বরফের মধ্যে বদরীনাথ মন্দির
dr. ashoke kr. ghosh
ডাঃ অশোক কুমার ঘোষ

সকাল এগারোটা নাগাদ বদরীনাথ ছেড়ে রওনা হলাম পরবর্তী গন্তব্যের পথে। কিন্তু সঙ্গে রেখে দিলাম গত দু’ দিনের একটা স্মৃতি। এমনই এক স্মৃতি যা প্রথমে আনন্দ দিলেও পরে চিন্তা ধরিয়ে দিয়েছিল।

গত শনিবার সকাল সাড়ে ন’টায় যখন জোশী মঠ থেকে যখন বদরীনাথের পথে রওনা হলাম তখন টিপটিপ বৃষ্টি চলছে। কিছুক্ষণের মধ্যে‌ই বৃষ্টি নামল মুষলধারে। বদরীনাথের দিকে যত এগোচ্ছি দেখছি, উলটো দিক থেকে থেকে নামা গাড়ির ছাদে এবং উইন্ডশিল্ডে বরফ।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তুষারপাতে পরিণত হল বৃষ্টি। আমাদের আনন্দ দেখে কে! জানালার কাচ নামিয়ে ছবি তোলার হুড়োহুড়ি। রাস্তার পাশের গাছে বরফের আস্তরণ চোখে পড়তে লাগল। রাস্তার ওপরের বরফ শক্ত হতেই গাড়ির চাকা স্কিড করতে শুরু করল। গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। ও’দিক থেকে একটা বড়ো ট্রাক আসার ফলে যে চ‌ওড়া চাকার দাগ তৈরি হল, সেই দাগে চাকা ফেলে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল।

বরফে ঢাকা মন্দির-শহর বদরীনাথ

অবশেষে বদরীনাথ। বরফ ঠেলে ভারত সেবাশ্রম সংঘের বিনোদ ভিউ। তুষারপাতের মধ্যে ছাতা এবং পঞ্চু চাপিয়ে প্রায় এক ফুট নরম বরফের মধ্যে পা ডুবিয়ে গিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সারা হল। তুষারপাতের ধারা অবিরাম। ঘরে বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই। বিকালে বিদ্যুৎ সংযোগ চলে গেল। অন্ধকারের মধ্যে ভক্তি মহারাজের বৈরাগ্য আলেখ্য শোনা হল।

আরও পড়ুন অসময়ের প্রবল তুষারপাত কি জলবায়ু পরিবর্তন, তুঙ্গে চর্চা

এ দিকে তুষারপাতের পরিমাণ আরও বেড়ে গিয়েছে। বাড়ল হাওয়ার দাপটও। সকালের আনন্দভাব এখন চিন্তার প্রলেপ দিতে শুরু করেছে। তুষারপাতের ফলে গাছের ডালপালা নুয়ে পড়েছে। চার পাশের অন্ধকারের মধ্যে তুষারে ধারাপাত আর‌ও স্পষ্ট হয়েছে। জেনারেটরের ফলে শুধুমাত্র বদরীনাথ মন্দির আলোকসজ্জায় সজ্জিত। নৈশভোজ সারা হল সঙ্গের চিঁড়েভাজা এবং খেজুর দিয়ে। আমাদের থার্মোমিটার দেখাচ্ছে -৬। গরম জামাকাপড় চাপিয়ে লেপ কম্বলের নীচে। কানে আসছে একটা ঝরনার আওয়াজ এবং অলকানন্দার প্রবাহের শব্দ।

কাটা হচ্ছে বরফ।

ভোরেও ধুপধাপ আওয়াজ। হয়তো বরফের চাঙড় খসে পড়ার শব্দ। তাড়াতাড়ি উঠেই বা কী হবে? থাকতে তো হবে ঘরবন্দি। ঠিক তখনই চমক। দরজার নীচে দিয়ে ঢোকা আলো দেখে বাইরে এসে তাজ্জব। ‘হাই ফোকস্, ইটস্‌ এ ব্রাইট ডে’। সবাই বাইরে। ছবি তোলার ধুম। ঝকঝক করছে চার পাশ। রোদ এসে পড়েছে পাহাড়ের এক দিকে। বদরীনাথ মন্দির পরিষ্কার।

এক জন বাড়ির ছাদে উঠে থালায় করে বরফ তুলে নীচে ফেলছে। মন্দিরচত্বরে লোকজনের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে আমাদের বারান্দা থেকে। আমরাও র‌ওনা হলাম মন্দিরের দিকে। কিছু কিছু বরফ গলে জল হয়ে পথ পিচ্ছিল। সাবধানে চলতে হচ্ছে। বেলচা দিয়ে বরফ সরানো হচ্ছে। অলকানন্দার ওপর ব্রিজে‌ও বরফ। অবশেষে বদরীনাথ দর্শন। মন্দির প্রায় খালি। বদরীনাথজি ভালো দর্শন দিলেন। মাথায় রত্নখচিত মুকুট অথচ দেখতে কী মায়াময়। মায়াবী, সংবেদনশীল দৃষ্টিতে দেখছেন। মনের থলি ভরে নিয়ে মন্দির প্রদক্ষিণ ক‍রে বাইরে আসতে দেখি দর্শনার্থী সমাগম বেশ হয়েছে, তার সঙ্গে হাজির পেশাদার আলোকচিত্রীর দল।

সোমবার সকালে সূর্যোদয়।

সোমবার সকালে নীলকণ্ঠ চুড়োকে রাঙিয়ে অসাধারণ সূর্যোদয় হল। এ বার বদরীনাথ ছাড়ার পালা। বরফ আস্তরণ সরিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল আমাদের গাড়ি।

(বদরীনাথে অসময়ের প্রবল তুষারপাতের প্রত্যক্ষদর্শী)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here