ভোটের মাঠে কারকারেকে নামিয়ে খুচরো রাজনৈতিক ফয়দা তুলে নিল বিজেপি!

0

ওয়েবডেস্ক: মুম্বই হামলায় শহিদ আইপিএস হেমন্ত কারকারেকে নিয়ে বিজেপি প্রার্থী সাধ্বী প্রজ্ঞার বক্তব্য সম্পর্কিত বিতর্কে আসরে নেমেছে নির্বাচন কমিশন। এ বিষয়ে যথাযথ রিপোর্টও চেয়ে পাঠিয়েছে কমিশন। তার আগে দেখে নেওয়া যাক প্রায় এক যুগ আগে কারকারে-প্রজ্ঞা সংবাদ শিরোনামের কয়েকটি ঝলক।

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০০৮, টেক্সটাইল শহর হিসাবে পরিচিত মহারাষ্ট্রের মালেগাঁও বিস্ফোরণের ঠিক পরের দিন। নিহত আইপিএস, মহারাষ্ট্র এটিএসের প্রধান হেমন্ত কারকারে ধ্বংসস্তূপের মাঝখান থেকেই আবিস্কার করেন একটি সোনালি রঙের এলএমএল ফ্রিডম মোটর সাইকেল। জিজে ০৫ বিআর ১৯২০ নম্বরের ওই মোটর সাইকেলেই বাঁধা ছিল বিস্ফোরণের কাজে ব্যবহৃত বোমা। এটাই ছিল মালেগাঁও বিস্ফোরণ কাণ্ডের তদন্তে নেমে কারকারের হাতে উঠে আসা প্রথম সূত্র।

এক মাস সময় লেগেছিল। এটিএস উদ্ধার করে ওই মোটর সাইকেলের মালিকের পরিচয়। ২০০৩ সালে তৈরি ই৫৫ওকে২৬১৮৮৬ ইঞ্জিন নম্বরের ওই মোটর সাইকেলটি ক্রেতার হাতে গিয়েছিল সুরাতের সিদ্ধি এজেন্সি মারফত।

এটিএস জানতে পারে সুরাতের ওই ডিলার মোটর সাইকেলটি বিক্রি করে স্থানীয় বাসিন্দা প্রজ্ঞা সিং ঠাকুরকে। এর পরই তাঁকে আটক করে জেরা শুরু করেন কারকারে। এটিএসের কালাচৌকির কঠিন জেরার মুখে পড়ে প্রজ্ঞা একে একে প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে শুরু করেন বিস্ফোরণে জড়িত বাকিদেরও। লেফটেন্যান্ট কর্নেল প্রসাদ পুরোহিত, অবসরপ্রাপ্ত মেজর রমেশ উপাধ্যায় এবং স্বঘোষিত ধর্মগুরু দয়ানন্দ পান্ডের নাগাল পেয়ে যান কারকারের টিম।

সেই ঘটনার প্রায় এক যুগ পর ফের খবরের শিরোনামে একই সঙ্গে কারকারে এবং প্রজ্ঞা। মধ্যপ্রদেশের ভোপাল থেকে প্রজ্ঞাকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সামনে তিনি দাবি করেছেন, তাঁর অভিশাপেই মৃত্যু হয়েছে কারকারের। এর পরই উত্তাল জাতীয় রাজনীতি। সাংবাদিক বিবৃতি দিয়েছে বিজেপি, ক্ষমা চেয়েছেন প্রজ্ঞা। কিন্তু ভোপালের বিজেপি প্রার্থী আসলে কে? বিজেপি তাঁকে কেন প্রার্থী করল অথবা তিনি কেন বিজেপির প্রার্থী হলেন, এমন প্রশ্নের যথার্থ উত্তর পৌঁছে দিতে কারকারে-কাণ্ডের পুন‌ঃপরিবেশন খুবই জরুরি ছিল।

