indus valley climate change
ছবি: ইন্ডিয়া টাইমস

ওয়েবডেস্ক: সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসের পেছনে দায়ী জলবায়ু পরিবর্তনই। এমনই তথ্য উঠে এল নতুন একটি গবেষণায়।

সমুদ্রের নীচের জীবাশ্ম এবং সামুদ্রিক ডিএনএ পরীক্ষা করেই এই সিদ্ধান্তে এসেছেন গবেষকরা। শীতকালীন বৃষ্টি বেড়ে যাওয়ার ফলেই নিজেদের বাসস্থান ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন ওখানকার বাসিন্দারা, এমনই বলা হয়েছে গবেষণায়।

সিন্ধু সভ্যতা 

চার হাজার বছর আগে সিন্ধু নদের ধারে গড়ে উঠেছিল সিন্ধু সভ্যতা, যাকে হরপ্পা সভ্যতাও বলা হয়। মিশর সভ্যতা, মেসোপটেমিয়া সভ্যতার পাশাপাশি সিন্ধু সভ্যতাই ছিল বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতার অন্যতম।

অধুনা ভারতের গুজরাত, রাজস্থান, পঞ্জাব, কাশ্মীর, উত্তরপ্রদেশ এবং অধুনা পাকিস্তানের সিন্দ, পঞ্জাব এবং বালুচিস্তান প্রদেশে এই সভ্যতার বিস্তৃতি ছিল। প্রাচীন সভ্যতা হলেও, সব কিছুতেই ছিল আধুনিকতার ছাপ। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারোতে খনন কাজ চালিয়ে যে জিনিসপত্র উদ্ধার হয়েছে, তা দেখে বোঝা গিয়েছে, অত্যন্ত সুন্দর পরিকল্পনামাফিক গড়ে উঠেছিল এই সভ্যতার শহরগুলি। অসাধারণ সুন্দর ভাবে তৈরি করা হয়েছিল বাড়িগুলি। সেই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যেও অন্য সব সভ্যতাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল এই সিন্ধু সভ্যতা। ইতিহাস বইতে আমরা পড়েছি যে নিকাশি ব্যবস্থা কতটা আধুনিক ছিল এখানে। রাস্তার ধারে নালা ছিল ঢাকা। শৌচাগারে ফ্লাশের ব্যবস্থা থাকত।

খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০ থেকে সিন্ধু সভ্যতার উত্থান। খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০-এ সভ্যতার পতন ঘটে। কিন্তু গবেষকরা জানিয়েছেন খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ থেকেই জনসংখ্যা কমতে শুরু করে। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো এবং বাকি শহরগুলির বাসিন্দারা ক্রমে পূর্বে সরতে শুরু করে। হিমালয়ের পাদদেশেও সরে যেতে থাকেন অনেকে। খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০-এ সভ্যতার সব শহরই কার্যত ফাঁকা হয়ে যায়।

নতুন গবেষণা কী বলছে

খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ থেকেই এখানকার আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে। প্রথমে হাওয়ার গতিবেগ পালটাতে শুরু করে। বৃষ্টির ধরন বদলে যায়। গরমকালে বৃষ্টির পরিমাণ কমে যায়। মূলত কৃষিভিত্তিক সভ্যতা হওয়ায় বৃষ্টির চেহারা বদলে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ে চাষাবাদ।

‘উডস হোল ওশিয়ানোগ্রাফিক ইন্সটিটিউশন’-এর তরফ থেকে করা এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারী এক গবেষক, লিভিউ জিওসান বলেন, “সিন্ধু তীরবর্তী এলাকায় গ্রীষ্মের বৃষ্টি ক্রমশ কমতে শুরু করে। কিন্তু হিমালয়ের পাদদেশে বৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে যায়। এই কারণেই মানুষ সিন্ধু অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।” তিনি আরও বলেন, “গরম এবং বর্ষায় বৃষ্টি কমে গিয়ে শীতকালে বৃষ্টি বাড়তে শুরু করে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ (পশ্চিমী ঝঞ্ঝা) এসে পাকিস্তানের দিকে বৃষ্টি নামায়। কিন্তু বর্ষার বৃষ্টি যে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করত, শীতকালের বৃষ্টিতে সেটা আর হত না। ফলে কৃষিকাজ বেশ ক্ষতির মুখে পড়ে।”

আরও পড়ুন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘরছাড়া হতে পারেন বাংলাদেশের দু’লক্ষ মানুষ

কিন্তু এটা নিয়ে গবেষণার কাজ এত সহজ ছিল না। মাটির চরিত্র দেখে কোনো সূত্র পাননি গবেষকরা। এর জন্য আরব সাগরের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে হয়েছে। পাকিস্তান উপকূল সংলগ্ন সমুদ্রের তলদেশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন গবেষকরা। বৃষ্টিতে প্রভাবিত হতে পারে, এমন শেওলার জীবাশ্ম সংগ্রহ করে তার ওপরে পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো হয়।
ফোরামিনিফেরা নামক এই প্রজাতির শেওলার জীবাশ্মকে পরীক্ষানিরীক্ষা করে তারা বুঝেতে চেয়েছেন, কে গরমে বেড়েছে আর কে শীতে। তার পরে ডিএনএ নমুনার পরীক্ষা।

জিওসানের কথায়, “সিন্ধুর মুখের কাছে সমুদ্রতলে অক্সিজেনের মাত্রা বেশ কম। সুতরাং ওখানে যারই জন্ম বা মৃত্যু হোক, তাদের নমুনা সেখানকার পলিতে মিশে যায়।”

সিন্ধু সভ্যতার বিস্তার যে ভাবে হয়েছিল

জলবায়ু পরিবর্তন এবং দেশান্তর

জিওসানের মতে, শুধু সিন্ধু সভ্যতাই নয়, বর্তমানে দেশান্তরের যত ঘটনা ঘটে, তার একটা বড়ো কারণই এই জলবায়ু পরিবর্তন। তাঁর কথায়, “সিরিয়া আর আফ্রিকার কথা যদি ভাবেন, তা হলে দেখবেন, সেখানে দেশান্তরের মূল কারণই লুকিয়ে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনে। তবে এটা সবে শুরু। সমুদ্রের জল বাড়তে থাকায় বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চল থেকে যেমন দেশান্তরের ঘটনা ঘটবে, তেমনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হারিকেনপ্রবণ অঞ্চল থেকেও সরে যাবেন বাসিন্দারা।”

তাঁর কথায়, “হরপ্পার বাসিন্দাদের অন্যত্র সরে যেতে কোনো সমস্যা হয়নি। কারণ তখন কোনো সীমান্ত বা রাজনৈতিক বাধাবিপত্তি ছিল না। কিন্তু সেই জিনিসটা তো এখন হবে না। এখন সমস্যা বিস্তর।”

সৌজন্য: দ্য প্রিন্ট

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here