প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত, যার রেশ অব্যাহত এখনও

0

ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী (Indira Gandhi)। যেমন রুচিশীলা ছিলেন, তেমনই অসাধারণ সব বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ছিল তাঁর মধ্যে। ধৈর্য ধরে কঠিন পাথুরে পথের মতো দুঃসময় পেরিয়েছেন। মিলেছে প্রশংসা, সমালোচনাও কম সইতে হয়নি তাঁকে।

বেসরকারি ব্যাঙ্ককে রাষ্ট্রায়ত্ত ঘোষণা

১৯৬৯ সালের ১৯ জুলাই ভারতীয় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। দেশের ১৪টি বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাঙ্ককে রাষ্ট্রায়ত্ত ঘোষণা করেন তিনি। তাঁর হাত ধরে এ দেশের ব্যাঙ্কিং সেক্টরের নতুন দিগন্তে বিচরণ ভারতবাসীর কল্যাণে ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

বেসরকারি ব্যাঙ্ককে রাষ্ট্রায়ত্ত ঘোষণা পরে আর শুধু মাত্র ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। একের পর ক্ষেত্রের রাষ্ট্রায়ত্তকরণ ঘটেছে ওই দিনট‌ির সাফল্যের খতিয়ানকে সামনে রেখেই। কয়লার মতো বৃহত্তর ক্ষেত্রের রাষ্ট্রায়ত্তকরণেও রয়েছে যার স্পষ্ট প্রভাব।

রাজনীতিবিদ ইন্দিরার থেকে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ইন্দিরার প্রশংসায় সে সময় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছিলেন অনেকেই। ইন্দিরার ঘোষণার প্রাক্কালে যে অর্থমন্ত্রী তথা উপ-প্রধানমন্ত্রী মোররাজি দেশাইয়ের পদত্যাগ যে পূর্বপরিকল্পিত চিত্রনাট্য অনুযায়ী, তা পরে প্রকাশ্যে এলেও তাৎক্ষণিক ভাবে বোধগম্য হয়নি!

মারাত্মক দুই ভুল?

Indira Gandhi

“রাজনৈতিক জীবনের দু’টি মারাত্মক ভুল করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এক, ১৯৭৫ সালে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা। দুই, অপারেশন ‘ব্লু স্টার’-এর জন্য সম্মতি দেওয়া”। প্রবীণ কংগ্রেস নেতা ও প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী কে নটবর সিং তাঁর লেখা একটি বইয়ে এমনই উক্তি করেছিলেন। এই দুই বিষয়ে বিরোধী রাজনীতিকদের প্রবল সমালোচনার মুখে পড়তে হয় ইন্দিরাকে। যার রেশ রয়ে গিয়েছে এখনও।

সিভিল সার্ভিস অফিসার হিসাবে ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দফতরে কাজও করেন নটবর। তাঁর মতে, ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ছিলেন খুবই শক্তিশালী আর দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব। ইন্দিরা ছিলেন মানবতাবাদী। কখনও কখনও ইন্দিরা গান্ধীকে খুবই গম্ভীর, কঠিন, দয়ামায়াহীন, চুপচাপ স্বভাবের বলে মনে হত। আবার কখনও কখনও খুবই প্রাণবন্ত, হাসিখুশি, স্নেহময়ী, সুন্দর যত্নবান মানবিক চরিত্রে ধরা দিতেন। একটা কমনীয় ভাব ছিল তাঁর মধ্যে। তিনি পড়তে খুবই ভালোবাসতেন।

একই সঙ্গে নটবরের স্বীকারোক্তি, ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা ঘোষণা আর ব্লুস্টারের অনুমতি দেওয়ার মতো দু’টি সাংঘাতিক ভুল করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন দেশের একজন মহান প্রধানমন্ত্রী।

এক নজরে ইন্দিরা

দীর্ঘস্থায়ী শাসন কালের মেয়াদ অনুযায়ী তিনি হলেন দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল তাঁরই বাসভবনের সামনের বাগানে। সে সময়ও ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতেই।

ইন্দিরার জন্ম ১৯১৭ সালের ১৯ নভেম্বর। বাবা জওহরলাল নেহরু, মা কমল নেহরুর এক মাত্র সন্তান ইন্দিরা। বাবার মৃত্যুর পর ইন্দিরা প্রত্যক্ষ ভাবে রাজনৈতিক পথ চলা শুরু করেন। বিয়ে হয় ফিরোজ গান্ধীর সঙ্গে। ফিরোজ আর ইন্দিরা গান্ধীর দুই ছেলে। বড়ো রাজীব আর ছোটো সঞ্জয়। বড়ো ছেলে রাজীব গান্ধী হলেন দেশের সব থেকে কনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী।

ইন্দিরা গান্ধী জাতীয কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৫৯ সালে। তার আগে তিনি বাবা জওহরলাল নেহরুর সহকারী হিসাবেও কাজ করেছিলেন। সময়টা ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৪ সাল। ১৯৬৪ সালে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য হন। এর পর ১৯৬৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর পর ওই পদে মাত্র ১৩ দিনের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করেন গুলজারিলাল নন্দা। ১৯৬৬ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হন ইন্দিরা।

প্রথমপর্বে ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এরই মাঝে ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। তারপর থেকেই তিনি দেশব্যাপী জন অসন্তোষের মুখে পড়েন। সেই সময় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার খর্ব করা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয় পর্বে ১৯৮০ সালে তিনি ফের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এর পর ১৯৮৪ সালে একটি গুরুদোয়ারায় জঙ্গি হামলা হয়। সেই সময় সেনা পাঠাতে হয় ওই গুরুদোয়ারায়। সাংঘাতিক গোলাগুলি বর্ষণ হয় ওই শিখ উপাসনাস্থলে। সেই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে ওই বছরই নিজের শিখ নিরাপত্তা রক্ষীদের হাতে খুন হন ইন্দিরা গান্ধী। এর পর দেশময় অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীদের হাতে নিহত হয় বহু শিখ ধর্মাবলম্বী।

ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সাহায্য করেছিলেন। তিনি ছিলেন দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারিনী। ১৯৯৯ সালে বিবিসি জনমত সংগ্রহ করে। তার ভিত্তিতে ইন্দিরা গান্ধী ‘উইম্যান অব দ্য মিলেনিয়ম’ সম্মানের জন্য হিসাবে নির্বাচিত হন।

আরও পড়তে পারেন:

সুষমা স্বরাজ: ভারতের ‘সব চেয়ে ভালোবাসার রাজনীতিবিদ’

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন