Reporter killed
শৈবাল বিশ্বাস

সাম্প্রতিক এক  সরকারি তথ্যে জানা গিয়েছে, দেশজুড়ে সাংবাদিক নিগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। লোকসভায় পেশ করা, এক সরকারি রিপোর্টে জানা গিয়েছে, গত তিন বছরে সাংবাদিক নিগ্রহের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মোট ১১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে মোট ১৮৯টি এফআইআর করা হয়েছে। বিষয়টি যে ভাবে বেড়ে চলেছে তাতে স্পষ্ট বোঝা যায়,প্রভাবশালী মহল ক্রমশ বেপরোয়া হয়ে উঠছে। গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে ত্রিপুরায় সুদীপ দত্তভৌমিককে নৃশংস ভাবে খুন করা, বিহার-উত্তরপ্রদেশ –সহ দেশের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে নিয়মিত সাংবাদিকদের উপরক আক্রমণ গোটা ফোর্থ এস্টেটকে শঙ্কিত করে তুলছে।

গত সপ্তাহে লোকসভায় এক প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হংসরাজ আহির জানিয়েছেন, ২০১৬ সালে সাংবাদিক নিগ্রহের বিভিন্ন ঘটনায় ৪৭টি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছে ৪১ জন। ২০১৫ সালে এই ধরনের ঘটনায় মোট ২৮টি মামলা হয়েছিল। এর সঙ্গে জড়িত ৪১ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে সাংবাদিক নিগ্রহের ব্যাপারে ১১৪টি মামলা নথিভুক্ত হয়। এবং এর জেরে ৩২জনকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি জানিয়েছেন, শুধুমাত্র উত্তরপ্রদেশেই গত তিন বছরে ৬৭টি সাংবাদিক নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে। এক সাংবাদিককে পিটিয়ে খুন করার মতো নৃশংস অভিজ্ঞতাও সে রাজ্যে বিরল নয়। মামলার সংখ্যা অনেক বেশি হলেও কী অখিলেশ যাদব রাজত্ব বা যোগী আদিত্য নাথ রাজত্ব –দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে তেমন জোরদার কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ চেখে পড়েনি। গত তিন বছরের ৬৭টি মামলায় সে রাজ্যে মাত্র সাত জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশের অবস্থাও শোচনীয়। গত তিন বছরে সে রাজ্যে মোট ৫০ জন সাংবাদিকের উপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। যার জেরে ৫৬ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।

পশ্চিমবঙ্গের অবস্থাও ভিন্ন কিছু নয়। এ রাজ্যেও ভোটের খবর করতে গিয়ে মুর্শিদাবাদের ডোমকল বা উত্তর ২৪ পরগনার বিধাননগরে সাংবাদিক নিগ্রহ হয়েছে। বামশাসিত ত্রিপুরাতেও অতি সাম্প্রতিক কালে দু’-দু’টি সাংবাদিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে। একটি ঘটনার সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি যুক্ত। এক পুলিশ অফিসারের দেহরক্ষীর গুলিতে সে রাজ্যে এক সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। তবে তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছে, উত্তর ভারতের রাজ্যগুলিতে এ ধরনের ঘটনা সর্বাধিক।

প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সি কে প্রসাদ সম্প্রতি কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, সাংবাদিক নিগ্রহের মতো মারাত্মক প্রবণতা গণতান্ত্রিক কাঠামোর অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে। তিনি প্রশাসনের কাছে আরও তীক্ষ্ম নজরদারির দাবি তোলেন। তাঁর মতে, সাংবাদিক বা সংবাদ মাধ্যমের উপর আক্রমণে অনেকগুলি বিষয় জড়িত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, সাংবাদিকরা এমন সব কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছেন যাকে কোনো ভাবেই ‘সামাজিক’ বলা চলে না। ঝাড়খণ্ডে এক সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় সংবাদ সংগ্রহ ছাড়াও সংশ্লিষ্ট টিভি রিপোর্টারের অন্য উদ্দেশ্যও ছিল।

ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল নিরপেক্ষ সংবাদ মাধ্যমের অস্তিত্বে ক্রমশ বিশ্বাস হারাচ্ছে। তাই সংবাদ মাধ্যমকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বাড়ছে। যে সব জায়গায় সাংবাদিকরা বিদ্রোহ করছেন সেখানেই আক্রমণ আরও জোরাল ভাবে নেমে আসছে। তবে ভরসার কথা হল, দেশজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়া অনেক বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করায় মানুষ সব কিছু দ্রুত জানতে পারছেন। আইনজ্ঞ মহল দাবি তুলেছে, সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা বিধি থাকা প্রয়োজন। আমেরিকায় যেমন ‘উইটনেস প্রটেকশন স্কিম’ আছে ঠিক সেই ধাঁচে এ দেশেও বিশেষ প্রকল্প চালু করা দরকার।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here