cashless

ওয়েবডেস্ক: “মেশিনটা কোথায় জানতে চান? দাঁড়ান একটু খুঁজে দেখি।” চিন্তিত স্বরে বললেন একটি হার্ডওয়্যার দোকানের মালিক প্রবীণ ঘোলাপ। গত ডিসেম্বরে নিজের দোকানে কার্ড সোয়াইপ করার মেশিন বসিয়েছিলেন প্রবীণ। কিন্তু সেটা এখন কোথায় রেখেছেন মনেই করতে পারছেন না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর দোকানের একটি কোনায় মেশিনটির সন্ধান পাওয়া গেল।

মুম্বই থেকে একশো কিলোমিটার দূরে ঠানে জেলার ধাসাই গ্রামে এই দোকান প্রবীণের। গ্রামের ধারে কাছে দিয়ে কোনো জাতীয় সড়ক তো দূর, রাজ্য সড়কও যায়নি। তবুও গত ডিসেম্বরেই ভারতবিখ্যাত হয়েছিল গ্রামটি। ভারতের দ্বিতীয় নগদহীন গ্রাম এবং মহারাষ্ট্রের প্রথম নগদহীন গ্রামের স্বীকৃতি পেয়েছিল এই ধাসাই গ্রাম।

খাতা-বইয়ের দোকান হোক কি বিউটি পার্লার, বিমুদ্রাকরণের ঘোষণার পর থেকেই কার্ড সোয়াইপ মেশিন বসাতে শুরু করেছিল এই গ্রামের সব দোকান। নগদহীন অর্থনীতিতে মানুষকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের উদ্যোগে গ্রামের সব দোকানেই কার্ড সোয়াইপ মেশিন বসতে শুরু করে। কেন্দ্র তো বটেই, রাজ্য সরকারও নিজেদের সাফল্যের কথাই তুলে ধরছিল এই গ্রামের উদাহরণ দেখিয়ে। নগদহীনে নিজেদের পরিবর্তন করার ব্যাপারে উৎসাহিত ছিল গোটা গ্রাম।

কিন্তু দশ মাস পর। সেই উৎসাহ আর দেখা যাচ্ছে না।

ফের নগদে লেনদেন ফিরে এসেছে গ্রামে। আবার নগদের লেনদেনে ফিরে আসা কেন? এর পেছনে মূলত যে সব কারণের কথা বললেন গ্রামের দোকানিরা তার মধ্যে রয়েছে কার্ডের লেনদেন বাবদ ব্যাঙ্কগুলির চার্জ কাটা, নেটওয়ার্কের সমস্যা এবং সর্বোপরি, সব গ্রামবাসীর কাছে এখনও কার্ড না পৌঁছোনো।

গ্রামের ব্যবসায়ীদের নিয়ে তৈরি ‘ধাসাই শহর ব্যাপারী সংস্থা’-এর সদস্য সংখ্যা একশো। এর মধ্যে ৭০ জন ব্যবসায়ীই ওই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের দেওয়া কার্ড সোয়াইপ মেশিন গ্রহণ করেছিলেন। এখন মাত্র ২৫ জনের কাছে সেই মেশিনটি রয়েছে। তবে সেই ২৫ জনের মধ্যে হাতেগোনা কয়েক জনই এই মেশিন ব্যবহার করেন। বাকিরা দোকানের কোনো আলাদা জায়গায় তুলে রেখেছে। এমনই বললেন ব্যাপারী সংস্থার সভাপতি স্বপ্নিল পটকর।

প্রবীণবাবুর কথায় আসা যাক। তিনি তো মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিন এই মেশিন ব্যবহার করেছিলেন। তার পর আড়ালে সরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর কথায়, “মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিন মেশিন ব্যবহার করেছিলাম। তাও ক্রেতারা যখন বলতেন কার্ডে টাকা মেটাবেন তখনই মেশিন ব্যবহার করতাম। এখন তো মেশিনটাও আর ঠিকঠাক কাজ করে না। তাই তাকে একদম চোখের আড়ালে সরিয়ে দিয়েছি।”

গ্রামের বেশির ভাগ মানুষের কাছেই কার্ড এসে পৌঁছোয়নি। আসবেই বা কী করে। অধিকাংশ মানুষের তো স্থায়ী কোনো চাকরিই নেই, তাই ব্যাঙ্কে নিজেদের অ্যাকাউন্ট খোলারও প্রয়োজন মনে করেনি কেউ। সেই সঙ্গে নেটওয়ার্ক পরিষেবাও যথেষ্ট দুর্বল এই গ্রামে। সেই জন্য বারবার ব্যাহত হত নগদহীন লেনদেন।

পুরোটাই নাটক

গ্রামের অনেক দোকানই প্রথম দিকে কার্ড সোয়াইপ মেশিন নিতে চাননি। এদের মধ্যে একজন, পেশায় দর্জি একনাথ ধাওয়াড়। তাঁর কথায়, “এটা নাটক ছাড়া আর কিছুই নয়। গ্রামের কাছে দিয়ে কোনো প্রধান সড়ক নেই। সেই জন্য অধিকাংশ গ্রামবাসীর স্থায়ী কোনো চাকরি নেই। গ্রামবাসী যদি কার্ড না ব্যবহার করে, ব্যবসায়ীরা কার্ড সোয়াইপ মেশিন রেখে কী করবে?” প্রশ্ন একনাথের, যিনি এখনও পর্যন্ত ওই মেশিন নেননি।

মহিলাদের প্রসাধনী জিনিসের দোকান রয়েছে সচিন টুপাঙ্গের। তিনিও এই মেশিন গ্রহণ করেননি। তাঁর যুক্তি, তাঁর দোকানের ক্রেতারা মূলত মহিলা। ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড কী, সেটা এখনও জানেন না গ্রামের মহিলারা।

গ্রামের রাস্তা দিয়ে আরও কিছুটা এগিয়ে একটা ওষুধের দোকান চোখে পড়ল। ‘নগদহীন অর্থনীতি’-এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে, একটি ব্যাঙ্গাত্মক হাসি দিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ব্যবসায়ী। বেশ চাঁচাছোলা ভাষায় প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করেন তিনি। “আমি কী বলব। সব তো দেখতেই পাচ্ছেন। মোদী আজ পর্যন্ত যা যা বলেছে, সব কাগজের পাতায়েই রয়ে গিয়েছে। যে শিরোপা এই গ্রামকে দেওয়া হয়েছিল, তার পেছনে রাজনীতি ছাড়া আর কিছু ছিল না। এখন আর মোদীর কোনো ভক্তকে এই গ্রামে দেখা যায় না।”

আরও পড়ুন: নগদহীন অর্থনীতি: চাক্ষুস অভিজ্ঞতা যে অন্য কথা বলছে

সরকার উদাসীন

সরকারের উদাসীনতায় ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতি স্বপ্নিল পটকর। তাঁর কথায়, “সরকার আমাদের শুধু নগদহীন হতে বলেছিল। কিন্তু এখন যখন আমরা সমস্যায় রয়েছি, সরকারের কোনো প্রতিনিধিকেই আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নেটওয়ার্কই এখানে প্রধান সমস্যা। বিভিন্ন মোবাইল পরিষেবা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, কিন্তু কোনো জবাব আসেনি।”

ধাসাইকে নগদহীন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন স্বপ্নিল। এর জন্য দুটি রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাঙ্ক, বিজয় ব্যাঙ্ক এবং ঠানে জেলা কোওপারেটিভ ব্যাঙ্কের কাছে আবেদন করেছিলেন তিনি। কিন্তু এই দুই ব্যাঙ্ক অনেক বেশি অর্থ দাবি করায়, শেষে ব্যাঙ্ক অফ বরোদার শরণাপন্ন হন তিনি। সমস্যাটা হল ব্যাঙ্ক অফ বরোদার কোনো শাখাই নেই গ্রামে। গত ১ জুন তাদের একটি এটিএম খোলা হয়।

১৭,০০০ গ্রামবাসীর অ্যাকাউন্ট রয়েছে বিজয় ব্যাঙ্কে এবং ২৭,০০০ জনের রয়েছে ঠানে জেলা কোঅপারেতিভ ব্যাঙ্কে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ২,০০০ থেকে ৩,০০০ জন গ্রাহকের কাছে কার্ড রয়েছে। পটকরের কথায়, “এই দুটি ব্যাঙ্কের থেকে যে হেতু আমরা কার্ড সোয়াইপ মেশিন নিইনি, ওরা এখন আমাদের কার্ড দিতে চাইছে না। গ্রামে যদিও বা ওই ব্যাঙ্কদু’টির এটিএম কাজ করছে, কিন্তু তা ব্যবহার হাতেগোনা কয়েক জন করছে। মাত্র ২৫ শতাংশ শিক্ষিত গ্রামবাসী এই কার্ড ব্যবহার করতে জানেন।”

যদিও পটকরের দাবি খণ্ডন করেছেন বিজয় ব্যাঙ্কের ধাসাই শাখার ম্যানেজার নারায়ণ কোরি। তাঁর কথায়, “যাদের বিজয় ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট রয়েছে তাদের কার্ড নিতেই হবে, এটাই ব্যাঙ্কের নিয়ম। যারা অশিক্ষিত তাদের আমরা কার্ড দিইনি। সেই ব্যাপারে কোনো সহযোগিতাও করা সম্ভব নয়।” কোরির দাবি, অন্তত ৫০ শতাংশ ধাসাইবাসী, যাদের এই ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তাদের কাছে কার্ড পৌঁছে গিয়েছে।

ই-ওয়ালেট

ধাসাইয়ে এখন কয়েক জন ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা নগদহীন হওয়ার ওপরে এখনও ভরসা রেখেছেন। এমনই একজন ব্যবসায়ী লক্ষ্মণ মালি। তাঁর আসবাবপত্রের দোকানে কার্ড সোয়াইপ মেশিন রেখে দিয়েছেন লক্ষ্মণ। তবে এই মেশিন নয়, মালি চান তাঁর ক্রেতারা যেন তাঁকে পেটিএম নামক মোবাইল ওয়ালেটের মাধ্যমে টাকা দেন।

তাঁর কথায়, “এখানে নেটওয়ার্কের সমস্যার জন্য অনেক সময়ে কার্ড সোয়াইপ মেশিন কাজই করে না। সে ক্ষেত্রে পেটিএম ব্যবহার করা যেতে পারে।” মাসে তিন থেকে চা রবার নিজের কার্ড সোয়াইপ মেশিন ব্যবহার করেন মালি। বাকি লেনদেনের ক্ষেত্রে নগদ বা পেটিএমেই ভরসা করতে হয়।

তবে ধাসাইকে নগদহীন করার ক্ষেত্রে বিমুদ্রাকরণ যে ব্যর্থ হয়েছে, সেটা এক কথায় স্বীকার করে নেন মালিও। তাঁর কথায়, “বিমুদ্রাকরণের আগে যাদের কার্ড ছিল, তাদের এখনও কার্ড রয়েছে। যাদের কার্ড ছিল না, তারা আর কার্ড নেয়নি।”

সৌজন্য scroll.in

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here