮৯৬টা হ্রদই রয়েছে। আর এগুলোও তাদের পুরোনো চেহারায় নেই।

আরও পড়ুন অক্টোবরের মধ্যে সন্ত্রাসে অর্থ জোগান বন্ধ না করলে… চরম সতর্কতা পাকিস্তানকে

আসল কথা হল, গত দশ বছরে এই সব হ্রদের অঞ্চলগুলিতেই তৈরি হয়েছে বিশাল বিশাল অট্টালিকা। এটা সরকারি প্রকল্প। চেন্নাইয়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধি সামাল দিতে এই হ্রদগুলো দখল করে সেখানে বসতিঅঞ্চল তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয় এআইএডিএমকে সরকার। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। এর উলটো ঘটনা হল, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের প্রবল বন্যার কারণও এই বসতিঅঞ্চলও। কারণ জল বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তারই কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

চেন্নাই শহরের মধ্যে দিয়েই তিনটে ছোটো নদী রয়েছে। কুওম, বাকিংহাম ক্যানেল এবং আদিয়ার। জবরদখলের ভারে নুব্জ হয়ে গিয়েছে তারাও। নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে তামিলনাড়ু সরকার। কিন্তু তাতে কোনো লাভই হয়নি।

বাড়ছে অপরাধও

জলের সংকটের জেরে শহরে বাড়ছে অপরাধও। এবং সেটা পুরোটাই জলকে কেন্দ্র করে। গত সপ্তাহেই রাজ্যের এক প্রাক্তন ডিএসপির বিরুদ্ধে প্রতিবেশীকে হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ, প্রতিবেশী ডিএসপিকে বলেছিলেন, সুষ্ঠু ভাবে জল ব্যবহার করার জন্য। জলের অভাবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সমাজবিরোধীরাও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ।

আপনার কী করনীয়

ভারতের যে গুটিকয়েক শহর জলের দিক থেকে ভাগ্যবান, তার মধ্যে অন্যতম কলকাতা। চেন্নাই তো বটেই, দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, পুনে কোথাও জলের পরিষেবা ঠিকঠাক নেই। তুলনায় কলকাতার অবস্থা ভালো। কিন্তু সত্যিই কত দিন ভালো থাকবে আমাদের জলের পরিষেবা। এই শহরেও যে বড়ো বড়ো অট্টালিকা বেড়েই চলেছে। শহরের খালগুলো এখনও সে ভাবে পরিষ্কার নয়। আমাদের ভরসা, গঙ্গাও এখন জল আছে, কারণ হিমালয় আছে। যদি হিমালয়ে বরফ ক্রমশ কমে যায়, এবং গঙ্গায় জল কমে যায় তখন কী হবে আমাদের!

বৃষ্টির জল ধরে রাখার চিন্তাভাবনা এখন থেকেই কি করা উচিত না?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here