তামিলনাড়ু : কৌশল্যা শঙ্করের কাহিনি। তিনি তেবর সম্প্রদায়ের মেয়ে। আর স্বামী শঙ্কর দলিত। পোলাচিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় একে অপরকে ভালোবাসতে শুরু করেন। কিন্তু কৌশল্যার পরিবার চায়নি বিয়েটা তাঁদের হোক। কিন্তু পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়েই ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দেন তাঁরা। অসম-বিবাহ করেছিলেন কৌশল্যা-শঙ্কর। ২০১৬ সালের মার্চ মাস। সে দিন কৌশল্যার পরণে ছিল শাড়ি, মাথায় লম্বা চুল, তাতে ফুলের মালা। কিন্তু দিনটার পরিণতি খুব সুখের ছিল না। তাঁদের ওপর নেমে আসে নিয়তির করাল গ্রাস। সদ্য ফোটা বিয়ের ফুল পরিণত হয়ে যায় শবদেহের শ্রদ্ধাঞ্জলিতে। বেজাতে বিয়ে করার উপহার হিসেবে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে পৃথিবী ছেড়েই চলে যেতে হয় শঙ্করকে। আর কৌশল্যা ডুবে যায় বিষণ্ণতা আর শোকের ঘন কালো অন্ধকারে। বিষণ্ণতা তাঁকে টেনে নিয়ে যায় আত্মহত্যার পথে। কিন্তু না, সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি তাঁর পথ চলা। এই সমস্ত কষ্টের পথ পেরিয়ে তিনি ঘুরে দাঁড়ান। অত্যাচারের শিকার থেকে পরিণত হন যোদ্ধায়।

১৩ মার্চ উরুমালাইপেটে তিনজন আততায়ী হামলা করে দু’জনের ওপর। গুরুতর আহত শঙ্কর হাসপাতালে যাওয়ার পথেই মারা যান। আর ভাগ্যের খেলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়েও বেঁচে যান কৌশল্যা। যুদ্ধের শুরু তারপর থেকে। তারই ফল মিলল মঙ্গল বার। তিরুপুর কোর্টের প্রিন্সিপ্যাল ডিসট্রিক্ট জাজ আলামেলু নটরাজ শঙ্কর হতযামামলায় অভিযুক্ত ১১ জনকেই দোষী সাব্যস্ত করেন। ছয় জনকে ফাঁসির আদেশ দেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন কৌশোল্যার বাবা চিন্নাস্বামী, মামা ও অন্যান্য আত্মীয়ও। কিন্তু মা আন্নালক্ষ্মীকে নির্দোষ ঘোষণা করেছে আদালত।

দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে ২১টা মাস। এখন তাঁর বয়স ২০ বছর। চুল ছোটো ছোটো করে কাটা। আর বাড়তে দেন না। এটাই বোধ হয় তাঁর যুদ্ধের প্রতীক। প্রতিবাদের দ্যোতক। ঘটনার পর আমূল বদলেছে তাঁর জীবন। এখন তিনি প্যারাই ড্রাম বাজাতে শিখেছেন। এই প্যারাই ড্রাম দলিতদের একটা ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলা। তাঁদের সুখের সময়ে স্বামী এলাকার দলিত শিশুদের লেখাপড়ার শোচনীয় অবস্থার কথা বলে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন। তাই স্বামীর অবর্তমানে এলাকার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করান কৌশল্যা। তিনি শঙ্করের নামে একটা টিউটরিয়ালও খুলেছেন।

মাদুরাইয়ের ‘এভিডেন্স’ দলিতদের অধিকার নিয়ে লড়াই করে। সেই ‘এভিডেন্স’-এর কর্মী কাথির বলেন, তিনি কৌশল্যাকে দলিত-অধিকার রক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। দুর্দিনের প্রথম দিন থেকেই তিনি কৌশল্যাকে দেখছেন। কৌশল্যা চোখের সামনে তাঁর স্বামীর খুন হতে দেখেছেন। তার পর কী সাংঘাতিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন কৌশল্যা। এক্কেবারে ছোটো শিশুদের মতো। কিন্তু সেই অসহায় দুর্বল কৌশল্যা আজ পর্যন্ত ৫৮ বার হাইকোর্টে তাঁর অভিভাবকদের জামিনে আপত্তি করেছেন।

কাথির বলেন, জাতপাতের শিকার কত মানুষই তো হন। যেমন ইল্লাভারসন, গোকুলরাজ – এঁদের হত্যা করা হয়েছিল। দিব্যা আর স্বাতী তাঁদের স্ত্রী। তাঁরা তো নিজেদের পরিবারের মধ্যেই কোথায় হারিয়ে গেছেন। কত জন সংগ্রামী হয়ে ওঠেন? কিন্তু কৌশল্যা সংগ্রামী।

কাথির জানান, এ বার কৌশল্যা তাঁর মা আর পরিবারের আরও দু’ জনের নির্দোষ ঘোষিত হওয়ার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবেন।

কৌশলযা জানিয়েছেন, হত্যার ঘটনার আগে তাঁকে অপহরণ করেছিল পরিবারের লোকজন। কোনো মতে পালিয়ে বেঁচেছেন তিনি।

কাথির বলেন, চুল আর বাড়তে না দেওয়ার কারণ তিনি একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন। কৌশল্যার কথায়, ছোটো ছোটো চুল রাখলে পুরুষের সমতুল মনে হয়।

একটা সাক্ষাৎকারে কৌশল্যাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি কি সব সময়ই এত সাহসী ছিলেন। এমনকি যখন তাঁর স্বামী বেঁচেছিলেন তখনও? উত্তরে কৌশল্যা বলেন, সাহসী না হলে তিনি তাঁকে বিয়ে করতে পারতেন না।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here