nilanjan-duttaনীলাঞ্জন দত্ত

কয়েক দিন ধরে কাশ্মীর আবার উত্তাল। কিন্তু গত জুলাই থেকে চার মাস ধরে সেখানে যে গণবিক্ষোভ চলছিল, তার সঙ্গে এবারের আন্দোলনের কিছু তফাৎ লক্ষ করার মত। আর এবারের খবর, সংবাদ শিরোনামেও তেমন উঠে আসছে না।

আগের তুলনায় এই আন্দোলনে জন সমাবেশ কম। আর আগে যেমন আন্দোলনের নেতৃত্ব বলে ঠিক কাউকে সনাক্তই করা যাচ্ছিল না, জনতার, বিশেষ করে কমবয়সি ছেলেমেয়েদের ভিড়টাই চোখে পড়ছিল, এবারে আবার হুরিয়ত কনফারেন্সের নেতাদের সেই চেনা মুখগুলোই সামনে চলে আসছে।

এই নেতারা আবার ধর্মঘট ডাকছেন, ধরনায় বসছেন, মিছিলে হাঁটছেন। কিন্তু সেই মিছিলে আগের মত “আজাদি! আজাদি!” স্লোগানে এই শীতের বাতাস চিরছে না। তার দাবি লেখা আছে সামনে এক মস্ত ব্যানারে, যা দেখে খানিক থমকে না গিয়ে উপায় নেই। ‘ডিপোর্ট দেম ব্যাক টু পাকিস্তান’! ওদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠিয়ে দাও।

kashmir-poster

কথাটা শুনতে আমরা অবশ্য আজকাল অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সেই সব উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীরা, যারা মনে করে ভারতে শুধু হিন্দুদেরই থাকা উচিত, মাঝে মাঝেই বলে, মুসলমানদের পাকিস্তানে পাঠিয়ে দাও। তা ছাড়াও তাদের মতের সঙ্গে মেলে না এমন কোনও কথা বলে ফেললেই শোনার জন্য তৈরি থাকতে হয়, ‘পাকিস্তানে চলে যাও’।

কিন্তু এখানে তো তারা এ কথা বলছে না। বলছে যারা, তারা নিজেরাই মুসলমান। কাদের সম্পর্কে বলছে ? যারা ৭০ বছর আগে দেশভাগের সময় যে অংশটা পশ্চিম পাকিস্তান হয়ে গিয়েছিল, সেখান থেকে ভিটেমাটি ছেড়ে এপারের কাশ্মীরে চলে এসেছিল, তাদের আর তাদের সন্তানসন্ততিদের সম্পর্কে, যারা এই মাটিতেই জন্মেছে।

আজ কেন হঠাৎ এদের বিরুদ্ধে এই জিগির ? কারণ, জম্মু ও কাশ্মীর সরকার সম্প্রতি ঘোষণা করেছে, তাদের সবাইকে নিজস্ব পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। এটা তাদের দীর্ঘদিনের দাবি। সাত দশক পরেও এখানে তাদের পরিচয়, ‘উদ্বাস্তু’। ৩৭০ ধারা অনুসারে তারাই এই রাজ্যের ‘স্থায়ী নাগরিক’ হতে পারে, যারা বা যাদের পূর্বপুরুষ ১৪ মে ১৯৫৪-র আগে অন্তত ১০ বছর ধরে এখানে বসবাস করেছে। তাই অন্য সব জায়গায় যে উদ্বাস্তুরা এসেছে, তাদের বেশিরভাগই এতদিনে কোনও না কোনও রাজ্যের অধিবাসী হিসাবে ভারতীয় নাগরিক হয়ে গেছে, কিন্তু কাশ্মীরে সীমান্ত পেরিয়ে যারা এসেছিল, তারা কোনওদিনই তা হতে পারবে না। তাই তাদের দাবি, অন্তত একটা পরিচয়পত্র তাদের দেওয়া হোক, যাতে তারা অন্যান্য জায়গায় অথবা কেন্দ্রীয় সরকারী সংস্থায় চাকরি, উচ্চশিক্ষা, ইত্যাদির সুযোগ পায়।


হুরিয়ত নেতারা বলছেন, এখনই হঠাৎ পরিচয়পত্র দেওয়া হচ্ছে কেন ? এর পেছনে কেন্দ্রীয় সরকারের একটা খেলা রয়েছে। এটা আসলে ৩৭০ ধারাকে বাতিল করার দিকে এগোনর একটা চাল।


তা হতে পারে। যার যা খেলা সে তো সেটা খেলবেই। কিন্তু তা বলে কি কাশ্মীরে ৭০ বছর ধরে বাস করা এই মানুষগুলো আর তাদের ছেলেমেয়েরা মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের মতই ‘স্টেটলেস পিপল’ বা দেশহীন মানুষ হয়ে জীবন কাটাবে? দেশভাগের দুর্ভাগ্য তো আজ পর্যন্ত গোটা উপমহাদেশের মানুষই বয়ে চলেছে, কাশ্মীরের মানুষ খুব বেশি করেই বইছে। যারা তাদের নেতা বলে দাবি করেন, তারা তা বোঝার একটু চেষ্টা করবেন, এটা আশা করা কি অন্যায় হবে?

অথচ সে চেষ্টা না করে জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্টের নেতা ইয়াসিন মালিক বলছেন, “জম্মু ও কাশ্মীরের মুসলিমপ্রধান চরিত্রকে রক্ষা করার জন্য কাশ্মীরিরা নিজেদের রক্ত ঝরাতে পর্যন্ত পিছপা হবে না।” হ্যাঁ, এই উদ্বাস্তুদের মধ্যে ৯০ শতাংশই হিন্দু, বাকিদের বেশিরভাগই শিখ, মুসলমান প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু সওয়া কোটি মানুষের রাজ্যে সওয়া লক্ষ লোককে পরিচয়পত্র দিলেই তারা একেবারে জনসংখ্যার ধর্মীয় ভারসাম্য উলটে দেবে? কারা যেন কিছুদিন আগে এরকম ভাবেই গেল গেল রব তুলেছিল, ‘ভারতে শিগগিরই মুসলমান জনসংখ্যা হিন্দুদের ছাড়িয়ে যাবে’ বলে? আবার ব্রিটেন আর আমেরিকায় কারা যেন আওয়াজ তুলছে, এই দেশগুলো আর খ্রিস্টানপ্রধান থাকবে না, শিগগিরই মুসলিমপ্রধান হয়ে যাবে, এই বলে? কার খেলা কে খেলে!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here