সুকমা (ছত্তীসগঢ়): তিন দিন ধরে ওয়ারলেস ফোনটা দিয়ে বাড়ির লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন দীপচাঁদ শর্মা। কিন্তু ফোন লাগছে না। সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিস ফোর্সের কনস্টেবল দীপচাঁদ চিন্তিত তাঁর পরিবারের লোকেদের জন্য। কারণ, তিনি যোগাযোগ করতে না পারলে, তাঁর পরিবারের লোকেরা তাঁকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন।

সেলুলার নেটওয়ার্কের এই সমস্যা দক্ষিণ ছত্তীসগঢ়ের সুকমার বুরকাপাল গ্রামের কাছে এই সিআরপি শিবিরের নিত্য দিনের বিষয়।

গত ২৪ এপ্রিল মাওবাদীদের গুলিতে নিহত ২৫ জন সিআরপি জওয়ান থাকতেন এই শিবিরেই।

তবে মাওবাদী কিংবা টেলি যোগাযোগের থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে দিন কাটান এই জওয়ানরা।

দাবদাহের রোজনামচা

এই শিবিরে ১৫০ জন জওয়ান থাকেন। তাঁদের জন্য ডর্মিটরির ব্যবস্থা নেই। এক একটি লম্বা ঘরে ৩০ জন করে থাকেন। মাথায় টিনের চালা। পর্যাপ্ত বিছানা নেই, তাই অনেকেই মাটিতে শুয়ে থাকেন।

১৫০ জন জওয়ানের জন্য রয়েছে ৬টি বাথরুম। অতএব বোঝাই যাচ্ছে, সেখানে কতটা লাইন পড়ে।

টিনের চালের জন্য জওয়ানদের ঘরগুলিতে ভয়ংকর গরম। সিলিং ফ্যান আছে বটে, তবে তা নাম কা ওয়াস্তা। কারণ এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ নেই। শিবিরে পাঁচটি জেনারেটর আছে। তাতেই ফ্যানগুলো চলার কথা।কিন্তু জেনারেটরের তেল আসে মাসে একবার। তা অপর্যাপ্ত। তাই কদাচিৎ ফ্যানের হাওয়া খাওয়ার সুযোগ মেলে জওয়ানদের।

খাওয়ার জল এতটাই গরম হয়ে যায়, যা দিয়ে প্রায় ভাত রান্না হয়ে যেতে পারে। ভেজা কাপড় দিয়ে সেই জলের বোতলগুলো ঠান্ডা রাখার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ‘দেশপ্রেমের দিনমজুর’রা।

সুস্থ থাকার যুদ্ধ   

শিবিরের মধ্যে থাকলে গরম। আর টহলে বেরোলে রয়েছে জঙ্গল আর রকমারি পতঙ্গ। বেশির ভাগ জওয়ানেরই শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গে ঘা ও সংক্রমণ। কিন্তু চিকিৎসা করা মুশকিল। সিআরপিএফ-এর ফিল্ড হাসপাতাল এই শিবির থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে। উলটো দিকে। চিন্তলনাড় ও চিন্তাগুফায়। কিন্তু গাড়ি চালিয়ে বা পায়ে হেঁটে সেখানে যাওয়া বিপজ্জনক। সে ক্ষেত্রে মাওবাদীদের সহজ টার্গেটে পরিণত হতে হবে।

তার বদলে তাঁদের রোজ বেরোতে হয় রোজ ওপেনিং পার্টিতে। বন্দুক, গুলি, খাবার – সব মিলিয়ে ১৫ থেকে ২০ কিলো ওজন নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ৭০ জন জওয়ান। হাঁটতে হয় ৪০ ডিগ্রিরও বেশি তাপমাত্রায়। যদি দূরে যেতে হয়, তা হলে ওজনও দ্বিগুন হয়। খাবার, খাবার তৈরির সরঞ্জাম – সব কিছুরই পরিমাণ বাড়ে সে ক্ষেত্রে।

এক জওয়ানের কথায়, “কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তবে তাঁকে রক্ষা করতে পারে কেবল ঈশ্বর বা হেলিকপ্টার। হাসপাতালের ডাক্তার কেবল জটিল রোগের চিকিৎসা করেন।প্রতি মাসে অন্তত ১ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়”।