‘‘পাঁচ হাজার বছরের পুরনো হিন্দু সংস্কৃতির গায়ে যাঁরা সন্ত্রাসী তকমা সেঁটে দিয়েছিলেন, সাধ্বী প্রজ্ঞাকে প্রার্থী করে তাঁদের উপযুক্ত জবাব দেওয়া গিয়েছে।’’ – মালেগাওঁ বিস্ফোরণ কাণ্ডের মূল অভিযুক্ত সাধ্বী প্রজ্ঞার সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

সে কথা ঘুরিয়ে স্বীকার করেছেন প্রজ্ঞাও। গত শুক্রবারই তিনি দাবি করেছেন, কে কী বলল তা তিনি জানেন না। তবে বিজেপি যে তাঁকে ক্লিনচিট দিয়েছে, সেটা তাঁকে লোকসভা ভোটে টিকিট দেওয়াতেই প্রমাণিত। উল্টো দিকে কারকারেকে নিয়ে মন্তব্য বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার পর কেন্দ্রীয় ভাবে বিজেপির সাংবাদিক বিবৃতিতেও প্রজ্ঞার শারীরিক এবং মানসিক যন্ত্রণাকেই মান্যতা দেওয়া হয়েছে।

অন্য দিকে কারকারের মৃত্যুর পর মালেগাঁও বিস্ফোরণ কাণ্ডের তদন্তও ঝিমিয়ে পড়ে। ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে ১১ জন অভিযুক্ত এবং আত্মগোপনকারীর বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে এটিএস। পরে ২০১৮-র অক্টোবরে নিয়ার বিশেষ আদালত এই ঘটনায় প্রসাদ পুরোহিত সাধ্বী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর ছাড়াও আরও পাঁচজনকে দোষী সাব্যস্ত করে।

২০১৬ সালের মে মাসে, মালেগাঁও বোমা বিস্ফোরণের তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে মহারাষ্ট্র এটিএসের দাখিল করা একটি সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করে। যেখানে সাধ্বী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর ও ছয়জনকে বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হয়নি বলে উল্লেখ কর হয়। মুম্বইয়ের প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার জুলিও রিবেইরোর দাবি, কারকারে তাঁকে বলেছিলেন, “বিজেপির এক কেবিনেট মন্ত্রী মালেগাঁও বিস্ফোরণের তদন্তে আমার উপর অসন্তুষ্ঠু হয়েছিলেন। কিন্তু আমি তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছিলাম, দুশ্চিন্তা করবেন না, এক জন ভালো হিন্দু নিজের ধর্ম মেনেই তার প্রত্যাশা পূরণের কাজ চালিয়ে যাবে”।

মধ্যপ্রদেশের ভোপালে এ বার কংগ্রেস প্রার্থী করেছে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী দিগ্বিজয় সিংকে। গত তিন দশক ধরে এই আসনটি দখলে রেখেছে বিজেপি। কিন্তু সাম্প্রতিক বিধানসভা ভোটের নিরিখে কোমরে ভোপাল-জয়ে কোমর বেঁধে নেমেছে কংগ্রেস। এই কেন্দ্রেই বিজেপি পার্থী করেছে জামিনে মুক্তি পাওয়া সাধ্বীকে।

মুম্বই সন্ত্রাসের শহিদ পুলিশ অফিসার কারকারের মৃত্যু হয় লস্কর-ই-তৈবার ফিদায়েঁ আজমল কাসভ এবং তার সঙ্গীদের গুলিতে। যদিও বিজেপি প্রার্থীর দাবি, তাঁর অভিশাপেই মৃত্যু হয়েছে কারকারের। প্রজ্ঞার কথায়, “সে সময় আমি কারকরেকে বলেছিলাম, তোর সর্বনাশ হবে। তার সওয়া মাস পরেই সে শেষ হয়েছিল”।

এ ধরনের ‘অবমাননাকর’ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কংগ্রেস এবং এনসিপি অবশ্য ২৬/১১ সন্ত্রাসের শহিদকে অপমানের দায়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ক্ষমাপ্রার্থনার দাবি তুলেছে। আইপিএস অ্যাসোসিয়েশন প্রজ্ঞার মন্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here