Nehru and Modi

ওয়েবডেস্ক: ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (আরবিআই)-এর সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সংঘাত শুধু প্রকাশ্যে এসেছে বললেই ভুল হয়। কারণ দুই তরফের উচ্চাপদাধিকারীদের মধ্যে বাকযুদ্ধ বিষয়টিকে জনসাধারণের কাছে নগ্ন করে দিয়েছে। ঋণখেলাপিদের ঋণ মুকুব করা থেকে শুরু করে বাজারে নগদ মূলধন জোগানের সরাসরি সরকারি নির্দেশ আঁতে ঘা মেরেছে আরবিআইয়ের। সে কারণেই, আরবিআইয়ের ডেপুটি গভর্নর বিরল আচার্য ‘স্বাধীনতা’য় হস্তক্ষেপের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। যদিও এই ধরনের স্বাধীনতা-হীনতার টানাপোড়েন এ দেশে প্রথম নয়।

আরবিআইয়ের চুতুর্থ গভর্নর স্যার বেনেগাল রামা রাউ ১৯৫৭ সালের জানুয়ারিতে নিজের পদ থেকে ইস্তফা দেন। সে সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে কোনো এক কারণে মতান্তরের জেরেই ওই ইস্তফা বলে মনে করেন তৎকালীন বিশেষজ্ঞরা। তৎকালীন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী টি টি কৃষ্ণমাচারিকে সঙ্গে নিয়ে নেহরুর স্বঘোষিত “সরকারের বিভিন্ন রকমের কাজে আরবিআই-ও একটা অংশ” মতের পরিণামই সম্ভবত রাউয়ের ইস্তফার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

নেহরু ১৯৫৭-র জানুয়ারিতে লিখেছিলেন, “আরবিআই সরকারকে পরামর্শ দিতে পারে, কিন্তু সেটা অবশ্যই সরকারের লাইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে।” তিনি লেখেন, “আপনি (রাউ) আরবিআইয়ের স্বায়ত্তশাসনে জোর দেওয়ার কথা বলেছেন। অবশ্যই এটা (আরবিআই) একটা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশসাপেক্ষ। এর আর্থিক নীতিগুলি সরকারের যে কোনো বড়ো নীতির উপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত। সরকারের বড়ো নীতিগুলির মধ্যস্থতায় পরামর্শ দিতে পারে। তাই বলে সেগুলিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে না।” এই চিঠির কয়েক দিন পরেই রাউ গভর্নরপদ থেকে ইস্তফা দেন।

তবে রাউ সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলেছিলেন অর্থমন্ত্রী টি টি কৃষ্ণমাচারির দিকেই। বাজেট প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সময় অর্থমন্ত্রী তাঁর প্রতি দুর্ব্যবহার করেছিলেন বলে তিনি অসন্তুষ্ঠ হন। এমনও শোনা যেত, আরবিআই-কে অর্থমন্ত্রকের অধীনস্থ একটি বিভাগ বলে মনে করতেন কৃষ্ণমাচারি।

সেই পুরোনো ঘটনার প্রসঙ্গ টেনেই তা হলে ইতি ঘটতে চলেছে বর্তমান দ্বন্দ্বের। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহল থেকে এমনও শোনা যাচ্ছে, আরবিআইয়ের গভর্নর উর্জিত পটেল ইস্তফা দিতে পারেন। তা বাস্তব হলে হয়তো ১৯৫৭ থেকে ২০১৮ – দীর্ঘ ৬১ বছরের ব্যবধানে সেতু গড়বেন তিনিই!

মোদী সরকার বনাম আরবিআই সংঘাত

  • আরবিআইয়ের ফেব্রুয়ারি মাসের একটি নির্দেশিকার বিরোধিতা করে এলাহাবাদ হাইকোর্টে মামলা করে ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন। ব্যাঙ্কের কাছে ১,০০,০০০ কোটি টাকার উপর ঋণ রয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থাগুলির। ঋণগ্রহিতা সংস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে টাটা, এসার বা আদানিদের মতো সংস্থাগুলি।  গত আগস্টে ওই মামলার রায়ে হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে আরবিআই আইনের ৭ নম্বর ধারায় ব্যবস্থা নিতে বলে। সেই নির্দেশ মেনে ১৯৩৪ সালের আইন মোতাবেক আরবিআইকে চিঠি দেয় কেন্দ্র। যেখানে আরবিআই গভর্নরকে কেন্দ্র কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের ১২ ফেব্রুয়ারি ওই নির্দেশিকার সংস্কার করতে বলে।
  • রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মূলধনী সঞ্চয় থেকে বাজারে নগদ জোগানের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য গত ১০ অক্টোবর কেন্দ্রের তরফে দাবি তোলা হয়।
  • ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের দেওয়া ঋণের উপরে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের জারি করা বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনার আবেদন করে কেন্দ্র। যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের লক্ষ্য, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের ঘাড় থেকে অনাদায়ী ঋণের ভার লাঘব করা, সেখানে কেন্দ্রের এ হেন আবেদন তাদের লক্ষ্যের পরিপন্থী।

মোদীর মন্ত্রী বনাম আরবিআইয়ের গভর্নরের ডেপুটি

  • কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের স্বাধীনতা খর্ব করার প্রকাশ্য অভিযোগ তুলেছেন আরবিআইয়ের ডেপুটি গভর্নর বিরল আচার্য। তিনি রীতিমতো হুমকির সুরে বলেছেন, বাজারের রোষ টের পাবে সরকার।
  • চুপ নেই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের দুর্বল নীতির কারণেই নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাঙ্কগুলির অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। ২০০৮-১৪ সালের আর্থিক মন্দার মোকাবিলায় আরবিআইয়ের দুর্বল নীতি এ কারণে অনেকাংশে দায়ী।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here