লিম্বোদর (গান্ধীনগর) : বৈষম্যের কোনো সীমা নেই। ঘোড়ার পিঠে চড়ে বিয়ে করতে যাওয়া, গর্বা নাচ দেখা, নাপিতের কাছে চুলগোঁফ ছাঁটা – কী নেই এই তালিকায়। এ সবেই নাকি শুধু উঁচু জাতের  অধিকার। তাই এ সব করতে দেখলেই পিটিয়ে শাস্তি দেওয়া হয় তাদের।

তাই গোঁফ রাখার অপরাধে বেধড়ক পেটানো হল দলিত যুবককে। এক সপ্তাহের মধ্যে দু’টি এমন ঘটনা ঘটল। দু’টি ঘটনাই গুজরাতের গান্ধীনগর জেলার কালোল তালুকের লিম্বোদর গ্রামের। এরা গোঁফ রেখেছে বলে রাজপুত সম্প্রদায়ের যুবকরা তাদের মারধর করে।

আইনের ছাত্র ৩০ বছরের কুনাল মাহেরিয়াকে পেটানো হয়। কালোল তালুকের পুলিশ জানিয়েছে, মাহেরিয়ার দাবি গোঁফ রাখার জন্য বাঘেলা নামের এক রাজপুত আর তার সঙ্গীরা তাকে লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করে। আহত মাহেরিয়া গান্ধীনগর সিভিল হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে রবিবার বাড়ি আসে। কালোল তালুকের পুলিশ আধিকারিক বলেন, বাঘেলাকে রবিবার গ্রেফতার করা হয়েছে।

২৪ বছরের পীযূষ পারমারকে মারধর করে রাজপুতরা। সে দিন পীযূষ গর্বা নাচ দেখে বাড়ি ফিরছিল। পথে তাকে মারধর করা হয়। তার অপরাধ সে গোঁফ রেখেছে। কিন্তু এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কেউই গ্রেফতার হয়নি। জানা গেছে পুলিশ এফআইআর নিতেও অস্বীকার করেছিল।

শুধু এখানেই শুরু নয়। এর শিকড় ছড়িয়ে আছে সমাজের আনাচেকানাচে। গর্বা নাচ দেখাও দলিতদের জন্য একটা অপরাধ বলে মনে করে উঁচু জাত বা রাজপুতরা। সেই অপরাধেও মার খেতে হয়েছে দলিতদের। ঘটনা গত সপ্তাহের।

আরও একটা ঘটনা আনন্দ জেলার ভাদরনিয়া গ্রামের। ২১ বছরের দলিত যুবক জয়েশ সোলাঙ্কি। উঁচু সম্প্রদায়ের আট জন যুবক মিলে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। তারা জয়েশের মাথা পাঁচিলে মেরে ফাটিয়ে দেয়।

তা ছাড়া নাপিতের কাছে চুল দাড়ি কামানো থেকে ঘোড়া চড়ে বিয়ে করতে যাওয়া কোনো কিছুতেই দলিতদের অধিকার নেই।

নাপিত বিজয় লিম্বাচিয়া বলে, দলিতদের ক্ষৌরকর্ম করার আদেশ নেই। গ্রামের মাথারা এই সব পছন্দ করে না। দলিতদের চুল দাড়ি কাটতে গেলে তাদের কাজ খোয়াতে হবে। তাই দলিতদের প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে অন্য গ্রামে নাপিত খুঁজতে যেতে হয়।

দলিত গোবিন্দ মাহেরিয়া। মাহেরিয়া বলে, দু’ বছর আগে তার নাত জামাই কপিল বাঘেলাকে পায়ে হেঁটে বিয়ে করতে আসতে বাধ্য করা হয়েছিল। ঘোড়ায় চড়ে আসতে দেওয়া হয়নি। অথচ কপিল সর্দারনগর থানার পুলিশকর্মী। তাও তাকে ছাড়া হয়নি। এমনকি এই ঘটনার প্রতিবাদে এফআইআরও করতে পারেনি গোবিন্দ। কারণ তার সম্প্রদায়ের লোকজনই ভয়ে তার সঙ্গ দেয়নি।

দলিত সতীশ মাহেরিয়া বলে, বয়স্ক মানুষরা বৈষম্যের প্রতিবাদ করতে গেলে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। অভিযোগ জানাতে দেওয়া হয় না। বলে, গান করার, নাচ করার, অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার অধিকার নেই। এমনকি গ্রামে চড়ুইভাতি হলেও সেখানে এক সঙ্গে খাওয়ার অধিকার তাদের নেই। কমার্স গ্র্যাজুয়েট রহিত মাহেরিয়া (দলিত) বলে, সম্প্রদায়ের প্রবীণ দলিতদের রাজপুতরা নাম ধরে ডাকে। অথচ কমবয়সি রাজপুতদের বাপুজি বলে ডাকতে হয়।

এই গোঁফ রাখা নিয়ে বৈষম্য আর হিংসার ঘটনায় প্রতিবাদ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় উঠেছে। গত ৩ দিনে প্রায় ১০০০ দলিত যুবক গোঁফ রেখে, সেলফি বা ছবি তুলে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করছে। নিজেদের প্রোফাইল পিকচার বানাচ্ছে, জানিয়েছেন দলিত যুবক গৌতম মাখওয়ানা।

 

মজার ব্যাপার এখানে গ্রামের এক প্রান্তে একটা সরু গলির মধ্যে প্রায় ১০০টা দলিত পরিবার রয়েছে। সাকুল্যে ৭০০০ সদস্য। দলিত যুবকদের নিরাপত্তার স্বার্থে সেখনে মাত্র দু’ জন কনস্টেবল রাখা হয়েছে। তাদের কাছে অস্ত্র বলতে থাকে শুধু লাঠি।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here