supriya in her uncle's home
কাকার বাড়িতে সুপ্রিয়া।

ওয়েবডেস্ক: আজ লক্ষ লক্ষ ভারতীয় আলোর উৎসব দীপাবলি পালন করছেন। কোথাও চলছে মা কালীর আরাধনা, কোথাও বা ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মীর পূজা। কিন্তু মন ভালো নেই দক্ষিণ কর্নাটকের বেশ কয়েকটি গ্রামের বেশ কিছু মহিলার। তাঁদের মন নৈরাশ্যে ভরা। আপাতত তাঁরা গ্রামছাড়া, ফিরতে পারবেন কিছু দিন পর। কারণ এখন তাঁরা ‘অপবিত্র’। তাঁদের ‘শুদ্ধ’ করে গ্রামে ফেরানো হবে।

রজঃস্বলা মহিলাদের কেরলের শবরিমালা মন্দিরে প্রবেশাধিকার নিয়ে লড়াই শীর্ষ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। কিন্তু এই মহিলাদের দুর্দশা তো চোখের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। এঁদের জন্য কে লড়বেন?

একটু খোলসা করে বলা যাক। পশ্চিমঘাট পর্বতের কোলে দক্ষিণ কর্নাটকের শিবমোগা জেলার চেন্নাশেঠ্‌ঠি কোপ্পা সহ বেশ কিছু গ্রামে এই দেওয়ালির সময় পালিত হয় গ্রামীণ উৎসব ‘গামা হাব্বা’, স্থানীয় দেবীর পূজা। এই পূজার সময় ওই গ্রামগুলির যে সব মহিলা রজঃস্বলা হন, তাঁরা পূজায় যোগ দিতে পারেন না। কারণ, ঋতু চলাকালীন ওই মহিলারা নাকি ‘অপবিত্র’ হয়ে যান। দেওয়ালি উৎসবে তাঁদের যোগ দেওয়ার অধিকার থাকে না। এখানেই শেষ নয়, ওই সময়ে তাঁদের গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হয়। এই বিতর্কিত ঐতিহ্য আজ চলে আসছে যুগ যুগ ধরে।

দেওয়ালির পরে অমাবস্যার রাতে আতসবাজি ফাটিয়ে ওই মহিলাদের গ্রামে ফেরানো হয়। এমনকি মহিলারা যদি কোনো গাড়িতে ফেরেন, সেই গাড়িও জল দিয়ে ধুয়ে শুদ্ধ করা হয়।

কথা হচ্ছিল সুপ্রিয়ার সঙ্গে। বছর কুড়ির সুপ্রিয়া কমার্স গ্র্যাজুয়েট। এখন রয়েছেন গ্রাম থেকে ২০ কিমি দূরে কাকার বাড়িতে। জানালেন, গ্রামের ওই ঐতিহ্য মেনেই তাঁকে এখন গ্রামের বাইরে থাকতে বলা হয়েছে।

এই বিতর্কিত ঐতিহ্য নিয়ে বিরোধিতার সুর একটু একটু করে শোনা যাচ্ছে। পরিবর্তন কিছু হচ্ছে, তবে তা খুব ধীরে। সুপ্রিয়া বললেন, “আগে মহিলাদের গ্রামের বাইরে খেতের মাঝে কুঁড়ে বানিয়ে থাকতে হত। প্রাত্যহিক নিত্যকর্ম করার কোনো সুযোগসুবিধা থাকত না। এখন এই সব প্রথা পালটেছে। এখন আমরা অন্য গ্রামে আত্মীয়দের কাছে গিয়ে থাকতে পারি। আগে এই ‘অপবিত্র’ থাকার মেয়াদ ছিল ১৫ দিন। এখন সেটা কমে বেশির ভাগ গ্রামে হয়েছে সাত দিন।”

village woman eleborating the ritual
গ্রামের মহিলা ওই প্রথার কথা বলছেন।

চেন্নাশেঠ্‌ঠি গ্রামের এক বয়স্ক মহিলা গামাম্মা। তাঁর বিশ্বাস, এই প্রথা মেনে না চললে গ্রামের দেবী রুষ্ট হবেন। তিনি বলেন, “যারা এই নিয়ম মানে না, তাদের মৌমাছি কামড়ায়।” কিন্তু ৫০ বছর বয়সি স্থানীয় কৃষক চৌদাপ্পা মনে করতে পারলেন না, কাউকে কখনও মৌমাছিতে কামড়েছে কিনা – “অনেকেই বলে অমুককে মৌমাছি কামড়েছে, কিন্তু এ ধরনের লোক আমি দেখিনি।”

পুলিশের কাছে এই প্রথার বিরুদ্ধে তেমন ভাবে অভিযোগ করা হয়নি, কারণ, এই প্রথা নিষিদ্ধ নয়। বরং এই প্রথা কত নিষ্ঠুর ছিল, অনেকেই তা গর্ব করে বলেন। বছর কুড়ি আগেও মহিলাদের নগ্ন হয়ে গ্রামের পুকুর থেকে জল তুলে মন্দিরে আসতে হত, দু’টো জায়গার দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার।

স্থানীয় পঞ্চায়েতের সদস্য ৫৪ বছরের ললিতাম্মা বলেন, প্রথা পালটানোর কোনো প্রশ্নই নেই। যে মৌমাছিতে কামড়ানোর ব্যাপারটা কেউ কখনও চোখেই দেখেনি, তাকেই অস্ত্র করলেন ললিতাম্মা। বললেন, “অনেকেই প্রথা পালটানোর কথা বলেন। কিন্তু প্রথা না মানলে ঠিক ওই ১৫ দিনেই কেন মৌমাছি কামড়ায়, তার ব্যাখ্যা তো দিতে পারেন না।”

চেন্নাশেঠ্‌ঠি গ্রামের বীণা পরমেশ্বরন মনে করেন, আসলে আতঙ্কে এই প্রথার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে পারে না – “ওই সময়ে গ্রামে যদি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, তা হলে এই নিয়ম যারা মানেনি তাদের ওই ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়।” তিনি বলেন, কোনো তরুণী যে শ্রদ্ধা-ভক্তিতে এই নিয়ম পালন করে তা নয়, ভয় থেকে পালন করতে বাধ্য হয়।

স্থানীয় বিধায়ক রাজ্যের রাজস্বমন্ত্রী কাগোডু তিম্মাপ্পা মনে করেন এই প্রথা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এই নিষ্ঠুর প্রথা নিষিদ্ধ করার জন্য সরকার শীঘ্রই একটি বিল আনছে। গত মাসেই ওই বিল রাজ্য মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। নভেম্বরে বিধানসভার আসন্ন অধিবেশনে ওই বিল পেশ করা হবে।

প্রতিবেদন ও ছবি সৌজন্যে হিন্দুস্তান টাইমস

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here