কয়েকটা তথ্য দেওয়া যাক। ২০১২ সালে গোটা সুকমায় মশার কামড় ও হৃদরোগে মৃত্যু হয়েছিল ৩৬ জন জওয়ানের, মাওবাদীদের হাতে মৃত্যু হয় ৩৭ জনের। ২০১৩ সালে দুই ক্ষেত্রেই সংখ্যাটা ছিল ২০ করে। ২০১৪ সালে মাওবাদীদের হাতে মৃত্যু হয়েছিল ৫০ জনের, বিভিন্ন রোগে মারা গিয়েছিলেন ৯৫ জন জওয়ান। এই ৯৫ জনের মধ্যে ২৭ জন মারা যান ম্যালেরিয়ায়, হৃদরোগে মৃত্যু হয় ৩৫ জনের।

রক্তাক্ত রাস্তা রক্ষা করতে করতে

এই অঞ্চলে সিআরপিএফ নিযুক্ত করা হয়েছে মাওবাদী দমনে। অথচ তাঁদের মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাস্তা তৈরির কাজে নজরদারি করা। কেন্দ্রীয় বাহিনীর অভিযোগ, স্থানীয় ঠিকেদাররা মুনাফা বাড়ানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছেন। সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না স্থানীয় প্রশাসন। অথচ সিআরপি যখনই নজরদারির কাজ করতে অস্বীকার করে, তখনই স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। সিআরপি-র দাবি নিজেদের অযোগ্যতা লুকোতেই সিআরপি-র ঘাড়ে বন্দুক রাখে স্থানীয় পুলিশ।

এমনিতেই মাওবাদী দমনে প্রয়োজনীয় বাহিনী হাতে থাকে না। তার ওপর ওই কাজ সাফল্যের জন্য করতে গেলে প্রয়োজন গোয়েন্দা তথ্য। যা পাওয়া যায়, স্থানীয় বাসিন্দাদের থেকে। কিন্তু সিআরপিএফ জওয়ানরা স্থানীয় ভাষা বোঝেন না। অভিযোগ, বাহিনীর সঙ্গে থাকার কথা স্থানীয় পুলিশদের। কিন্তু প্রতিটি শিবিরে রয়েছেন ১ জন বা ২ জন পুলিশ।

এক সিআরপি জওয়ানের কথায়, ”শিবিরের মধ্যেই আমরা কেবল নিরাপদ। শিবির থেকে বেরোলে কয়েক মিটারের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিপদ। সকলেই এখানে আমাদের বিরুদ্ধে। এমনকি পুলিশও।“

বদলি সহজে হয় না। হলেও কঠিন জায়গায়। বছরে দু’বার ছুটি মেলে। কিন্তু হেলিকপ্টার না এলে যাওয়ার উপায় নেই। ছু’টি মঞ্জুর হতে দিন দুই সময় লাগে, তার পর হেলিকপ্টারের অপেক্ষা। সেটার চলাচলেও নানা বিধিনিষেধ আছে। ফলে কবে বেরোনো যাবে, আগে থেকে বোঝা যায় না। তাই ট্রেনে আসন সংরক্ষণও করা যায় না। যেতে হয় জেনারেল ক্লাসে। বলছিলেন এক অফিসার।

“জেলবন্দিদের জীবনও আমাদের চেয়ে ভালো। অথচ সরকার চায় আমরা ব্ল্যাক ক্যাট কমান্ডোদের মতো লড়াই করি”, বললেন এক জওয়ান।

গোটা পরিস্থিতিটা চমৎকার ব্যাখ্যা করলেন এক সিনিয়র অফিসার, “আবহাওয়া আর রোগব্যাধিতেই আমরা মরি। আর যারা সেই লড়াইয়ে জিতে বেঁচে থাকেন, তাঁদের জন্য রয়েছে মাওবাদীরা আর আইইডি (ইমপ্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস)। মৃত্যু সব সময় আমাদের দিকে কড়া দৃষ্টিতে চেয়ে আছে”।

সূত্র: দ্য হিন্দু এবং দ্য ওয়ার ডট ইন

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here