ওয়েবডেস্ক: তিন বছরের মধ্যে পরিবহণের মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয়তায় ট্রেনকে পেছনে ফেলে এক নম্বরে উঠে আসবে বিমান। এমনই আশঙ্কা প্রকাশ করে একটি খসড়া প্রকাশ করেছে রেল বোর্ড।

রেলমন্ত্রকের তৈরি করা ওই খসড়া রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ২০১৯-২০২০ অর্থবর্ষের মধ্যে উচ্চবিত্ত যাত্রীদের একটা বড়ো অংশকে হারাতে চলেছে রেল। নিজেদের পছন্দের পরিবহণ মাধ্যম হিসেবে ট্রেনের আগে বিমানকে বেছে নেবেন এই যাত্রীরা।

ট্রেন এবং বিমানভ্রমণে পার্থক্য গড়ে দিল মূলত দু’টো কারণ। গতি এবং ভাড়া। রেলের থেকে বিমানকে এগিয়ে রাখত গতি, কিন্তু বিমানের তুলনায় রেলের ভাড়া অনেক কম থাকার ফলে অধিকাংশ মানুষ রেলকে বেছে নিতেন। কিন্তু ইদানীং কালে রেলের ভাড়া বেড়েছে আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিমান ভাড়া কমেছে। আবার ট্রেনের লেট হওয়া এখন প্রায় নিত্যদিনের সমস্যা। তাই মানুষ রেলের থেকে বিমানকে অনেকাংশে প্রাধান্য দিচ্ছেন।

এই খসড়ায় কেন্দ্রের একটি পরিসংখ্যান দেখানো হয়েছে কী ভাবে ছোটো দূরত্বের জন্যও এখন বিমানকে বেছে নিচ্ছেন যাত্রীরা। বলা হচ্ছে ভারতে মোট বিমানযাত্রার পঁচিশ শতাংশই পাঁচশো কিলোমিটারের ছোটো দূরত্বের মধ্যে হচ্ছে। কিছু দিন আগেও এই ছোটো দূরত্ব ভ্রমণে রেলের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। উলটো দিকে ৮০০ থেকে ১,০০০ কিলোমিটারের বড়ো দূরত্বের ভ্রমণের জন্য বিমান বেশি জনপ্রিয় ছিল।

খসড়া রিপোর্টে বলা হয়েছে, “যাত্রী পরিষেবায় নিজেদের ব্যবসা ধরে রাখতে এখনই ‘গতি’ এবং ‘ভাড়া’ নিয়ে পর্যালোচনা করা উচিত ভারতীয় রেলের।”

প্রসঙ্গত রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভুর অর্থানুকূল্যে একটি অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন রিপোর্ট প্রকাশ করেছে রেল বোর্ড। সেই রিপোর্টের মধ্যেই এই খসড়াকে রাখা হয়েছে। এখানে আরও বলা হয়েছে, “ছোটোছোটো শহরে এখন বিমানবন্দর তৈরি হচ্ছে। অনেক কম ভাড়ায় এখন বিমান পরিষেবা দিচ্ছে বিমানসংস্থাগুলি। এর ফলে ছোটো দূরত্বের জন্যও ট্রেনের বদলে বিমানকে বেছে নিচ্ছেন যাত্রীরা।”

এর পাশাপাশি রয়েছে কেন্দ্রের ‘উড়ান’ প্রকল্প, যার মাধ্যমে এক ঘণ্টার কম বিমানযাত্রার ভাড়া এখন আড়াই হাজার টাকায় নেমে এসেছে। এর ফলেও ট্রেন পিছিয়ে পড়ছে এবং বিমান এগিয়ে যাচ্ছে এমনই জানিয়েছে খসড়াটি।

এই ব্যাপারটাকে অবশ্য ভালো চোখেই দেখছেন নীতি আয়োগের সদস্য বিবেক দেবরায়। তাঁর কথায়, “অর্থনীতির পক্ষে এটা খুব স্বাস্থ্যকর প্রবণতা। ছোটো দূরত্বের ক্ষেত্রে আগে থেকে রেলের থেকে ব্যবসা নিয়ে নিচ্ছিল সড়ক পরিবহণ, এখন বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে রেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যাচ্ছে বিমান। এর ফলে রেল ছাড়াও পরিবহণের বাকি মাধ্যমেরও উন্নতি হবে।”

যাত্রীর সংখ্যার নিরিখে ট্রেনের ক্রমে কাছে চলে এসেছে বিমান। ২০১৫-এর ডিসেম্বর থেকে ২০১৬-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ বিমানে ভ্রমণ করেছিলেন মোট ন’কোটি ৭৮ লক্ষ মানুষ। অন্য দিকে প্রতি বছর গড়ে ১৪ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ ট্রেনের এসি থ্রি টায়ার, এসি টু টায়ার এবং এসি ফার্স্ট ক্লাস কামরায় ভ্রমণ করেন।

রেলের যাত্রীবৃদ্ধির হারও ক্রমশ কমছে। ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষে যাত্রীবৃদ্ধির হার ছিল ৯.৫ শতাংশ, সেখানে ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষে তা কমে হয়েছে ৫.০১ শতাংশ। রিপোর্টে বলা হয়েছে, “২০১৯-২০ অর্থবর্ষে ট্রেনের উচ্চ শ্রেণিতে ভ্রমণ করা যাত্রীর সংখ্যার থেকে বেড়ে যাবে বিমানে ভ্রমণকারী যাত্রীর সংখ্যা।”

১০০ কিলোমিটার দূরত্বের ভ্রমণে রেলের ক্রমহ্রাসমান যাত্রীসংখ্যার কারণ জন্য বছর দুয়েক আগে রেলমন্ত্রককে সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল। দু’চাকার গাড়ির সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং রাস্তার উন্নতি হওয়াকেই এর পেছনে কারণ হিসেবে বলেছিল রেল মন্ত্রক।

রেল বোর্ডের প্রাক্তন সদস্য অজয় শুক্লর মতে, “দেওয়ালে কী লেখা রয়েছে, আমরা তা অগ্রাহ্য করে গিয়েছি। এটা একটা বিশ্বব্যাপী প্রবণতা। উন্নত অর্থনীতিতে যাত্রীরা রেলের থেকে বেশি বিমানকেই বেছে নেন।” তিনি আরও বলেন, “রেলের উচিত বেশি দূরত্বে ট্রেন চালানোর কোনো প্রয়োজন নেই। বরং ওই দূরত্ব বিমানই পরিষেবা দিক। এই বেশি দূরত্ব মালবাহী গাড়িই চালাক রেল, এর ফলে দেশের অর্থনীতি আরও উন্নত হবে।”

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন