round-up-india

১) অমরনাথ হামলা

অন্য বছরের মতো এ বারও অশান্ত ছিল কাশ্মীর উপত্যকা। নিরাপত্তাবাহিনীর ওপরে জঙ্গি হামলা ছাড়াও পাথর ছোড়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে কোনো ঘটনাতেই সে ভাবে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করা হয়নি। কিন্তু সব হিসেব পালটে গেল ১০ জুলাই। ওই দিন জঙ্গি হামলার শিকার হলেন অমরনাথের তীর্থযাত্রীরা। তীর্থযাত্রীদের একটি বাসে হামলা চালায় লস্কর জঙ্গিরা। ঘটনায় মৃত্যু হয় সাত জনের। আহত হন ১৮ জন। বাসে ৫০ জন যাত্রী থাকলেও, বাসচালকের বুদ্ধিমত্তার জন্য বেশির ভাগ তীর্থযাত্রীই বেঁচে যান।

কিছু দিন পরেই নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয় এই হামলার মূল চক্রী, লস্কর জঙ্গি আবু ইসমাইল। ডিসেম্বরের গোড়াতেই নিহত হয়েছে হামলায় উপস্থিত থাকা আরও দুই জঙ্গি। কাশ্মীর পুলিশ ঘোষণা করেছে অমরনাথ হামলার পুরো গোষ্ঠীটাই মুছে গিয়েছে।

২) গুজরাত নির্বাচন

২০১৭-তে দেশের সব থেকে হাই ভল্টেজ বিধানসভা নির্বাচন। ভোটের মাস ছয়েক আগে থেকেই হঠাৎ করে বিজেপির ভিত নড়তে শুরু করে। হার্দিক পটেল, জিগনেশ মেবানি এবং অল্পেশ ঠাকুরকে পাশে পেয়ে বিজেপির ওপরে চাপ বাড়ায় রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস। গুজরাতে দল চাপে, এটা আন্দাজ করতে পেরে দেশের সব হাই প্রোফাইল নেতা-মন্ত্রীদের গুজরাতে প্রচারে লাগায় বিজেপি। হত্যে দিয়ে পড়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ভোটের ফল প্রকাশ হতে দেখা যায়, কোনো রকমে গড় রক্ষা হয়েছে শাসক দলের। ২২ বছরে এই প্রথম বার রাজ্যে একশো আসনের নীচে শেষ করল বিজেপি। তারা পেল ৯৯ আসন। অন্য দিকে ৮০টা আসন পেয়ে বিজেপির ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলেছে কংগ্রেস।

৩) উত্তরপ্রদেশে শুরু যোগীরাজ ও অন্য রাজ্যে

বিজেপি’র পক্ষে হাওয়া একটা ছিলই, কিন্তু সেই হাওয়া যে ঘূর্ণিঝড় হয়ে উত্তরপ্রদেশে আছড়ে পড়বে সেটা আন্দাজ করতে পারেনি স্বয়ং বিজেপিও। উত্তরপ্রদেশে বিজেপি’র ঝড়ে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি এবং বহুজন সমাজ পার্টি। ৪০৩-এর মধ্যে একাই ৩২৫টা আসন দখল করে বিজেপি। কিন্তু ফল প্রকাশের পর নতুন চিন্তা, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন?

অবশেষে ৩২৫ জন বিধায়কের কেউ নয়, বিজেপি উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী করল একজন সাংসদকে। গোরক্ষপুরের যোগী আদ্যিত্যনাথ। রাজ্যে শুরু হয়ে গেল যোগীরাজ। উত্তরপ্রদেশ জিতলেও বিজেপি গদি হারাল পঞ্জাবে। সেখানে দশ বছরের বিজেপি-অকালি জোটকে ধারাশায়ী করে তখৎ দখল করল কংগ্রেস। গোয়া এবং মণিপুরে ত্রিশঙ্কু বিধানসভা হলেও, সঙ্গী জোগাড় করে ক্ষমতায় বসল বিজেপি। উত্তরাখণ্ডে কংগ্রেসকে হারিয়ে ক্ষমতায় এল বিজেপি। হিমাচলে প্রত্যাশা মতোই ক্ষমতায় আসে বিজেপি। তবে হেরে যান মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী প্রেমকুমার ধুমল। আড়াই দশক পরে হিমাচলে খাতা খোলে সিপিআইএম।

৪) ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে নজরকাড়া উপনির্বাচন

বছর শেষ হওয়ার দিন কয়েক আগে নতুন নির্বাচনী চমক দেখাল তামিলনাডু। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার মৃত্যুতে খালি হওয়া আরকে নগর উপনির্বাচনে জিততে পারল না আম্মার দল এআইডিএমকে। জিতল না প্রধান বিরোধী দল ডিএমকে-ও। রেকর্ড ভোটের ব্যবধানে জয়ী হলেন নির্দল প্রার্থী টিটিভি দিনকরণ। কিন্তু কে এই দিনকরণ? তিনি জয়ললিতার ছায়াসঙ্গী শশিকলার ভাইপো। দুর্নীতির অভিযোগে শশিকলা জেলে যাওয়ায় এআইডিএমকে-র ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন এই দিনকরণ। কিন্তু বর্তমান নেতৃত্ব তা হতে দেয়নি। সেই ক্ষোভেই ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। অভিযোগ ভোটারদের মধ্যে প্রচুর টাকা বিলিয়েছেন তিনি। ভোটাররাও আম্মার উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁর দলকে নয় বরং তাঁর ছায়াসঙ্গীর ভাইপোকেই বেছে নিয়েছেন।

