অনন্তনাগ: “ঘটনাটা যে-ই ঘটাক, এটা অত্যন্ত বর্বরোচিত। সবার উচিত এই ঘটনার নিন্দা করা” — বলছিলেন অনন্তনাগ নিবাসী বাশারত আহমেদ। শুধু বাশারতই নয়, সোমবারের ঘটনায় স্তভিত প্রায় গোটা কাশ্মীর।

সোমবার অনন্তনাগে অমরনাথ যাত্রীদের ওপর জঙ্গি হামলার ঘটনার নিন্দায় এক জোট হয়েছে কাশ্মীর। কে বা কারা হামলা চালাল, সে ব্যাপারে অনেকের অনেক রকম মত সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোরাঘুরি করছে। কিন্তু সবাই তীর্থযাত্রীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি ঘটনার নিন্দা তো করেইছে, সেই সঙ্গে নিন্দায় সরব হয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলিও। ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছিলেন মিরওয়াইজ উমর ফারুক, ইয়াসিন মালিকের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা। মঙ্গলবার ঘটনার প্রতিবাদে পথে নামেন কাশ্মীরের বিভিন্ন নাগরিক মঞ্চ, কাশ্মীরের চেম্বার অফ কমার্স। শ্রীনগরের লালচকে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দেখান ‘কাশ্মীর ট্যুরস্‌ অ্যান্ড ট্রাভেলস’-এর সদস্যরা।

অনেকের মতে, রাজনৈতিক দলগুলির পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতাবাদীরাও নিন্দায় সরব হওয়ায় এই জঙ্গি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হয়নি, যদিও বেশ কয়েকটি দক্ষিণপন্থী সংগঠন ঘটনাটিকে সাম্প্রদায়িক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কাশ্মীরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঘটনার নিন্দাসূচক বার্তা দেখে মঙ্গলবারই রাজনাথ সিংহ কাশ্মীরিদের বাহবা দিয়ে বলেন, “এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ। এর থেকে বোঝা যায়, মানুষের মধ্যে ‘কাশ্মীরিয়ত’ এখনও রয়েছে।”

ঘটনার পরের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবারই নিরাপত্তাবাহিনীতে ভরে গিয়েছে অনন্তনাগ শহর। তীর্থযাত্রীদের গাড়িগুলিকে বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনীতে মুড়ে রাখা হয়েছে। কাশ্মীরের পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেকের মতেই, সোমবারের হামলার আগে নতুন আলো দেখা শুরু করেছিল কাশ্মীর পর্যটন। কোনো ঘটনা ছাড়াই কেটে গিয়েছিল অমরনাথ যাত্রার প্রথম দু’টি সপ্তাহ। তারও আগে, ঈদের সময় থেকে কাশ্মীর উপত্যকায় ক্রমশ পর্যটকের আনাগোনা বাড়ছিল। এমনকি প্রশাসনের সতর্ক নজরদারিতে বুরহান ওয়ানির মৃত্যুবার্ষিকীতেও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এই সবেই মধ্যেই ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিল কাশ্মীর।

আরও পড়ুন ‘নতুন আলোয় রাজ্যকে দেখুন’, ভ্রমণপিপাসুদের উৎসাহে টিটিএফে সুপারহিট কাশ্মীর

ঘটনার আগের দিন পহলগামের ব্যবসায়ী মহম্মদ ইউসুফ বলছিলেন, “গত বছর এই সময়ে পহলগাম পুরো ফাঁকা ছিল, কিন্তু এ বার ভালো ব্যবসা করতে পারব বলে আশা করছি।” ইউসুফ তখনও জানতেন না, সোমবারের ঘটনা পুরো কাশ্মীরের পর্যটনের ক্ষেত্রেই একটা বিরাট ধাক্কা নিয়ে আসবে।

মঙ্গলবার অমরনাথের পথে অনন্তনাগেই মধ্যাহ্নভোজনের জন্য নেমেছিলেন একদল তীর্থযাত্রী। তাঁদেরই একজন দিল্লিনিবাসী রাম প্রকাশ বলেন, “আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হই, তা হলে আমাদের ঐক্য কেউ ভাঙতে পারবে না।” অনেকের মতে সব যাত্রী যদি রাম প্রকাশের মতো ভাবেন তা হলে রাজ্যের পর্যটনে এই ঘটনার কোনো প্রভাব পড়বে না।

ঘটনায় স্থম্ভিত বিচ্ছিন্নতাপন্থী মানুষও। কাশ্মীরে ‘আজাদি’-এর আন্দোলন চললেও, কখনও পর্যটকের ওপর আঁচ পড়তে দেননি কাশ্মীরিরা। সে রকমই একজন ইশান বেগ। অনন্তনাগের এই বাসিন্দা বলেন, “কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ তীর্থযাত্রীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। গত বছর যখন বুরহান ওয়ানির ইস্যুতে কাশ্মীর জ্বলছিল, তখনও কিন্তু তীর্থযাত্রীদের ওপর কোনো আক্রমণের ঘটনা ঘটেনি।”

জঙ্গি হামলার পরেই স্থানীয় অনেক বাসিন্দাই চলে গিয়েছিলেন অনন্তনাগ হাসপাতালে। যাত্রীদের যদি রক্তের প্রয়োজন হয়, তা হলে তা দিতে প্রস্তুত ছিলেন স্থানীয়রা। সবার একই সুর। তীর্থযাত্রীদের ওপর এই হামলার ঘটনা যেন বিক্ষিপ্ত ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হয়। আতিথেয়তার জন্য বিখ্যাত কাশ্মীর এবং কাশ্মীরিরা। সেই আতিথেয়তার এতটুকু আঁচ পড়তে না দেওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর গোটা কাশ্মীর।

সৌজন্যে: ফার্স্টপোস্ট

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন