yashwant sinha

অমদাবাদ : নিজের দলের লোকরাই যে এমন বলবেন সে কি তিনি আগে ভেবেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই জানেন। আমরা বরং জেনে নিই কে ঠিক কী বললেন।

নোটবন্দির পর ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে দেশের। ভারতের অর্থনীতি এক পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নোটবন্দির ঘটনার পর নানা ভাবে গোটা বিশ্বের কাছে এই বার্তা পৌঁছে গিয়েছে যে সব ভারতবাসী চোর। নোটবন্দির বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এখানে ‘লোকশাহি বাঁচাও অভিযান’ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন বিজেপি নেতা তথা প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিনহা।

নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা ভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে বিঁধেছেন এই প্রবীণ বিজেপি নেতা। তিনি বলেন, “ইতিহাসে অনেক রাজা, মহারাজা, শাসকই তাঁদের শাসনকালে নোট বাতিল করেছিলেন।… ৭০০ বছর আগে এ দেশে এক জন সম্রাট ছিলেন, যিনি পুরোনো মুদ্রা বাতিল করে নতুন মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন (সোনারুপোর মুদ্রার জায়গায় তামা আর ব্রোঞ্জের মুদ্রা এনেছিলেন)। তিনি ছিলেন মহম্মদ বিন তুঘলক। তিনি রাজধানী দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে ইতিহাসে কুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন”।

তিনি আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রী মনে করেছিলেন নোট বাতিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তাই তিনি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর বা অর্থমন্ত্রীর পরিবর্তে নিজেই এই ব্যাপারে ঘোষণা করেন। এক ঘণ্টার এক দীর্ঘ বক্তৃতার মধ্যে দিয়ে এই ঘোষণা করেন। সেই লম্বা বক্তব্যের মধ্যে ৭৪ থেকে ৭৫ বার উল্লেখ করেছেন ‘কালো টাকা’ শব্দটা। তা ছাড়াও ছিল ‘জাল নোট’ আর ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দগুলোও। কিন্তু একবারও ‘ডিজিট্যাল আর নগদহীন অর্থনীতি’র কথা তিনি বলেননি”।

তিনি বলেন, সেই সময় কারোর হাতেই নগদ টাকা ছিল না। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ‘ক্যাশলেশ’ হয়ে গিয়েছিল সব কিছু। মোদী যখন দেখলেন উদ্দেশ্য পূরণ করা গেল না তখনই নগদহীন অর্থনীতির কথা বলতে শুরু করলেন।

যশবন্ত সিনহা আরও বলেন, “নোট বাতিলের পর প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছেন ১৮ লক্ষ আমানত নিয়ে তদন্ত করা হবে। এর থেকে গোটা বিশ্বের কাছে এই বার্তা গেছে ভারতীয়রা সব চোর। আমরা সবাই অবৈধ কাজকর্মে যুক্ত। এখানে কেউই সৎ মানুষ নয়”।

তিনি কটাক্ষ করে বলেন, “আজকাল একটা নতুন ধরন হয়েছে। সব কিছুই মিডিয়া ইভেন্ট। আমাদের আগে কেউই এমন কিছু করেনি ধরনের। ছ’ বছর দেশ চালিয়েছেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। যদি তোমরা বল গত ৭০ বছরে দেশের জন্য কেউ কিছুই করেনি, তা হলে বাজপেয়ীজিও এমন কিছুই দেশের জন্য করেননি যার মূল্য আছে। আর তা যদি হয়, তা হলে কেন তাঁকে ভারতরত্ন পুরস্কার দেওয়া হল? শুধু আমি ঠিক আর কেউ না, এটা হয় না।”

পাশাপাশি তিনি এ-ও বলেন, “ইরাক যুদ্ধের সময় বাজপেয়ী দেখিয়েছিলেন কী ভাবে বিরোধী দলের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে হয়। বিরোধী দলের সঙ্গে সর্বসম্মতিতে সব কিছু হওয়া দরকার, এটা বাজপেয়ীজির কাছ থেকে শিখেছিলাম। বিরোধীদল শত্রু নয়”। যশবন্ত বলেন, “২০১৪ সালে মে মাসে ক্ষমতায় আসার আগে যে সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল এখন তার সব ক’টাই বেড়ে ২০২২ হয়ে গিয়েছে। দেশের মানুষকে বলতেই হবে ২০১৯ পর্যন্ত আমরা কী করলাম।”

অর্থনীতির ব্যাপারে প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ছুঁচ বিঁধিয়ে বলেন, “বর্তমান অর্থমন্ত্রী বলছেন দেশের অর্থনীতি খুবই শক্তিশালী, আর্থিক ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে, ৩%। কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট ১.২৫%, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে, স্টক মার্কেট উন্নতি করছে, সবটাই ভালো। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে ভালোর সার্টিফিকেটও মিলেছে। এই সবই হয়েছে আন্তর্জাতিক স্তরে অপরিশোধিত তেলের মূল্য হ্রাসের কারণে। ২০১৪-র মে মাসেই বিজেপি ক্ষমতায় আসে আর সেই মাসেই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার থেকে কমে ২৯ ডলার হয়েছিল। এটা মোটেই আমাদের জন্য হয়নি। ঘটনাটা এমন ঘটেনি যে গুজরাতের সিংহ হুংকার ছেড়েছে আর বিশ্ববাজার ভয় পেয়ে গিয়েছে। আর ভয়ের চোটে ঠিক করেছে দাম কমিয়ে ফেলবে। আসলে এখন ঝড়ের আগের শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। এ বার আসতে আসতে জ্বালানির দাম বাড়ছে। ব্যারেল প্রতি ৬০ ডলার। স্টক মার্কেট পরিবর্তিত হচ্ছে। ডলারের অনুপাতে টাকার দাম কমছে। পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। এখন সব ভালোর দিন ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। দেশের অর্থনীতি এখন খোঁড়া হয়ে গিয়েছে। এর এক মাত্র ভরসা ছিল বিশ্ববাজারে জ্বালানির কম দাম। তা কত দিন থাকবে কেউ জানে না।”

তিনি বলেন, “বিদেশি চাহিদা ও লগ্নি নয়, দেশীয় চাহিদা ও লগ্নির পরিমাণই দেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করে।”

এত সবের পরেও প্রশ্ন একটাই। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে তো দিলেন। কিন্তু প্রবীণ নেতার এই সব মন্ত্রোচ্চারণেও কি ভবি ভুলবে? তা তো দেশের ভবিষ্যতই বলে দেবে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here