ওয়েবডেস্ক: হরিয়ানার সোনেপতে দুই একরের জমিতে জোয়ার চাষ করেছেন ওমপাল সিংহ আঁচল। সেই জোয়ারের অবস্থা দেখে হতাশ ৬২ বছরের এই চাষি। জমির প্রায় অর্ধেক জোয়ারই শুকিয়ে গিয়েছে।

হতাশ গলায় বলে উঠলেন, “আমার সব জোয়ার শুকিয়ে গিয়েছে।” তিনি বলেন, “বর্ষার শুরুর দিকে খুব ভালো বৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু এক মাস হয়ে গেল আর উল্লেখযোগ্য কোনো বৃষ্টিই পাইনি।” এই দু’ একর জমিতে জোয়ারের পাশাপাশি তিন একর জমিতে ধান চাষ করেছেন তিনি। ধানের ক্ষেত্রে জলের প্রয়োজন আরও বেশি।

গত পাঁচ সপ্তাহ বৃষ্টির ঘাটতি চলছে সোনেপতে। এই মুহূর্তে ওই অঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতি এখন ৩৭ শতাংশে পৌঁছেছে। অথচ বর্ষার শুরুর পাঁচ সপ্তাহে চিত্রটা সম্পূর্ণ অন্য রকম ছিল। এই অঞ্চলে এক সময়ে বৃষ্টি ৪৪ শতাংশ থেকে ৩১৭ শতাংশ বাড়তিতে পৌঁছে গিয়েছিল।

ভারতের কৃষির ভিতটাই তৈরি হয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুকে কেন্দ্র করে। এই বর্ষার ওপরেই ভরসা করেন দেশের অন্তত ২৬ কোটি ৩০ লক্ষ কৃষক।

বৃষ্টির পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতর ভারতের ৬৬০টি জেলাকে ৩৬টি বিভাগে ভাগ করেছে। ১ জুন থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর আবহাওয়া দফতর অনুযায়ী, ভারতের বর্ষার সময়।

হরিয়ানা, চণ্ডীগড় এবং দিল্লিকে নিয়ে যে বিভাগ তৈরি করেছে আবহাওয়া দফতর, সেখানেই রয়েছে সোনেপত। ওই বিভাগে ৩১টি জেলার মধ্যে ১৯টি জেলাতেই বৃষ্টির ঘাটতি পৌঁছে গিয়েছে কুড়ি শতাংশের নীচে। প্রতিবেশী উত্তরপ্রদেশেও ভালো শুরু করেও ক্রমে ঘাটতিতে পৌঁছে গিয়েছে বর্ষা।

খাদ্য দফতরের এক আধিকারিকের মতে, “খাদ্য সংকট দেখা দেবে না। ধান উৎপাদনে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষতি পূরণ করার সব ব্যবস্থা আমাদের রয়েছে।”

দু’সপ্তাহের মধ্যেই সরকার ঘোষণা করবে, এ বারের বর্ষা স্বাভাবিক। কারণ কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী এ বার গোটা দেশে বর্ষার ঘাটতি মাত্র ৬ শতাংশ, যা তাদের তথ্য অনুযায়ী ‘স্বাভাবিক’। কিন্তু এই তথ্য তখনই কাজে দেবে, যদি আমরা পুরো দেশকে একটা ভূখণ্ড হিসেবে গণ্য করি। কিন্তু এই তথ্যের একটু গভীরে ঢুকলে দেখা যাবে, যে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতের জেলাগুলির মধ্যে ১০৯টি জেলায় বৃষ্টি বাড়তি, ২৭৪টি জেলায় বৃষ্টি স্বাভাবিক এবং ২৪৭টি জেলায় বৃষ্টি ঘাটতিতে রয়েছে।

মোট বৃষ্টিপাতের ৮০ শতাংশ থেকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃষ্টি হলে আবহাওয়া দফতর তাকে ‘স্বাভাবিক’ বলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তথ্যেই লুকিয়ে থাকে বর্ষার খামখেয়ালিপনা। এক বিশেষজ্ঞের মতে, “এখন বৃষ্টির দিনের সংখ্যা কমে গিয়েছে, কিন্তু এক দিনে বৃষ্টির পরিমাণ অনেক বেড়ে গিয়েছে। এর ফলে দেখা যাচ্ছে বৃষ্টি হয়তো স্বাভাবিক পরিমাণে হয়েছে, কিন্তু বৃষ্টির খামখেয়ালিপনাটা নজর এড়িয়ে যাচ্ছে।”

সবুজ বিপ্লবে সব থেকে লাভবান দুই অঞ্চল হরিয়ানা এবং পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ। এখানে বৃষ্টি কম হলেও বোরওয়েল থাকার ফলে চাষের উৎপাদনে খুব একটা সমস্যা হয় না। কিন্তু স্বাভাবিক বৃষ্টি না হলে, কৃত্রিম পদ্ধতিতে চাষের মাঠে জল দিতে হলে কৃষকদের খরচা অনেক বেড়ে যায়।

পরিস্থিতি আরও খারাপ সোনেপত থেকে ৭০০ কিমি দূরে বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে। গত বছর কিসান ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ধার নেওয়া ৬০,০০০ টাকা এখনও শোধ করা হয়নি দয়ারাম অহিওয়ারের। গত বছর প্রবল বৃষ্টির ফলে যে সোয়াবিন চাষ তিনি করেছিলেন তা নষ্ট হয়ে যায়। শস্যবিমাস্বরূপ ১১,০০০ টাকা পেলেও, ধার শোধ করার পক্ষে তা যথেষ্ট ছিল না।

নতুন উদ্যমে এ বছর অড়হর চাষ করা শুরু করেছিলেন অহিওয়ার। আগের বছর দেনা শোধ করার জন্য এ বছর ৫,০০০ টাকা বাড়তি খরচাও করেছিলেন তিনি। কিন্তু এ বারও ব্যর্থতার ছবি। মধ্য সেপ্টেম্বরে শুকিয়ে যাওয়া শস্য দেখে মাথায় হাত তাঁর।

এ বার আসা যাক কর্নাটকের কথায়। তিনটে উপকূলীয় জেলা নিয়ে তৈরি আবহাওয়া দফতরের উপকূল কর্নাটক বিভাগ। দশ সপ্তাহ ধরে বৃষ্টি ঘাটতিতে রয়েছে দক্ষিণ কন্নড় জেলায়, উত্তর কন্নড় জেলায় বৃষ্টির ঘাটতি সপ্তম সপ্তাহে পড়ল। কিন্তু পরিসংখ্যান অনুযায়ী বৃষ্টির ঘাটতি ১৮ শতাংশ। আবহাওয়া দফতরের ভাষায় যা ‘স্বাভাবিক’।

কর্নাটকের রাজ্য কৃষি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রকাশ কমরাদি বলেন, “টানা কয়েক বছর ধরে স্বাভাবিক বর্ষণ পাচ্ছে না উপকূল কর্নাটক। এর ফলে এই অঞ্চলে চাষের অনেক ক্ষতি আশঙ্কা করা হচ্ছে।”

এই অবস্থায় কেন্দ্রের অভয়ই এখন একমাত্র ভরসা। কেন্দ্রের তরফ থেকে জানানো হয়েছে গত বছরের উৎপাদনমাত্রা এ বছরও পূরণ করা হবে।

সৌজন্য: হিন্দুস্তান টাইমস্‌

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here