নাগপুর : প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারিকেও ‘ডোন্ট কেয়ার’। দিনে দিনে বেড়েই চলেছে গোরক্ষকদের তাণ্ডব। কোনও ভাবেই আটকানো যাচ্ছে না গোরক্ষকদের। এবার গোরক্ষকদের হাতে আক্রান্ত বিজেপি খোদ বিজেপি নেতাই।

এদের হাতে আবারও মার খেলেন এক জন। এ বার সামনে এল নাগপুরে ভারসিঙ্গি গ্রামের ঘটনা। আক্রান্তের নাম সেলিম ইসমাইল শাহ। পেশায় সবজিব্যবসায়ী। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল, তিনি স্কুটারের ডিকিতে গরুর মাংস নিয়ে যাচ্ছিলেন। আর ঠিক এই কারণেই বাস স্টপে তাঁকে ঘিরে ধরে এই বাহিনীর সমর্থকরা। তার পর স্কুটার থেকে নামিয়ে রাস্তায় ফেলে বেধড়ক মারধর করা হয়। মারের চোটে জ্ঞান হারান সেলিম।

তিনি বারবারই বলেছিলেন, তাঁর কাছে গরুর মাংস নেই। কিন্তু উন্মত্ত গোরক্ষকরা তাঁর কথায় কান দেননি। অবশেষে পুলিশ এসে তাঁকে হিংস্র জনতার হাত থেকে উদ্ধার করে। ডিকিতে রাখা মাংস কীসের তা জানতে মাংসের নমুনা পরীক্ষা করতে পাঠিয়েছে পুলিশ। ঘটনায় চার জনকে গ্রেফতারও করেছে পুলিশ।

গুরুতর আহত অবস্থায় সেলিমকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেলিম জানিয়েছে, সে বিজেপির কটোল তালুকা শাখার সংখ্যালঘু সেলের সাধারণ সম্পাদক।

নাগপুরে গোরক্ষকদের হামলার নিন্দা করেছে শিবসেনা, কংগ্রেস, এনসিপি। বিজেপি অবশ্য এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দাবি করেছে। শিবসেনা মুখপাত্র মনীষা কায়ান্ডে বলেছেন, ‘‘গোমাংস নিয়ে যাচ্ছেন সন্দেহে লোকজনকে মারধর করা শুরু হয়েছিল উত্তরপ্রদেশে। এবার সেটা আমাদের প্রগতিশীল রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। আরও খারাপ ব্যাপার হল, আরএসএস-এর ঘাঁটিতে এই ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনা চলতে থাকলে সারা দেশে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে। অমরনাথ যাত্রীদের উপর হামলা করা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে মোদী সরকারের ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’

সম্প্রতি নয়াদিল্লির কাছে হরিদাস নগরে ছ’ জনকে মারধর করা হয়, তার আগে জুনেই রাজস্থানে তামিলনাড়ুর সরকারি কর্মীরা আক্রান্ত হন, মে মাসে অসমে গরুচোর সন্দেহে দু’ জন নিহত হন। বাদ যায়নি গুজরাতের মহম্মদ আয়ুব— মারধরের পর মারা যায় সে, কর্ণাটকের চিকমাগালুরে কবলে পড়েন দলিত সম্প্রদায়ের মানুষরা। কাশ্মীরে নয় বছরের শিশুকেও তার গোটা পরিবারের সঙ্গে মারধর করা হয় এই একই সন্দেহে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১০ সাল থেকে গোরক্ষার নামে এই ধরনের মারধরের ঘটনা ঘটেছে মোট ৬৩টা। তার মধ্যে ২০টা ঘটেছে ২০১৭ সালের প্রথম ছ’ মাসেই।

‘ইন্ডিয়া স্পেন্ড’-এর পরিসংখ্যান বলছে, গরু রক্ষার নামে ২৮ জন মানুষ এদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। ১২৪ জন আহত হয়েছেন। মৃতদের মধ্যে ২৪ জনই মুসলিম অর্থাৎ ৮৬%-ই হলেন মুসলিম।

তা ছাড়াও এই পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে, ঘটনাগুলোর ৯৭% ঘটেছে ২০১৪ সালের মে মাসের পর থেকে। অর্থাৎ নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর। এই ঘটনাগুলোর মধ্যে ৩২টা ঘটনা ঘটেছে বিজেপির শাসনাধীন রাজ্যে, ৮টা ঘটনা কংগ্রেস শাসিত রাজ্যে আর বাকি ঘটেছে অন্যান্য দল শাসিত রাজ্যে।

এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে একটা প্রশ্ন উঠছে, বার বার কেন ‘টার্গেট’ করা হচ্ছে সমাজের একটা বিশেষ সম্প্রদায়কেই? তা ছাড়াও সমাজের কাছে, গোরক্ষক নামে তথাকথিক গরুপ্রেমিকদের কাছে জিজ্ঞাসা —  মানুষের প্রাণের দাম কতটুকু তাদের কাছে? গরু রক্ষার নামে এই হত্যালীলা বন্ধ কবে হবে?