৫) রাষ্ট্রপতি হলেন রামনাথ কোবিন্দ

ভারতের ১৪তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন রামনাথ কোবিন্দ। এ বারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে নজর ছিল গোটা দেশের। জুনের শেষ দিকে রামনাথ কোবিন্দকে নিজেদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নেয় এনডিএ। অন্য দিকে বিরোধী ইউপিএ তাদের পছন্দের প্রার্থী হিসেবে বাছেন লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার মীরা কুমারকে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে রামনাথ কোবিন্দের পক্ষে পড়ে ৬৫ শতাংশ ভোট, মীরা কুমারের পক্ষে যায় ৩৫ শতাংশ।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কয়েক দিন পরেই আয়োজিত হয় উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীকে হারিয়ে ভারতের উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন প্রবীণ বিজেপি নেতা বেঙ্কাইয়া নাইড়ু।

৬) চালু হল জিএসটি

‘এক দেশ এক কর’, এই ভাবনায় গোটা দেশে চালু হল পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি)। করের চারটি ধাপে তালিকাভুক্ত করা হল বিভিন্ন পণ্য এবং পরিষেবাকে। সর্বনিম্ন করের ধাপ ধার্য হল পাঁচ শতাংশ, সর্বোচ্চ ২৮ শতাংশ। জিএসটি চালু হওয়ার পর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমা হয়েছে, এই আন্দাজ করেই গুজরাত ভোটের আগেই জিএসটিতে ব্যাপক রদবদল করা হয়। প্রায় ১৭০টি জিনিসকে ২৮ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশ করের আওতায় নিয়ে আসা হয়।

৭) ডোকলাম অচলাবস্থা

ভারত এবং চিনের নরমগরম সম্পর্ক বহু দিনের। কিন্তু এই বছর জুনে দু’দেশের সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছে যায় ডোকলামকে কেন্দ্র করে। চিন-ভুটান সীমান্তে অবস্থিত এই ডোকলাম। চিন এবং ভুটান, দু’দেশই ডোকলামকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে। জুনের মাঝামাঝি এক দিন এই ডোকলামেই রাস্তা তৈরি করতে দেখা যায় চিনা সেনাকে। সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাঘাত করে ভারত। চিনা সেনাদের আটকানোর জন্য ডোকলামে প্রবেশ করে ভারত। শুরু হয়ে যায় অচলাবস্থা। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, যে মনে হতে শুরু করে যে কোনো সময়ে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে দু’দেশের। তবে আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধানেরও চেষ্টা চালানো হয়। অবশেষে আগস্টের শেষে দু’দেশই জানিয়ে দেয় ডোকলাম থেকে সেনা প্রত্যাহার করেছে তারা।

৮) গুজরাত-বিহার-অসমে ভয়াবহ বন্যা

বিহার এবং অসমে বন্যা হওয়া খুব একটা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, কিন্তু শুখা গুজরাতে বৃষ্টি যা ভেল্কি দেখাল তা অবিশ্বাস্য। গুজরাতে বন্যায় মৃত্যু হল অন্তত ২৫০ জনের। এই বর্ষায় তিন বার বন্যার কবলে পড়েছিল অসম। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল রাজ্যের পনেরোটি জেলা। কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানেও বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। জাতীয় উদ্যানেই মৃত্যু হয়েছিল অন্তত সাড়ে তিনশো বন্যপ্রাণীর। প্রবল বন্যায় বিহারে মৃতের সংখ্যা ছিল ৫১৪।

৯) নীতীশের ভোল বদল

ইঙ্গিতটা বেশ কিছু দিন ধরেই ছিল। অবশেষে ভোল বদল করলেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার। কংগ্রেস-আরজেডিকে নিয়ে গড়া মহাজোট ছেড়ে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন জেডিইউ নেতা নীতীশ। পদত্যাগ করলেন মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে। পরের দিনই তাঁকে সমর্থন দিল বিজেপি। তাদের সমর্থন নিয়ে ফের মুখ্যমন্ত্রীর আসনে তিনি। যে নরেন্দ্র মোদীকে এক কালে গাল পাড়তেন নীতীশ, এখন তাঁরই প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

১০) রাম রহিমের সাম্রাজ্য পতন

২০১৭-এর সব থেকে বড়োসড়ো কাণ্ড ঘটিয়ে দিলেন ডেরা সচা সৌদার গুরমিত রাম রহিম সিংহ ইনসান। দুই সাধিকাকে যৌন নিগ্রহের দায়ে তাঁকে কুড়ি বছরের কারাবাসে নির্দেশ দেয় পঞ্জাব-হরিয়ানা হাইকোর্ট। তার পরেই শুরু হয় তাণ্ডব। রাম রহিমের সমর্থকদের তাণ্ডবে বিপর্যস্ত হয় হারিয়ানা। গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, দোকান পুড়িয়ে দেওয়া, সব কিছুই ছিল তাণ্ডবের অঙ্গ। নিরাপত্তাবাহিনীর পালটা গুলিতে মৃত্যু হয় প্রায় ৫০ জন ডেরা সমর্থকের। রাম রাহিমের হাজতবাসে ডেরা সাম্রাজ্যেরও পতন হয়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here