প্রতাপগড় (রাজস্থান) : প্রধানমন্ত্রীর স্বচ্ছ ভারত অভিযান আর স্বচ্ছ রইল না। পরিবেশ সাফ করতে যাওয়া স্বচ্ছ ভারত কর্মীদের হাতে মানুষ খুনের কলঙ্ক লেগে গেল। স্ত্রী-মেয়ের সম্মান রাখতে গিয়ে খুন হতে হল ৪৮ বছরের জাফর হুসেনকে। এই খুনের অভিযোগে পুলিশের কাছে দায়ের করা এফআইআর-এ নাম রয়েছে পুরসভার কমিশনার ও তিন পুরকর্মীর। অথচ পুলিশ এখনও কাউকে গ্রেফতার করে উঠতে পারেনি।

ঘটনা রাজস্থানের প্রতাপগড়ের। রাজধানী জয়পুর থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে এই প্রতাপগড়। স্বচ্ছ ভারত কর্মীরা পিটিয়ে মেরে ফেললেন সিপিআই (এমএল)-এর সক্রিয় কর্মী জাফরকে। অপরাধ, রেললাইনের ধারে খোলা জায়গায় প্রাতঃকৃত্য করতে যাওয়া মহিলাদের ছবি তুলতে বাধা দিয়েছিলেন জাফর। ছবি তুলছিলেন সেখানকার পুরসভার স্বচ্ছ ভারত অভিযানের চার কর্মী। সঙ্গে ছিলেন কমিশনার অশোক জৈন।

জাফরের ১৪ বছরের মেয়ে আর স্ত্রীও ছিলেন ওই মহিলাদের দলে। স্ত্রী রশিদা বলেন, স্বচ্ছ ভারত কর্মীরা তাঁর মেয়েকে হুমকি দেয়। বলে, তার বাবাকে পুড়িয়ে মারা হবে। মায়ের মুখ ভেঙে দেওয়া হবে। তাদের কাছে গিয়ে ধাক্কা মারা হয়, জলের জায়গা লাথি মেরে ফেলে দেওয়াও হয়। ভয় দেখানো হয়, এই কাজ বন্ধ না করলে ছবি তোলা হবে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ছ’টা নাগাদ এই ঘটনা ঘটে। জাফর তাঁদের বাধা দেন, দূরে সরে যেতে বলেন। তার পরই শুরু হয় তাঁকে মারধর।

দশম শ্রেণির ছাত্রী ১৪ বছরের সাবরা বলে, স্বচ্ছ ভারত কর্মী কমল তার বাবার মাথায় পাথর দিয়ে আঘাত করে। কাছেই একটা গাড়িতে বসেছিলেন কমিশনার। তিনি কর্মীদের উৎসাহিত করছিলেন জাফরকে মেরে ফেলার জন্য। বলছিলেন, “মারো মারো, জান সে খতম কর দো”।

মহিলাদের মধ্যে ছিলেন ৩০ বছরের শহিদাও। তিনি বলেন, লাল চুলের লোকটার নাম কমল। তার জামা, হাত জফরের রক্তে লাল হয়ে যায়। পুলিশ ওদের কাউকে গ্রেফতার করেনি।

গ্রামবাসীরা জানান, জাফর একটা মুদির দোকান চালাতেন। আর শ্রমিকদের ন্যায্য আধিকারের দাবিতে লড়তেন। ঘটনার আগে পুরসভার কাউন্সিলারের কাছে জাফর বহু বার শৌচালয় বানানোর জন্য প্রকল্পের টাকা পাইয়ে দিতে অনুরোধ করেছিলেন।

জাফর হুসেন।

অভিযুক্ত কমিশনার অশোক জৈনের দাবি, মহিলারা প্রাতঃকৃত্যের পর যখন ফিরে যাচ্ছিলেন তখন তাঁদের খোলা জায়গায় প্রাতঃকৃত্য করতে বারণ করা হয়। কিন্তু তাতেই জাফর হঠাৎ ঝাড়ুদার কমলকে আক্রমণ করেন। জাফরকে আটকানোর চেষ্টা করা হয়। তাঁকে বলা হয় যা-ই হোক না কেন মারপিট করা ঠিক কথা নয়। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করেননি জফর। তিনি কর্মীদের শাপশাপান্ত করতে থাকেন। তবুও কর্মীরা কোনো রকম মারধর বা প্রতিবাদ করেনি।

কমিশনারের এই দাবি মিথ্যা বলে পালটা দাবি জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা জাফরের ওপর যে আক্রমণ হচ্ছে তা দেখেছেন। ঘটনাস্থলে মাঝারি সাইজের বেশ কিছু পাথরের টুকরো পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ১৬ বছরের দুর্গাশঙ্কর বলে, আমি ফিরছিলাম। কাছেই সাদা রঙের একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। আর লাল চুলের মানুষটা (কমল) জাফরের পেটে ঘুষি মারছিল।

অন্য এক জন প্রত্যক্ষদর্শী তথা ওই মহিলাদের এক জন সরসি মিনা বলেন, চার দিন ধরে এই কর্মীরা এখানে আসছে। তাঁদের ছবি তুলছে। আর ‘কমিউনিটি টয়লেট’ ব্যবহার করতে বলছে।

খোলা জায়গায় যাঁরা প্রাতঃকৃত্য সারেন তাঁদের লজ্জা দেওয়ার জন্য ও এই কাজে নিরুৎসাহিত করার জন্য ছবি তোলাটা স্বচ্ছ ভারত অভিযানের অংশ। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই ব্যবস্থা কাজ করে না। কারণ গরিব পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মানুষজনকে সাধারণের ব্যবহার করার জন্য তৈরি শৌচালয় ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না অথবা শৌচালয় বানানোর টাকা তাদের কাছে পৌঁছোয় না।

প্রসঙ্গত, দেশ জুড়ে চলছে নিয়মের বাড়াবাড়ি। এর আগে এপ্রিল মাসে গোরক্ষকদের হাতে এক জন মুসলিম গোপালক দুধ বিক্রেতা খুন হয়েছেন। কাশ্মীরের একটি পশুপালক পরিবার খুন হয়েছে। তাতে নিহত হয়েছে এক কিশোরও। এ ছাড়াও এমন একাধিক খুনের ঘটনা ঘটে চলেছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন