ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলির চত্বর জুড়ে শুধু হাহাকার আর পোড়া গন্ধ

0
শ্রয়ণ সেন

গড়িয়াহাটের মোড়টা পেরিয়ে ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলির দিকে আসতেই, চোখে গেল তিন ব্যক্তির দিকে। গুম মেরে রাস্তার ধারে একটা জায়গায় বসে রয়েছেন ওঁরা। তাঁদের জীবনের অনেক কিছুই যে আগুন কেড়ে নিয়েছে সেটা বুঝতে বেশি সময় লাগল না।

কাছে গিয়ে প্রশ্ন করাতে তাঁরা জানালেন, এই ফুটপাথেই স্টল ছিল তাঁদের। একটা রাতেই পালটে গিয়েছে তাঁদের জীবন। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্তও গমগম করে ব্যবসা চলছিল। রোজকার মতোই দোকানের পাট চুকিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন তাঁরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর পেয়ে যান, ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলি এবং সংলগ্ন চত্বরে ভয়াবহ আগুন লেগেছে। রবিবার সক্কালের আলো ফুটতেই এসে দেখেন, সব কিছু শেষ। এক জন হকার এর মধ্যেই বলে উঠলেন, “ব্যবসাটা ঘিরে অনেক কিছু স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম। সেই স্বপ্ন সব চুরমার।”

ঘণ্টা পঁয়ত্রিশের একটা আগুন কী ভাবে বদলে দিল গোটা চত্বরটাকে। কিছুতেই মেলাতে পারছিলাম না, দিন তিনেক আগে, এই জায়গাটাকে কী রকম দেখেছিলাম আর এখন কী রকম দেখছি। গত শনিবার রাতের আগুন এক লহমায় বদলে দিয়েছে গোটা এলাকা।

মাঝেমধ্যেই একটা বিজ্ঞাপন টিভিতে ভেসে ওঠে, ‘গড়িয়াহাটার মোড়ের শোভা ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলি।’ আক্ষরিক অর্থেই গড়িয়াহাট মোড়ের একটা দিক উজ্জ্বল করে দাঁড়িয়ে থাকত সে। গুরুদাস ভবন নামক লালরঙা এক বাড়ি। সেই বাড়ির নীচের তলাতেই এই ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলি। এ ছাড়াও রয়েছে আরও ১০-১২টা দোকান। বাইরের দিকে ফুটপাথে ছিল ৩০-৩৫টা হকারির স্টল। বাড়ির ভেতরে অন্তত ৩৫টি পরিবারের বাস। সব মিলিয়ে গড়িয়াহাট মোড়ের একটা অন্যতম আকর্ষণের জায়গা ছিল এই বাড়িটা। এখনও সেই আকর্ষণের জায়গাই রয়েছে, কিন্তু অন্য ভাবে।

গড়িয়াহাটার মোড়ের শোভা।

বাড়িটার একতলা পুরোপুরি ভস্মীভূত। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তলা হয়ে আগুনের লেলিহান শিখা যে চতুর্থ তলাতেও পৌঁছে গিয়েছিল সেটা বেশ ভালো রকম বোঝা যাচ্ছে। সেই বাড়িকে ঘিরে এখনও চলেছে উৎসাহী পথচলতি মানুষের আনাগোনা। সবাই চেষ্টা করছেন বাড়িটাকে ক্যামেরাবন্দি করে নিতে।

শনিবার গভীর রাতে আগুন লাগার পর, রবিবার সারা দিনই আগুন জ্বলেছিল এখানে। এমনকি সোমবার সকালেও বেশ কিছু পকেট থেকে আগুনের ফুলকি দেওয়া গিয়েছে। এখন অবশ্য আগুন নিভেছে পুরোপুরি, কিন্তু তা-ও তটস্থ হয়ে রয়েছেন এখানকার দোকানগুলির মালিক-কর্মীরা। যেটুকু জিনিসপত্র আগুনের গ্রাস থেকে বেঁচে গিয়েছে, পুলিশের সহায়তায় সেগুলি বের করে আনছেন। তবুও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যে বিপুল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বাতাসে ছড়িয়ে রয়েছে পোড়া গন্ধ। সেই গন্ধ মাঝেমধ্যে বেশ ঝাঁঝালো হচ্ছে। সেই সঙ্গে অদ্ভুত একটা গরম। বাড়িটা থেকে তাপ নির্গত হওয়ার ফলেই এই গরম।

এক বৃদ্ধকে দেখলাম, বিষণ্ণ মুখে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন পুলিশের তৈরি করে দেওয়া ব্যারিকেডে হাত রেখে। জানতে পারলাম এই গুরুদাস ভবনেই তাঁর বাড়ি। আগুনের করাল গ্রাস, তাঁর আস্তানার অনেকটাই ক্ষতি করেছে। আপাতত কাছের একটি গেস্ট হাউসে রাত কাটালেও তিনি বললেন, “কত দিন আর গেস্ট হাউসে থাকব, এক দিন তো ফিরতেই হবে। ফিরে ঘরটাকে কী অবস্থায় দেখব, সেটা ভেবেই ভয় লাগছে।”

আগুনের চিহ্ন

মাথায় হাত বাপি মণ্ডলের। তিনি যে দোকানের কর্মচারী ছিলেন, আগুন গিলে নিয়েছে সেই দোকানকে। এখন তিনি বুঝতে পারছেন না কী করবেন। আশঙ্কার সুরে তিনি বললেন, “বাড়িতে মা-বাবা-ছেলে-বউ আছে, এই অবস্থায় কোনো রোজকার না হলে দিন চালাব কী ভাবে।” বাপিবাবুর একটাই আশা তাঁর দোকানের মালিক। যিনি আশ্বস্ত করেছেন, তাঁর দোকানের কর্মীদের ছাঁটাই করবেন না। কিন্তু মালিকদেরই তো এখন মাথায় হাত, বিশেষ করে ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলির।

বিভিন্ন রকম মানের, বিভিন্ন দামের শাড়ি পুড়ে গিয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটিও ছাড়িয়ে যেতে পারে। কী করে ঘুরে দাঁড়ানো হবে সেটাই এখন ভাবিয়ে তুলছে।

এক কথায় মুষড়ে পড়েছে পুরো গড়িয়াহাট। ব্যবসাপত্তর খুলেছে, হকাররা, রোজকার মতোই হকারি করছেন, সাধারণ ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে, তবুও গড়িয়াহাটের পরিচিত সেই ছবিটা উধাও। ব্যবসা আছে কিন্তু সেই প্রাণটাই নেই।

কিন্তু এ ভাবে তো ভেঙে পড়লে চলবে না। এখন সব কিছুই শূন্য থেকে শুরু করতে হবে বলে জানিয়ে দিলেন ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলির মালিক, কর্মীরা। গড়িয়াহাটের মোড়ের শোভাকে আগের মতোই ফিরিয়ে আনতে হবে বলে বদ্ধপরিকর তাঁরা।

------------------------------------------------
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.